মত-বিশ্লেষণ

শিশুরা কেন বারবার শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষণের বলি হবে?

অরিত্র দাস: সোজা হয়ে হাঁটতে পারার আগে আমাদের শিশুদের স্কুলের আঙিনায় পাঠানো হয়। কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয় মস্ত বড় ভারী ব্যাগ। অ আ ক খ লিখতে না পারলে দেখানো হয় ভয়ভীতি। ‘ম’ যে একটি ব্যঞ্জনবর্ণ, সেটি না শিখিয়ে বলা হয়, ‘মুখস্থ করো।’

অতঃপর মুখস্থ করার ক্ষমতা দিয়ে কোনো শিশুর মেধা মূল্যায়ন করা হয়, বুদ্ধি-বিচক্ষণতা-সৃজনশীলতা দিয়ে মূল্যায়ন করা হয় না। যে যত বেশি মুখস্থবিদ্যায় পারদর্শী, সে তত বেশি মেধাবী। আর এ জন্য আমাদের শিশুরা বড় হয়ে আমলা হয়; বিশ্ববিখ্যাত ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, লেখক, দার্শনিক ও উদ্ভাবক হয় না। মা-বাবা গর্ব করে বলেন, ‘আমার সন্তান হাঁটতে শেখেনি; কিন্তু দেখো, এটুকু বয়সে কত সুন্দর ছড়া মুখস্থ বলতে পারে।’ এখানেই যেন অভিভাবকের সব কৃতিত্ব। আর তখনই শিশুর মেধা অর্ধেক পচে যায়। মুখস্থবিদ্যা মেধার বাহক নয়, ধারকও নয়Ñমেধার মারণব্যাধি।

‘আত্মস্থ’ শব্দটার সঙ্গে একজন শিক্ষার্থী পরিচিত হয় প্রাথমিক কিংবা মাধ্যমিক স্তর পার করে যাওয়ার পর। আমার জীবনে আমি ‘আত্মস্থ’ শব্দটার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম কলেজে পড়া অবস্থায়। এক শিক্ষক পড়ানোর ফাঁকে এই দুর্লভ শব্দটা বলে ফেলেছিলেন। তখন জানতে পারলাম ‘আত্মস্থ করা’র স্থায়িত্ব বেশি, ‘মুখস্থ করা’র কোনো স্থায়িত্ব নেই। শব্দটার প্রতি সেই থেকে একটা দুর্বলতা, একটা আফসোস, একটা ভালো লাগা এখনও কাজ করে। শব্দটার সঙ্গে আগে কেন পরিচিত হলাম না? শব্দটার এত মহিমা, এত গুণ! অথচ শব্দটা এতকাল অব্দি অজ্ঞতার নিচে চাপা পড়ে ছিল। কেউ ঘুণাক্ষরেও শব্দটার কথা বলেনি। তাই একপ্রকার বলতে গেলে, আক্ষেপের বশে সেই থেকে শব্দটা সঙ্গে করে নিয়ে চলেছি। সুযোগ পেলে কাউকে না কাউকে সহসা বলে দিই, ‘মুখস্থ নয়, আত্মস্থ করো।’

‘মুখস্থ নয়, আত্মস্থ করো’ এটা মূলনীতি হওয়া উচিত এদেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর। যেমন সিঙ্গাপুরের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো মৌলিক শিক্ষাব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ‘থিংকিং স্কুলস, লার্নিং নেশন’ নামে একটি নীতি অনুসরণ করছে, যাতে বাচ্চারা চিন্তার মাধ্যমে মেধার চর্চা করতে পারে। অন্যদিকে এদেশে বাচ্চাদের বলা হয়, ‘সারা দিন বই নিয়ে পড়ে থাকো, না পারলে মুখস্থ করো, না বুঝলেও মুখস্থ করো।’ এর ফলে এখানকার শিশুরা গণিতের মতো বিষয়ও মুখস্থ করে, কারণ সামনে পরীক্ষা আসন্ন। পরীক্ষায় তো পাস করতে হবে। পেতে হবে জিপিএ-৫, নাহলে যে বন্ধু, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবার কাছে কদর কমে যাবে। মা-বাবা বকবে, হীনম্মন্যতায় ভুগবে তারা। অনেক চাপ মাথার ভেতর। আর তাই না বুঝে মুখস্থ করা ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই।

প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত কোনো শিক্ষার্থীকে এত বেশি পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয় যে সময় নিয়ে কোনো কিছু অনুধাবন ও বিশ্লেষণ করার সুযোগ তার অবশিষ্ট থাকে না। ফলে জানার আগ্রহ, শেখার আগ্রহ, বোঝার আগ্রহ ও সৃষ্টির আগ্রহ মরে যায়। তখন তার মধ্যে একটাই আতঙ্ক কাজ করে পরীক্ষা। ইউনেস্কোর এক প্রতিবেদনে দেখেছি, বাংলাদেশে তৃতীয় শ্রেণির অর্ধেকের বেশি শিশু বাংলা রিডিং পড়তে পারে না। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অঙ্ক করতে পারে না, জানে না নামতা। অন্যদিকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলার ও ৬৮ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতের নির্ধারিত ধারণাগুলো অর্জন না করেই প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শেষ করে। শিশুদের কথা ছেড়ে দিলাম, কিশোরদের কথা বলা যাক। আমার টিউশনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, কলেজপড়ুয়া সর্বাধিক শিক্ষার্থী ক্রিয়াপদ (ভার্ব) ও কাল (টেনস) বোঝে না। বাক্য গঠন করতে পারে না। ইংরেজিতে দু’লাইন লিখতে পারে না। তারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে না পারে বাংলা, না পারে ইংলিশ। না পারার কারণ তারা পরীক্ষার উদ্দেশ্যে পড়ে, জানার উদ্দেশ্যে নয়; জানার উদ্দেশ্যে পড়লে তারা পারত। যেমন গল্প-উপন্যাস আমরা জানার উদ্দেশ্যে প্রচণ্ড উৎসাহ নিয়ে পড়ি বলে গল্পের কোথায় কী আছে, কে কোন সংলাপ দিয়েছে, তা কখনও ভুলি না; কিন্তু পড়াশোনার ক্ষেত্রেÑআজ পড়লে কাল ভুলে যাই।

পরীক্ষা ও মুখস্থ একে অপরের পরিপূরক, যা মেধাচর্চার জন্য ধ্বংসাত্মক। না বুঝে মুখস্থ করা এবং তথাকথিত ঘনঘন পরীক্ষায় বসার ঘেরাটোপ থেকে বের হতে পারেনি শিক্ষার্থী ও শিক্ষাব্যবস্থা। ‘মুখস্থ নয়, আত্মস্থ করো’ এ কথাটি যেমন কোনো বিদ্যালয়ের দেয়ালে আমার চোখে পড়েনি; তেমনি ‘পরীক্ষার উদ্দেশ্যে নয়, জানার উদ্দেশ্যে পড়ো’ এ কথাটিও কোনো বিদ্যালয়ের দেয়ালে দেখিনি। দেখব কী করে? আমাদের বিদ্যালয়গুলো মানেই তো পরীক্ষালয়। স্কুলের পরীক্ষা, কোচিংয়ের পরীক্ষা, গৃহশিক্ষকের পরীক্ষা, মডেল টেস্টের পরীক্ষাসহ কত সব পরীক্ষা! অথচ বিদ্যালয়ের দেয়ালে দেখেছি রাজনৈতিক ব্যক্তিদের রাজনৈতিক বাণী, দেখেছি অপ্রাসঙ্গিক উক্তির হৈ-হৈ রৈ-রৈ কাণ্ড।

‘শাস’ নামক সংস্কৃত ধাতু থেকে বাংলা ‘শিক্ষা’ শব্দটি এসেছে, যার অর্থ শাসন করা বা উপদেশ দান করা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় ‘শিক্ষা হলো তা-ই যা আমাদের কেবল তথ্য পরিবেশনই করে না, বিশ্বসত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে।’ সেই বিশ্বসত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্ঞানার্জনের প্রাথমিক সিঁড়ি বা প্রথম ধাপ হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা; হাতেখড়িও বলা চলে, যার অপর নাম মৌলিক শিক্ষা। মৌলিক শিক্ষা বলতে বোঝায় সর্বজনীন অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা, সবার জন্য যা সমান আবশ্যিক। ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত আবশ্যিক শিক্ষার কথা বলেছে ইউনেস্কো। সেই শিক্ষাব্যবস্থায় জড়তা থাকবে কেন? জিপিএ-৫ পাওয়ার অন্যায় চাপ থাকবে কেন? অসুস্থ প্রতিযোগিতা, আতঙ্ক, ভয় ও আত্মহননের প্রবণতা থাকবে কেন? বৈষম্য থাকবে কেন?

বৈষম্য তৈরি করে পরীক্ষা। ভালো শিক্ষার্থী ও খারাপ শিক্ষার্থীর ট্যাগ লাগিয়ে দেয় ঘনঘন পরীক্ষা পদ্ধতি। এই হতাশা কোনো শিক্ষার্থীকে ভেতরে ভেতরে শেষ করে দেয়। আর এই শেষ যদি হয় প্রাথমিক শিক্ষাজীবন থেকে, তবে তো পৃথিবীর পথ ধরে হাঁটার শুরুতেই সে পঙ্গু; বাকি পথ হাঁটবে কীভাবে! কোনো কোনো শিক্ষার্থীর এই হতাশা কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লেগে যায়। অধিকাংশ শিক্ষার্থী কাটিয়ে উঠতে পারে না। তাই বাধ্য হয়ে বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ। এ বছর সমাপনী ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেটের বিষাক্ত ফলাফলের ছোবলে অনেক শিশু আত্মহত্যা করেছে। মৌলিক শিক্ষার কড়াঘাতে তারা অতিষ্ঠ হয়ে আত্মহত্যা করেছে।

‘আত্মহত্যা করেছে শিশুরা’ এ কথাটিই আমি বিশ্বাসের সঙ্গে মেনে নিতে পারি না। তার পরও বুকে পাথর বেঁধে স্বীকার করতে হয়, ‘হ্যাঁ শিশুরা আত্মহত্যা করেছে এবং তা করেছে কেবল মৌলিক শিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে।’ পঞ্চম শ্রেণির কোনো শিক্ষার্থী বুঝে উঠতে পারে না জীবন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান; কিন্তু সে বুঝে ফেলেছে, অর্থহীন-আনন্দহীন একঘেয়ে জীবনের শেষ শব্দটি হলো ‘আত্মহত্যা’। এর চেয়ে দুঃখজনক ও অবিশ্বাস্য ঘটনা আর কী হতে পারে এ জগতে? অ্যারিস্টটল বলেছেন, ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করাই হলো শিক্ষা।’ কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শিশুদের মন অসুস্থ করে তুলছে। কোমলমতি শিশুগুলোকে পরীক্ষা নামক বর্বরতার চাকায় পিষ্ট করে শিশু শিক্ষাপদ্ধতির ধ্বজা উড়িয়ে বেড়ায় যারা, তারা রীতিমতো সন্ত্রাসী। শিক্ষার্থী আত্মহত্যার প্ররোচনায় তাদের প্রত্যক্ষ মদত রয়েছে।

‘শিশুদের তো এ বয়সে হতাশায় ডুবে যাওয়ার কথা ছিল না; আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার কথাও ছিল না। তবে কেন আত্মঘাতী হওয়ার পথ বেছে নিল কয়েকটি শিশু?’ এ প্রশ্নটি শিক্ষাসংস্কারক তথা সরকারের প্রতি বিনীতভাবে জানতে চাই।

শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

a.adrianaritroÑgmail.com

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ ➧

সর্বশেষ..