দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

শিশুর জন্য সামাজিক পরিবেশ

শায়লা রহমান তিথি: শিশুর মানসিক বিকাশে পরিবেশের প্রভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে শিশু যে রকম সামাজিক পরিবেশে বড় হয়, তার মানসিকতাও সেভাবে গড়ে ওঠে। শিশুর পারিবারিক পরিবেশ, তার পরিচিত গণ্ডি ও আত্মীয়-স্বজন সবার একটা প্রভাব শিশুর ওপর পড়ে। এমনকি এই বলয়ের মধ্যে তার স্কুলের শিক্ষক, প্রতিবেশী ও বন্ধুবান্ধব সবার সম্মিলিত প্রভাবে শিশুর ভেতর একটি মনস্তত্ত্ব গড়ে ওঠে। শিশু ধীরে ধীরে তার পড়াশোনা ও বয়সের পাশাপাশি তার চারপাশের সামাজিক পরিবেশ থেকে যে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান লাভ করে, তা-ই তার মানসে একটি আসন তৈরি করে নেয়।

খুব ছোটবেলায় স্কুলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত পরিবারের সবার কাছ থেকে শিশু যে ধরনের আচরণ পেয়ে থাকে, সেই আচরণের ওপর ভিত্তি করে তার নিজের ভেতর একটা ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়। তারপর যখন সে স্কুলে যেতে আরম্ভ করে, তখন তার সঙ্গে যোগ হয় স্কুলের শিক্ষকদের আচরণ। তখন পরিবারের পাশাপাশি শিক্ষকদের আচরণও তার ব্যক্তিত্ব নির্মাণে প্রভাব তৈরি করে। আমাদের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজ বাস্তবতায় শিশুর জীবনের সাফল্য বা ব্যর্থতার পেছনে পড়াশোনায় তার যোগ্যতাই একমাত্র নির্ধারক বলে বিবেচিত হয়, যার কারণে আমরা শুধু ‘এ প্লাস’-এর দিকে ছুটতে ছুটতে শিশুর মনের ওপর একটা চাপ তৈরি করি। একটা শিশুশ্রেণির ছাত্রের নিজের ওজনের চেয়ে তার ব্যাগের ওজন বেশি হয়ে যায়। অথচ একটা সময় বাল্যশিক্ষা পড়ে শিশু বেড়ে উঠত ছয়-সাত বছর বয়স পর্যন্ত। তখন যে নৈতিক শিক্ষায় শিশু তার মানসিক বিকাশের সুযোগ পেত এখন সেটা নেই। তার ওপর বইয়ের বোঝা চাপাতে চাপাতে আমরা শিশুটিকে যন্ত্রে পরিণত করছি। এ যন্ত্র বড় হয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের হাল ধরবে যন্ত্রের মতোই। কাজেই শিশুর মানবিক বিকাশকে প্রাধান্য দিতে হবে ছোটবেলা থেকেই। তা না হলে এ শিশুরা একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারবে কি না, সে বিষয়ে একটা বড় ধরনের প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এরই মধ্যে আমরা এর কুফল বোধ হয় কিছুটা প্রত্যক্ষ করতে শুরু করেছি।

যখন শিশুর মনের বিকাশ অপেক্ষা ফলাফলভিত্তিক পড়াশোনার ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়, তখন তার মনস্তত্ত্বে একটা ভুল বার্তা যায়। সে মনে করে রোবটের মতো মুখস্থবিদ্যা তাকে যে করেই হোক রপ্ত করতে হবে। তারাই গাণিতিক সূত্র অনুযায়ী তথাকথিত ভালো ছাত্র হয়ে ভালো নম্বর নিয়ে পাস করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আসন গ্রহণ করে রোবটীয় আচরণ করে থাকে। জনগণ তাদের কাছে মানবিক আচরণ পায় না। তাই খুব খেয়াল করতে হবে শৈশব থেকে। পড়াশোনায় দক্ষতা অর্জন সমগ্র বিষয়ের একটি অংশমাত্র। এর পাশাপশি শিশুকে গড়ে তুলতে হবে মানবিক গুণাবলি দিয়ে। শিশুর শৈশব তার ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করে। যে শিশুটি ভালো পরিবেশ থেকে উঠে আসে, তার মন-মানসিকতা ভালো হয়। বাবা-মায়ের আচরণ, শিক্ষকের আচরণ ও বন্ধুদের আচরণ তার ভেতরে প্রভাব ফেলে। পরিবার ও আশেপাশের পরিবেশ যখন ভালো হয়, সে শিশু বড় হয়ে অনায়াসে সমাজে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে। ভালো আচরণ দেখে দেখে বড় হওয়া শিশু বড় হয়ে সবার সঙ্গে ভালো আচরণই করবে।

শিশুকে তার অনুভূতি প্রকাশে বাধা দেওয়া যাবে না। সঠিকভাবে অনুভূতি প্রকাশে বাধাগ্রস্ত হলে শিশু অন্তর্মুখী হয়ে উঠতে পারে। এটি মানসিক বিকাশের পরিপন্থি। শিশুরা প্রতিনিয়ত যাদের সংস্পর্শে আসে, যেমন মা-বাবা, ভাই-বোন, দাদা-দাদি, নানা-নানি, শিক্ষকমণ্ডলীÑসবাইকে নিয়ে সে তার একটা মনোজগৎ তৈরি করে। এ জগতের সবার সম্মিলিত আচরণই শিশুর আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই শিশুর জন্য সবাই মিলে একটি উত্তম সামাজিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে একটি শিশু বেড়ে ওঠে আগামী দিনের মুক্তমনা নাগরিক হিসেবে।

আজকের শিশুকে আগামী দিনের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে তার জন্য একটি উপযুক্ত সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলা আবশ্যক। কিন্তু এতসব জটিল সমীকরণ সামনে রেখে শিশুদের জন্য একটি সর্বজনীন সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা সত্যি কঠিন একটি কাজ। তারপরও কাজ যত কঠিনই হোক, সেটি অসম্ভব মোটেই নয়। এ সত্যকে সামনে রেখে দেশের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে শিশুবান্ধব নীতি-কৌশল প্রণয়ন করেছে বর্তমান সরকার এবং এ নীতি-কৌশল বাস্তবায়ন করা হচ্ছে একাধিক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে দেশের সব শিশুর জন্য অভিন্ন ও সর্বজনীন বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সারা দেশের শিশু এক ও অভিন্ন মানসিকতায় গড়ে ওঠার সুযোগ পাবে। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের বহু আগেই ১৯৭৪ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার শিশু আইন প্রণয়ন করেছে। তাঁর সরকার একই সঙ্গে সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে জাতীয়করণ করে শিশুদের একটি উন্নত ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। 

বাংলাদেশ ১৯৯০ সালে জাতিসংঘ শিশু অধিকার কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০১১ সালে জাতীয় শিশুনীতি গ্রহণ করেছে এবং ২০১৩ সালে শিশু আইন প্রণয়ন করে শিশুর জন্য একটি উন্নত শিক্ষা ও সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করে।

বর্তমান সরকার জাতীয় বাজেটে শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে জাতীয় শিশু নীতির মাধ্যমে। পাশাপাশি শিশুর প্রারম্ভিক যতœ ও বিকাশে সমন্বিত নীতি ২০১৩, জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কৌশলপত্র ২০১৫, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায়ও শিশু উন্নয়নের নানা বিষয়ে দিকনির্দেশনা রয়েছে।

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সুরক্ষার জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্প দুটি হচ্ছেÑ‘চাইল্ড সেনসিটিভ সোশ্যাল প্রটেকশন ইন বাংলাদেশ’ ও ‘সার্ভিসেস ফর দ্য চিলড্রেন অ্যাট রিস্ক’। এ প্রকল্পগুলোর উদ্দেশ্য হচ্ছে শিশুর সামাজিক সুরক্ষা প্রদান করা এবং শিশু নির্যাতন, অবহেলা, শোষণ ও পাচার রোধ করা। এছাড়া পিতৃমাতৃহীন ও এতিম শিশুদের ভরণপোষণ, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং উপযুক্ত মর্যাদায় সমাজে পুনর্বাসনের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে সরকারি শিশু পরিবার পরিচালনা করছে বর্তমান সরকার।

সরকারের এসব উদ্যোগের পাশাপাশি দেশের সব নাগরিক নিজ নিজ অবস্থান থেকে আমাদের শিশুদের জন্য একটি অনুকূল সামাজিক পরিবেশ তৈরিতে সচেষ্ট থাকলেই আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাব আমাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..