মত-বিশ্লেষণ

শিশুর পুষ্টি চাহিদা পূরণে পরিপূরক খাবার

আফরোজা নাজনীন : ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ১১ মাস বয়সের শিশু সালমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সালমার ওজন মাত্র সাড়ে ৩ কেজি। সালমার বাবা একজন রিকশাচালক। পরিবারের খাদ্য-নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি ঘন ঘন ডায়রিয়া ও অন্যান্য রোগের সংক্রমণ শিশুটির ওজন কম হওয়ার কারণ বলছেন চিকিৎসকরা। শিশুটি মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে। সে অনুসারে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ২০ দিন প্রয়োজনীয়  চিকিৎসার পর শিশুটি সুস্থ হয়ে ওঠে। হাসপাতাল ছাড়ার সময় তার ওজন আরও ২ কেজি বেড়েছে। চিকিৎসকরা জানান, চরম অপুষ্টিতে সালমার মৃত্যুও ঘটতে পারত। কারণ একটি সুস্থ শিশুর তুলনায় মারাত্মক অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর মৃত্যুর আশঙ্কা চারগুণ বেশি।

অপুষ্টি আর অসংক্রামক রোগ বাংলাদেশের জন্য এখনও বড় স্বাস্থ্যসমস্যা। তবে বিশ্ব খাদ্য সংস্থার বৈশ্বিক ক্ষুধা ও পুষ্টি পরিস্থিতি প্রতিবেদন-২০১৯ বলছে, বাংলাদেশে তীব্র ও মাঝারি ধরনের ক্ষুধায় থাকা মানুষের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে। তীব্র ক্ষুধা বলতে বোঝায় যারা এক বেলার বেশি খাবার পায় না। আর মাঝারি বলতে বোঝায় যারা দুই বেলার বেশি খাবার পায় না। ২০১৭ সালে তীব্র ক্ষুধায় থাকা মানুষের সংখ্যা ছিল এক কোটি ৭৮ লাখ। ২০১৮ সালে তা ১০ লাখ কমেছে। তবে ২০১৭-এর তুলনায় ২০১৮ সালে দেশে অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের সংখ্যা কিছু বেড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, খাদ্যশক্তি গ্রহণের দিক থেকে বাংলাদেশ গত ২০ বছরে ধারাবাহিকভাবে উন্নতি করছে। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের মানুষ গড়ে দুই হাজার ২৮৫ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি গ্রহণ করত। আর এখন সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৫১৪ কিলোক্যালরি।

পুষ্টি পরিস্থিতি নিয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, খাদ্য উৎপাদনের পরিকল্পনায় আমরা পুষ্টিকর কৃষিপণ্যের দিকে জোর দিচ্ছি। পুষ্টিযুক্ত ধান, আলু ও অন্যান্য ফসল উৎপাদন বাড়াচ্ছি। এসব খাদ্য নিরাপদ করার ব্যাপারেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে পুষ্টি পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে। তবে বর্তমানে মাতৃপুষ্টির ক্ষেত্রে গর্ভবতী মায়েদের প্রসবপূর্ব চারটির বেশি চেকআপ করানোর হার বেড়েছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিশু স্বাস্থ্যের ওপর। চলতি বছর প্রকাশিত জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও’র) বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতি প্রতিবেদন ও বৈশ্বিক কৃষি পরিসংখ্যান প্রতিবেদন এবং দুটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার তৈরি করা বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) পুষ্টি ইউনিটের পরিচালক মনিরুল ইসলামের মতে, বাংলাদেশে পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নতি কম হওয়ার বড় কারণ খাদ্য সম্পর্কে মানুষের সচেতনতার অভাব। বাজারে সহজলভ্য সবজি, মাছ, ডিম ও দুধ বেশি করে খেলে পুষ্টি পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে। গ্রামে প্রায় প্রতিটি বাড়িতে মুরগি পালন ও সবজি চাষ হচ্ছে, ফলের গাছ সংখ্যাও বাড়ছে। আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ নারীদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করা হচ্ছে। পরিবারে পুষ্টিকর খাবারের জোগান বাড়াতেই এ উদ্যোগ। এখন শহরে অনেক বাড়ির ছাদেও সবজি বাগান হচ্ছে।

নারীর স্বাস্থ্য রক্ষায় সব বয়সে শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই নারীর পুষ্টিহীনতার হার কমবে। কিছু বৈষম্য ও অজ্ঞানতার জন্য নারী অপুষ্টিতে ভোগে। অনেক সময় দরিদ্র পরিবার সুষম খাবার গ্রহণ করতে পারে না। এজন্য সরকার দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির আওতায় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।

ভাতের ওপর নির্ভরতাও দেশে অপুষ্টির বড় কারণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ব্যাপকভাবে দারিদ্র্য কমলেও অপুষ্টির সমস্যা এখনও রয়ে গেছে। এখনও গর্ভবতী নারীরা রক্তশূন্যতায় ভোগেন। মানুষের দৈনিক খাদ্যশক্তি গ্রহণের পরিমাণ বৈশ্বিক মানে আমরা পৌঁছাতে পারেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের দুধ ও মাংস খাওয়ার পরিমাণের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম ১০০টি দেশের মধ্যে নেই। ফিনল্যান্ডের মানুষ প্রতিদিন ৩৬১ মিলিলিটার ও সুইডেনে ৩৫৫ মিলিলিটার দুধ খায়। সেখানে বাংলাদেশের মানুষ খায় দিনে মাত্র ৩৩ দশমিক ৭ মিলিলিটার।

মায়ের দুধ শিশু পুষ্টির প্রধান নিয়ামক। দ্বিতীয় জাতীয় পুষ্টি কর্মপরিকল্পনা ২০২৫-এ মায়ের দুধ খাওয়ানো শিশুর হার ৭০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে এই হার ৬৪ শতাংশ। বাংলাদেশে জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (বিডিএইচএস) ২০১৭-১৮ অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৩১ শতাংশ খর্বকায়। ২০১৪ সালে এ হার ছিল ৩৬ শতাংশ। তবে কৃষকায় ও বয়সের তুলনায় কম ওজনের শিশুর হার কমেছে। দেশে সবজি, ফল ও অন্যান্য আমিষ জাতীয় খাদ্যের পরিমাণ বাড়ছে; ফলে আগামীতে পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নতি হবে। 

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম দেশ হিসেবে সব সয়াবিন তেলে ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত করেছে। এ ছাড়া তিনটি জিংকসমৃদ্ধ চালের জাত উদ্ভাবন করেছে। মূলত দরিদ্র্যের তুলনায় মা-বাবার অসচেতনতায় সন্তানরা বাংলাদেশে তীব্র অপুষ্টির শিকার। অনেকেই জানে না কোন ফল বা সবজিতে কী ধরনের পুষ্টি বিদ্যমান। এ লক্ষ্যেই আইসিডিডিআর.বির পুষ্টিবিজ্ঞানীরা মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে এমন শিশুর জন্য দুটো বিশেষ খাবার তৈরি করেছেন। এর একটি চাল ও ডাল দিয়ে তৈরি। অন্যটি ছোলা দিয়ে তৈরি। খাবার দুটোর নাম দেওয়া হয়েছে স্বর্ণালি ১ ও স্বর্ণালি ২। বাংলাদেশের কমিউনিটি ক্লিনিক, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, হাসপাতাল ও বেসরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে এগুলো পাঠানো হচ্ছে।

এদিকে মায়ের দুধের বিকল্প খাবার খেয়ে শিশুরা অপুষ্টিতে আক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ পেডিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন, শিশু বিশেষজ্ঞ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগ, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব হাসপাতাল ও জেলা সদর হাসপাতালে আসা শিশুদের ওপর জরিপ চালিয়ে জন্মের পর থেকে গুঁড়া দুধসহ বিকল্প শিশুখাদ্য খাওয়ানোর ফলে অপুষ্টিতে আক্রান্ত হওয়ার প্রমাণ পেয়েছে। তাদের মতে, বিকল্প খাদ্য খেয়ে শিশুরা অপুষ্টিতে ভোগে। তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠে না। ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, চর্মরোগ, রক্ত স্বল্পতা, অন্ধত্বসহ নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হয় এসব শিশু।

বর্তমান সরকার শিশুদের মায়ের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে ব্যাপক উৎসাহ দিচ্ছে। এজন্য সরকার মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করেছে। মায়েরা যাতে সন্তানদের বুকের দুধ নির্বিঘেœ খাওয়াতে পারেন সে জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একটি মাতৃদুগ্ধ কর্নার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়মিত প্রচার চালাচ্ছে শিশু জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যেই যেন মায়ের শাল দুধ খাওয়ানো হয় এবং তা একনাগাড়ে ছয় মাস পর্যন্ত যেন অব্যাহত থাকে। 

বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে সচেতনতা আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এমকিউকে তালুকদার বলেন, মায়ের দুধ শিশুর সুস্থভাবে গড়ে তোলার একমাত্র খাবার। মায়ের দুধের বিকল্প হতে পারে না। মায়ের দুধ রোগ প্রতিরোধের প্রতিষেধক। মায়েরা বুঝে না বুঝে বিভ্রান্ত হয়ে জšে§র পর থেকে বুকের দুধের পরিবর্তে গুঁড়া দুধসহ বিকল্প শিশুখাদ্য খাওয়াতে শুরু করেন। এতে মা শিশু উভয়ের জন্য ক্ষতিকর। তাই শিশু জšে§র পর থেকে মায়ের বুকের দুধ ছাড়া বিকল্প শিশু খাদ্য খাওয়ানো বর্জন করতে হবে। এতে পরিবারের অর্থ সাশ্রয় হবে, শিশু হবে বুদ্ধিমান ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..