মত-বিশ্লেষণ সুশিক্ষা

শিশুর পুষ্টিকর খাবার

আফরোজা খাতুন: বর্তমান সময়ে আমরা সবাই বেশিরভাগ সময় বাড়িতেই কাটাচ্ছি এবং আমাদের জীবনযাপনেও পরিবর্তন এসেছে। আর এই সময়ে আমরা মায়েরা সন্তানের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, তার সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা এবং সারাদিন যেন কর্মক্ষম থাকে সেই বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তিত। তাই কয়েকটি বিষয়ের সমন্বয় ঘটানো খুবই জরুরি। যেমনÑসন্তানের পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, শরীর চর্চা এবং মনকে প্রফুল্ল রাখা।

মানবজীবনে শিশুকাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ সময়েই শারীরিক ও মানসিক বিকাশ পরিপূর্ণতা লাভ করে। তাই এ বয়সে শিশুর খাদ্য ও পুষ্টি এবং স্বাস্থ্য পরিচর্যার প্রতি লক্ষ্য রাখা অপরিহার্য।

শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরপরই তাকে মায়ের প্রথম দুধ বা শালদুধ খেতে দিতে হবে। কেননা নবজাতক শিশুর জন্য এই শাল দুধ পৃথিবীর সেরা পুষ্টিকর, নিরাপদ ও উপকারী খাদ্য। এতে রয়েছে পরিমিত প্রোটিন ও শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার প্রয়োজনীয় উপাদান। নবজাতক শিশুর জন্য মায়ের দুধ ছাড়া অন্য কোনো খাবারের প্রয়োজন নেই। শিশুর জন্য অত্যাবশ্যকীয় সব পুষ্টি উপাদান যেমনÑপ্রোটিন বা আমিষ, শর্করা, চর্বি ফ্যাট, বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি মায়ের দুধে সঠিক পরিমাণে বিদ্যমান থাকে। তাই জšে§র পর থেকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু মায়ের বুকের দুধ খাওয়ালে শিশুকে অপুষ্টিজনিত বিভিন্ন রোগের হাত থেকে রক্ষা করা যায়। মায়ের বুকের দুধ পান করার ফলে শিশুর দেহে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।

শিশুর বয়স ছয় মাস পূর্ণ হলে শুধু মায়ের দুধে তার শরীরের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটে না। তাই ছয় মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরই শরীরের প্রয়োজন মেটানোর জন্য মায়ের দুধের পাশাপাশি শিশুকে বাড়তি খাবারও খাওয়ানো উচিত। বাড়তি খাবার যেন শিশুর উপযোগী হয় এবং পুষ্টির প্রতিটি উপাদানই যেন শিশুর প্রয়োজনীয় অনুপাতে থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এ সময় শিশুকে নরম ভাত, গাঢ় সবুজ ও হলুদ রঙের শাকসবজি, নরম খিচুড়ি, রান্না করা সুজি, নরম করে সিদ্ধ ডাল, মাছ, মাংস ও ডিম, পাকা কলা ও পেঁপে তার উপযোগী করে খাওয়াতে হয়।

শিশুর দেহের ক্ষয়পূরণ, পুষ্টি সাধন এবং দেহকে সুস্থ-সবল ও নিরোগ রাখার জন্য ফলমূল ও শাকসবজি অতি প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্য। ফলের মধ্যে সব ধরনের পুষ্টি উপাদান কমবেশি রয়েছে। কিন্তু ভিটামিন ও খনিজ লবণ এবং সহজে আত্তীকরণযোগ্য শর্করা অধিক পরিমাণে বিদ্যমান থাকে। অপরদিকে শাকসবজিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ ছাড়াও ক্যালসিয়াম, লৌহ, আয়োডিন প্রভৃতি অতি প্রয়োজনীয় খনিজ লবণ রয়েছে। শিম ও বিচি জাতীয় সবজিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন রয়েছে। তাছাড়া গাঢ় সবুজ ও হলুদ রঙের শাকসবজি, বিশেষ করে কচুশাক, পুঁইশাক, ডাঁটাশাক, লালশাক, পালংশাক, টমেটো, গাজর ও মিষ্টি কুমড়াতে প্রচুর ক্যারোটিন থাকে। ক্যারোটিন দেহে ভিটামিন ‘এ’ উৎপন্ন হয়। কাজেই দেখা যায়, শিশুর দেহের পুষ্টি চাহিদা পূরণে শাকসবজি ও ফলমূল কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ফল রান্না ছাড়া সরাসরি খাওয়া যায় বলে এতে বিদ্যমান পুষ্টি উপাদানসমূহ অবিকৃত অবস্থায় শরীর গ্রহণ করে। নিয়মিত ফল ও শাকসবজি খেলে পুষ্টি সমস্যা দেখা দেয় না। তাই ছোটবেলা থেকেই শিশুর শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

শিশুর চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখা ভিটামিন ‘এ’র প্রধান কাজ। ভিটামিন ‘এ’র অভাবে শিশুর রাতকানা রোগ হয়। এমনকি অনেকে রাতকানা রোগে ভুগতে ভুগতে অন্ধও হয়ে যায়। তাই শিশুকে রাতকানা ও অন্ধত্বের হাত থেকে রক্ষা করতে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ গাঢ় সুবজ ও হলুদ রঙের শাকসবজি এবং ফলমূল, বিশেষ করে পাকা আম, কাঁঠাল, পেঁপে, পেয়ারা, আনারস, কচুশাক, পুঁইশাক, ডাঁটাশাক, লালশাক, পালংশাক, গাজর, টমেটো, মিষ্টিকুমড়া ইত্যাদি নরম করে খাওয়াতে হবে। শিশুর দেহের ভিটামনি ‘সি’-এর চাহিদা পূরণে বাড়তি খাবারের সঙ্গে প্রতিদিন পাতিলেবু, কাগজিলেবু ও বাতাবিলেবুর রস খেতে দিতে হবে। এছাড়া সহজলভ্য মৌসুমি ফলমূল এবং শাকসবজি থেকেও ভিটামিন ‘সি’ পাওয়া যায়।

শিশুর দেহের হাড় ও দাঁতের স্বাভাবিক গঠন এবং সুস্থতার জন্য ক্যালসিয়াম প্রয়োজন। সব ধরনের সবুজ শাকসবজি ও ফলমূলে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম থাকে। তাই শিশুদের নিয়মিত ফলমূল ও শাকসবজি খেতে দিতে হবে। লৌহের অভাবে শিশুদের অপুষ্টিজনিত রক্তশূন্যতা রোগ দেখা দেয়। এজন্য শিশুর বয়স পাঁচ পূর্ণ হলেই শিশুকে কচুশাক, কাঁচকলা, ডাঁটাশাক, পুঁইশাক, লালশাক, পালংশাক এবং অন্যান্য সবুজ শাকসবজি ও প্রত্যহ কিছু না কিছু টাটকা ফল বা ফলের রস খাওয়াতে হবে। আয়োডিনের অভাবে শিশু হাবাগোবা, বামন ও ট্যারা দৃষ্টিসম্পন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাছাড়া এর অভাবে শিশুর দৈহিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়। এজন্য শিশুদের সামুদ্রিক মাছ ছাড়াও আয়োডিনযুক্ত লবণ, শাকসবজি ও তাজা ফলমূল খাওয়াতে হবে। শিশুদের সব ধরনের খাবার তৈরির সময় আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করা উচিত।

বর্তমানে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন ২০২১। সারাদেশের সব শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এই সময় ৬ থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুকে একটি করে নীল রঙের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল এবং ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুকে একটি করে লাল রঙের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিনামূল্যে খাওয়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের সহায়তায় জন্মের পরপরই (১ ঘণ্টার মধ্যে) শিশুকে শাল দুধ খাওয়ানোসহ প্রথম ৬ মাস শিশুকে শুধু মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো এবং শিশুর বয়স ৬ মাস পূর্ণ হলে মায়ের দুধের পাশাপাশি ঘরে তৈরি পরিমাণ মতো সুষম খাবার খাওয়ানোর বিষয়ে প্রচারাভিযান চালানো হচ্ছে। ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল শিশুর সার্বিক বিকাশে বিশেষ করে রাতকানা রোধে অত্যন্ত কার্যকর।

পুষ্টিসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার। এর মধ্যে সূচনা প্রকল্পটি ২০১৫ থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই প্রকল্পটির লক্ষ্য হচ্ছে দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে খর্বাকৃতির হার কমিয়ে আনা। হাওর এবং অপেক্ষাকৃত কম অগ্রসরমান জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আড়াই লাখ পরিবারকে এ প্রকল্পের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

জাতীয় সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও রূপকল্প ২০২১-এর আলোকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রণীত পাঁচ বছর মেয়াদি ‘চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি কর্মসূচি ২০১৭-২০২২’-এর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এ কর্মসূচিটি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’র স্বাস্থ্যবিষয়ক সূচকগুলো অর্জনে এ উন্নয়ন কর্মসূচি বিরাট ভূমিকা রাখবে।

একটি সুস্থ ও স্বাস্থ্যবান শিশুই জাতির ভবিষ্যৎ। শিশুর পুষ্টিহীনতা বাংলাদেশের একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা। সুস্বাস্থ্য নিয়ে সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠা প্রতিটি শিশুর জš§গত অধিকার। তাই প্রতিটি শিশুকে পুষ্ট ও স্বাস্থ্যবান করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে জšে§র পর থেকে তাকে মায়ের দুধ এবং ছয় মাস বয়স পূর্ণ হওয়ার পরই মায়ের দুধের পাশাপাশি শাকসবজি ও ফলমূলসহ অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার খেতে দিতে হবে। এর ফলে শিশু ভবিষ্যতে একজন সুস্থ-সবল, কর্মক্ষম ও বুদ্ধিমান নাগরিক তথা দেশ ও সমাজের জন্য সম্পদ হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে। সুস্থ, সবল, সুন্দর শিশুদের নিয়ে সফল দেশ সগর্বে দাঁড়াবে বিশ্বমানচিত্রে মাথা উঁচু করে।

পিআইডি নিবন্ধন

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..