মত-বিশ্লেষণ

শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা ও প্রতিকার

অখিল পোদ্দার: জন্মের পর নবজাতকের দিনে সাত-আটবার পায়খানা স্বাভাবিক। এর কম হলে অথবা পায়খানা যদি শক্ত হয়, তাহলে কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণ। সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছরের শিশুর মধ্যে কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা বেশি দেখা দেয়। অনেক অভিভাবকই শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যাটি বুঝতে পারেন না। তাই এ বিষয়ে মা-বাবার সচেতন হওয়া খুবই জরুরি।

তিন বছরের বেশি বয়সী কোনো শিশু যদি সপ্তাহে তিনবারের কম পায়খানা করে, পায়খানা যদি খুব শক্ত হয়, মলদ্বারে ব্যথা হয়, তবে তাকে কোষ্ঠকাঠিন্য বলা হয়। এছাড়া কিছু রোগের উপসর্গেও কোষ্ঠকাঠিন্য হয়। স্কুলে পায়খানা চেপে রাখলে বা বাথরুম ব্যবহার না করলে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। শিশুর জন্মের ছয় মাস পর যখন স্বাভাবিক নরম খাবার খাওয়া শুরু করে, তখনও কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। স্বাভাবিক খাবার শুরু করলে শিশুর শরীরে এনজাইম পরিপূর্ণভাবে কাজ করে না; ফলে সাময়িকভাবে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। যে খাবার শরীরে পানি ধরে রাখতে পারে না, সে খাবারে শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য হয়। কার্বোহাইড্রেট, পনির, আলু, ফাস্টফুড প্রভৃতি খাবারে শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা বেশি হয়। ফাইবার-সমৃদ্ধ খাবার, যেমন- শাকসবজি, ফলমূল কোষ্ঠকাঠিন্য রোধে সহায়ক।

কোষ্ঠকাঠিন্যে শিশুর পায়খানা করতে কষ্ট হয় এবং অনেক সময় পায়খানার রাস্তায় রক্তক্ষরণ হয়। পায়খানা করতে ব্যথা পায় বলে শিশু ভয়ে পায়খানা করতে চায় না, পায়খানা চেপে ধরে রাখে। এতে কোষ্ঠকাঠিন্য আরও বাড়ে। এ থেকে অ্যানালফিশার হতে পারে। শিশুকে নিয়মিত পায়খানা করার অভ্যাস শেখাতে হবে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর হালকা গরম পানীয় খেলে অন্ত্রের মুভমেন্ট বেড়ে যায়। তখন সে পায়খানা করবে। খাবার খাওয়ার ৩০ মিনিট পর টয়লেটে বসালে শিশু পায়খানা করতে আগ্রহী হবে। টয়লেট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকাও বাঞ্ছনীয়।

কোষ্ঠকাঠিন্য হলে শিশু খাওয়া-দাওয়া কমিয়ে দেয়, অস্বস্তিতে ভোগে। শিশুর এই অস্বস্তি মায়েদের উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে দেয়। অনেক সময় তারা শিশুকে হাসপাতালে না নিয়ে গ্রাম্য কবিরাজ বা হাতুড়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। এর ফল হতে পারে মারাত্মক। পরপর তিন দিন শক্ত পায়খানা হলে, মলত্যাগ করতে অসুবিধা হলে অথবা বেশি সময় লাগলে এক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কোষ্ঠকাঠিন্যের সবচেয়ে বড় কারণ অপর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ। যেসব শিশু কৌটার দুধ পান করে, তাদের এ সমস্যা বেশি হয়। এছাড়া পানি কম পান করলে, অল্প বয়সেই গরুর দুধ খেলে, মলদ্বারের মাংসপেশির ত্রুটি থাকলে, শিশু মানসিক প্রতিবন্ধী হলে, সেরিব্রাল পলসি, ক্যালসিয়াম ও অতিরিক্ত ভিটামিন ডি গ্রহণের ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য হয়।

পায়খানার ব্যাপারে শিশুর সামনে উদ্বেগ প্রকাশ করা এবং পায়খানা করছে না বলে বকাবকি করা উচিত নয়। প্রয়োজনে সময়মতো পায়খানার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। বুকের দুধ খাওয়ালে কোষ্ঠকাঠিন্য হয় না। তাই দুবছর বয়স পর্যন্ত শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। দুবছর বয়সের পর কৌটার দুধ খাওয়ালেও কৌটার গায়ে নির্দেশিত নিয়মানুযায়ী দুধ তৈরি করে খাওয়াতে হবে। এর সঙ্গে প্রচুর পানিও খাওয়াতে হবে।

একটু বড় শিশুকে মধু, দুধ, সাগু খাওয়ালে উপকার পাওয়া যায়। আঁশযুক্ত খাবার, শাকসবজি, পাকা কলা, বেল, পেঁপে, আম প্রভৃতি খাবারে উপকারে পাওয়া যায়। শিশু মলত্যাগের সময় ব্যথা অনুভব করলে তাকে জোর না করে চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে।

কোষ্ঠকাঠিন্যে পেটে ব্যথা হয়। এছাড়া পেট শক্ত হয়ে থাকা বা পেট ফুলে থাকা, পেটের ওপর হাত দিলে শক্ত মল অনুভূত হওয়া, ক্ষুধামান্দ্য দেখা দেওয়া, শিশু খেতে না চাওয়া, খাওয়া-দাওয়ায় অনীহা, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া, ওজন কমে যাওয়া প্রভৃতি লক্ষণ কোষ্ঠ্যকাঠিন্যের ক্ষেত্রে দেখা যায়।

শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য রোধে খাদ্যতালিকায় আঁশজাতীয় খাবার রাখার রাখা উচিত। আঁশজাতীয় খাবার পরিপাকতন্ত্রের জলীয় অংশ শোষণ করে ধরে রাখে এবং এই জলীয় অংশসহ আঁশজাতীয় খাবারের বর্জ্য অংশগুলো পায়খানার সঙ্গে বের হয়ে যায়। এতে পায়খানা নরম হয় এবং কাষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করা যায়। লালশাক, কচুশাক, মিষ্টিআলুর শাক, কলমিশাক, পুদিনাপাতা, পুঁইশাক, মুলাশাক, ডাঁটাশাক, লাউ ও মিষ্টিকুমড়ো প্রভৃতিতে প্রচুর আঁশ রয়েছে। এসব খাবার শিশুকে খেতে অভ্যস্ত করা উচিত।

পানি খাবার হজমে সহায়তা করে। বেশি পানি খেলে পায়খানা পরিষ্কার হয় এবং শরীর নতুন করে খাবার থেকে পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে সহজেই। প্রতিদিন শিশুকে বেশি করে পানি খাওয়াতে হবে। শিশু পানি খেতে না চাইলে শরবত, তাজা ফলের জুস বা স্যুপ খাওয়ানো যেতে পারে।

একটি নির্দিষ্ট সময়ে শিশুর মলত্যাগের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। অনেক শিশুই মলত্যাগের সময় একটু প্রাইভেসি পছন্দ করে। টয়লেট ব্যবহার করতে শেখেনিÑএমন বাচ্চাকে ঘরের এক কোণে পটিতে বসিয়ে দিয়ে হবে, যাতে সে প্রাইভেসি অনুভব করে।

শিশুর পছন্দের বাথরুমের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক শিশুই তার নির্দিষ্ট পছন্দের বাথরুম ছাড়া অন্য কোথাও বাথরুম করতে পছন্দ করে না। এছাড়া ফাস্টফুড বা চর্বিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। অনেক শিশুরই ফাস্টফুড ও মাংসজাতীয় খাবার খুব প্রিয়। কোষ্ঠকাঠিন্য রোধে শিশুকে এ-জাতীয় খাবার কম দেওয়া উচিত। শিশুর মঙ্গলের জন্য এ বিষয়ে মা-বাবাকে অবশ্যই লক্ষ রাখতে হবে।

দুধের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা প্রয়োজন। অনেক শিশুই দুধ খেতে পছন্দ করে। দুধ খাওয়ার কারণে অন্য খাবার খেতে চায় না, বিশেষ করে আঁশজাতীয় খাবার। এক বছরের বেশি বয়সের শিশুকে দৈনিক আধা লিটার (১৬ আউন্স) থেকে পৌনে এক লিটারের (২৪ আউন্স) বেশি দুধ খেতে দেওয়া ঠিক নয়। দুধ বেশি খাওয়ার কারণে শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে। এজন্য শিশুকে পরিমাণমতো দুধের সঙ্গে অন্য খাবার, বিশেষ করে আঁশজাতীয় খাবার খেতে উৎসাহিত করতে হবে।

শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য রোধে প্রতিদিন তার খেলাধুলার ব্যবস্থা করা উচিত। কায়িক পরিশ্রমের খেলাধুলা করতে শিশুকে উৎসাহিত করতে হবে। শিশু সারা দিন যদি শুয়ে-বসে কাটায়, তাহলে তার নড়াচড়া কম হবে। শারীরিক কার্যক্রম না হলে অন্ত্রে নড়াচড়াও স্বাভাবিক হবে না। তাই এ ব্যাপারে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে অভিভাবককে।

সাধারণত জ্বর, সর্দি, কাশি বা যে কোনো রোগের জন্য শিশুকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খাওয়াতে হবে। লক্ষ রাখতে হবে, কোনো ওষুধের কারণে শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য হচ্ছে কি না। যদি হয়, তাহলে তা বন্ধ করে চিকিৎসককে জানাতে হবে। কোষ্ঠকাঠিন্য রোধে শিশুকে রাতের খাবারের পর ইসুপগুলের ভুষি গরম দুধে মিশিয়ে অথবা নিয়মিত খেজুর খাওয়ানো যেতে পারে। খেজুর পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ এবং খাদ্য পরিপাকে সাহায্য করে।

শিশুর মলত্যাগে কষ্ট বা কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ে সমস্যায় পড়েননি এমন মা-বাবা খুব কমই রয়েছেন। তবে এ অবস্থায় মা-বাবা অস্থিরতায় না ভুগে শিশুকে আঁশযুক্ত সুষম খাবারের সঙ্গে প্রচুর পরিমাণ পানি খাওয়াতে হবে। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশু শারীরিক পরিশ্রম করছে কি না, সেদিকে নজর রাখতে হবে। যদি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় কাজ না হয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। মা-বাবা একটু সচেতন হলেই শিশুকে অনেক সমস্যা থেকে সহজেই মুক্তি দেওয়া সম্ভব।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..