মত-বিশ্লেষণ

শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

চিত্ত ফ্রান্সিস রিবেরু: সন্তানকে সুস্থ মানসিকতার মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা প্রত্যেক অভিভাবকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সন্তানের মানসিক বিকাশের প্রথম পাঠ মা-বাবার হাতেই। ঘরের মানুষকে দেখেই সন্তান নীতি-নৈতিকতা শেখে। যে শিশু জন্মের পর থেকে আপনজন, শিক্ষক এমনকি প্রতিবেশীর কাছ থেকেও প্রতিনিয়ত নির্যাতন বা নিপীড়নের শিকার হয়, তার কাছে সহিংস আচরণ খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।
শিশুরা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হতে পারে, যা অনেকেরই জানা নেই। যৌন শোষণ শিশুর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে যৌন ব্যবসায় লিপ্ত করা, প্রলোভন, ভয় দেখিয়ে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত করা ইত্যাদি আচরণ শোষণের মধ্যে পড়ে। লালসাপূর্ণ দৃষ্টিতে শিশুকে দেখা, অশালীন কথা বলা, জোর করে শিশুর স্পর্শকাতর অঙ্গে স্পর্শ করা, পর্নোগ্রাফি দেখানো বা দেখতে বাধ্য করা, অশ্লীল ছবি বা ভিডিও প্রেরণ করা ইত্যাদি শিশুর যৌননিপীড়ন।
পরিসংখ্যানে মেয়েশিশুর চিত্র তুলে ধরা হলেও ছেলেশিশুরাও এই আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে। কর্মজীবী মায়ের সন্তানদের ক্ষেত্রে এই নির্যাতনে শিকারের হার বেশি। মা বাইরে থাকার কারণে সন্তানটি যার দায়িত্বে থাকে, সে শিশুকে মায়ের মতো আগলে রাখতে পারেন না। আবার দেখা যায়, যার কাছে রাখেন, তার দ্বারাই শিশু ক্ষতির শিকার হচ্ছে। মা-বাবার উচিত শিশুকে নিজের শারীরিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া। স্পর্শের ভালো দিক, মন্দ দিক সম্পর্কে ধারণা দেওয়া। কেউ মন্দ আচরণ করলে বিষয়টি মা-বাবাকে বলা। যেসব শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার, তাদের মস্তিষ্কে অতিমাত্রায় অস্থিরতা সৃষ্টিকারী হরমোন তৈরি হয় ভয় পাওয়ার কারণে; যা তাদের মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই শিশুর মাঝে অস্থিরতা দেখলে তার সঙ্গে কথা বলতে হবে, তার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। অনেক শিশু বুঝতেই পারে না তাদের সঙ্গে কী ঘটেছে। মা-বাবা শিশুর কথা বিশ্বাসও করে না কখনও কখনও। আবার অনেক সময় শিশুকে ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখা হয়। এমনকি সামাজিক নিন্দার ভয়ে নিজেরাই বিষয়টিকে গোপন রাখেন। ফলে অপরাধী তার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সুযোগ পায়।
অধিকাংশ অভিভাবকই সন্তানকে নিজের মতো করে বড় করে তুলতে চান। সন্তানের যে আলাদা একটা জগৎ আছে, সে কথা তারা ভুলে যান। পরম মমতায় আগলে রাখা সন্তানটি এত চেষ্টার পরেও হয়তো বিপথে চলে যেতে পারে। সঙ্গদোষ, সন্তানকে
নিজের মতো করে বেড়ে উঠতে না দেওয়া কিংবা মা-বাবার অতিরিক্ত বিধিনিষেধ সন্তানের অনেক ক্ষেত্রেই হিতে বিপরীত হয়ে যেতে পারে, সন্তান বিপথগামী হতে পারে।
কোনো শিশুই দুর্বিনীত, অবাধ্য, অশিষ্ট কিংবা নেশাসক্ত হয়ে জন্মগ্রহণ করে না। তবুও ছেলেমেয়েরা বিপথে যায়, অশোভন আচরণ করে, কুসঙ্গে পড়ে, মাদকাসক্তির শিকার হয়। কিন্তু কেন এমন হয়? হঠাৎ করেই তারা বিপথগামী হয়ে যায় না। তার পেছনে একটা গল্প থাকে, একটা ইতিহাস থাকে। পারিবারিক, সামাজিক কিংবা বংশগত বিষয়গুলো খুঁটিয়ে অনুসন্ধান করলে একজন ছেলে কিংবা মেয়ের বিপথে যাওয়ার যথাযথ কারণ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
একটা শিশুর জীবনের শুরু একটি শূন্য ফলদানির মতো। বিভিন্ন ফুল দ্বারা ফুলদানি সবটা জুড়ে পরিপূর্ণ হওয়ার মতো করেই জীবনে চলার পথের নানা অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও সমাজের নানা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে সেই শূন্য ফুলদানিটি পরিপূর্ণ হয়। ফুলদানিতে ভালো ফুলের মাঝে কিছু মন্দ
ফুলও থাকতে পারে। তবে নির্ভেজাল, সুন্দর ফুল দিয়ে ফুলদানিটি ভরে তোলার মতো সন্তানকে নিখুঁতভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব অবশ্যই অভিভাবকদের।
জিনগত বা বায়োলজিক্যাল অসুখ নিয়ে যদি কেউ জন্মায় এবং তার যথাযথ চিকিৎসা না হয়, তাহলে অনেক সময় এসব আনট্রিটেড ডেভেলপমেন্টাল ডিফিকাল্টি মানুষকে অপরাধপ্রবণ করে তোলে। সমাজের মূল স্রোতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলতে না পারলে শিশুরা অনেক সময় অপরাধপ্রবণ হয় এবং ধীরে ধীরে নিজেদের অজান্তেই অপরাধের পথে পা বাড়াবে। সমাজের খারাপ চর্চার দ্বারা খুব সহজেই একজন মানুষের গায়ে খারাপ তকমা এঁটে দেওয়া যায়। কিন্তু কেউ একবার তলিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করেন না, এর পেছরে মূল কারণটা কী? একটি ছেলে কেন ড্রাগ নিচ্ছে, কেন একজন স্কুলপড়ুয়া ছাত্র ক্লাসের অন্য সবার সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে যেতে পারছে না, এসব বিষয়ে খতিয়ে না দেখেই তাদের দোষারোপ করা হয়। তাই এসব ঘটনার পেছনের ইতিহাস জানা খুবই জরুরি।
একজন শিশুর প্রাথমিক অস্তিত্ব তার মায়ের কোল। এই কোলই তার স্বস্তি, নিরাপদ আশ্রয় ও আস্থা। একজন শিশুর পথচলা শুরু হয় তার মা-বাবার হাত ধরে। সে তার জীবনকে চিনতে শুরু করে মা-বাবার চোখ দিয়ে, ভালো-মন্দ বুঝতে শেখে মা-বাবার নীতিবোধ দিয়ে। শিশুর এ কোমল অনুভূতি সাজিয়ে তোলার দায়িত্ব মা-বাবার। এ গুরুদায়িত্ব পালনে অবশ্যই মা-বাবাকে পারদর্শী হতে হবে। মা-বাবাকে সন্তানের কাছে রোল মডেল হয়ে উঠতে হবে। সন্তানের স্নেহ-শাসনে, সম্মানে তাকে তার যোগ্য জায়গা দিতে হবে। পাাশপাশি, অভিভাবককেও নিজের জায়গায় শক্ত থাকতে হবে। সন্তানের জন্য নিয়ম যেমন কঠোর থাকবে, আবার তার জন্য ছাড়ও থাকবে। সন্তানকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে অভিভাবককে প্রথম থেকেই সচেতন থাকতে হবে। বয়স অনুযায়ী সন্তানের আবেগ, অনুভূতিকে বুঝতে হবে। শিশুকে সময় দিতে হবে। শিশুর
সঙ্গে একসঙ্গে খাওয়া, ভালো খাবার বানিয়ে দেওয়া, ছুটির দিন একসঙ্গে সময় কাটানো এমন সব অভ্যাসেই দারুণ বন্ধন তৈরি হয় শিশুর সঙ্গে অভিভাবকের, যা সারা জীবন অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।
পরিবার শিশুর কাছে স্বস্তির জায়গা, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের। সন্তানের নিজস্ব মত, ব্যক্তিসত্তার ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। আলোচনা করে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। সন্তানের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। এমন কোনো আচরণ করা যাবে না, যাতে অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়। ছেলেমেয়ের ভালো আচরণের পেছনে সবার আগে দরকার মা-বাবার মধ্যে ভালো সম্পর্ক। প্রত্যেকেরই অধিকার আছে নিজের মতো করে বাঁচার। সুষ্ঠুভাবে বাঁচার সেই পদ্ধতিটা ধরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব অভিভাবকের। একটা পরীক্ষায় খারাপ করা মানেই জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। এ সত্যগুলো মেনে নিয়ে জীবন চলার শিক্ষা দেওয়া দরকার। শত কষ্ট হলেও নম্রতা, ভদ্রতা, আস্থার আশ্রয়টুকুকে রক্ষা করতে হবে। তাহলেই বিপথগামিতার হাত থেকে রক্ষা করা যাবে আমাদের সন্তানকে।
শ্রদ্ধা, সম্মান আর নৈতিকতার বিষয়গুলো মানুষ তার পরিবার ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকেই শেখে। আগে স্কুল-কলেজে যাওয়ার পথে কিংবা বাইরে কোথাও গেলে শিক্ষক বা বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে দেখা হলে সালাম দেওয়া, সাইকেল থেকে নেমে সালাম দিয়ে তারপর সাইকেলে ওঠার রেওয়াজ দেখা যেত। কিন্তু এখন বেশিরভাগ শিক্ষার্থী শ্রদ্ধা, সম্মান আর নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা ছাড়াই বেড়ে উঠছে। শিক্ষক ও বড়দের শ্রদ্ধা-ভক্তির ব্যাপারগুলো যেন এ প্রজন্মের প্রায় শিক্ষার্থীদের স্পর্শ করে না। ব্যাগভর্তি বই নিয়ে প্রতিদিন স্কুলে গেলেই প্রকৃত শিক্ষা অর্জিত হয় না। শিক্ষিত মানুষ মাত্রই সুশিক্ষিত নয়।
মাদক, ছিনতাই, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, ধর্ষণসহ খুনের মতো বড় বড় অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে তরুণ সমাজ। অথচ এসব ভয়াবহ অপরাধের সঙ্গে জড়িতরা আমাদের পরিবারেরই সন্তান। নীতি-নৈতিকতার অভাবই এসব তরুণ আজ বিপথগামী। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নীতি-নৈতিকতার বিষয়ে আরও দেওয়া দরকার।
মা-বাবাই পারেন সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা দিতে। এর পরেই রয়েছে শিক্ষকদের স্থান। শিক্ষার্থীরা যাতে শিক্ষককে নিরাপদ মনে করে, তাদের সমস্যা ও ইচ্ছার কথা মন খুলে জানাতে পারে, সে পরিবেশ শিক্ষকদেরই তৈরি করতে হবে। একজন শিক্ষার্থীর মাঝে যদি সুকুমারবৃত্তির চর্চা, সুস্থ সংস্কৃতির চর্চাসহ নীতি-নৈতিকতার চর্চা না থাকে, তাহলে সে একজন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে না। অপরাধ, অপসংস্কৃতিসহ নানা নীতিগর্হিত কাজে তরুণরা
যাতে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়তে না পারে এ জন্য সচেতন হতে হবে পরিবারকে, সচেতন হতে হবে শিক্ষকদের। শুধু আইন করে অপরাধ বন্ধ করা যাবে না। আইনের কঠোর বাস্তবায়নের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা এবং নৈতিক চর্চা এক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ।
সুবিধাবঞ্চিত নির্যাতিত শিশুদের সুরক্ষার লক্ষ্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সমাজসেবা অধিদফতরের মাধ্যমে চাইল্ড সেনসিটিভ সোশ্যাল প্রটেকশন ইন বাংলাদেশ এবং সার্ভিসেস ফর দ্য চিলড্রেন এট রিস্ক নামে দুটি পৃথক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সামাজিক সুরক্ষামূলক কার্যক্রমে দরিদ্র এবং নির্যাতিত পরিবারের নারী, শিশু ও যুবসম্প্রদায়ের অভিগম্যতার উন্নতি সাধনের মাধ্যমে নির্যাতন, সহিংসতা এবং শোষণের প্রকোপ কমিয়ে আনা; শিশু অধিকার সনদ ও আন্তর্জাতিক চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইনি কাঠামো এবং বিশেষ শিশুনীতি গ্রহণ করা; দেশের সব শিশু বিশেষ করে দুস্থ শিশুদের কল্যাণ সাধন করা; শিশুদের প্রতি সহিংসতা এবং শোষণ প্রতিরোধকল্পে ইতিবাচক ও সহায়ক সামাজিক আদর্শের অনুশীলন, উন্নয়ন ও সুদৃঢ় করা। এগুলোর পাশাপাশি শিশুদের যথাযথ বিকাশ ও নিরাপত্তা দিতে শিশু সুরক্ষা আইন রয়েছে। সরকার প্রদত্ত এসব সেবা সম্পর্কে মানুষকে জানাতে হবে। এছাড়া শিশুর বিকাশে পরিবার ও মা-বাবার করণীয় সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টিতে মিডিয়া ভূমিকা রাখতে পারে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শিশুদের জন্য নিরাপদ আবাস গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে শিশুরা নিশ্চিন্ত পদচারণায় মুখরিত হবে।

পিআইডি নিবন্ধ

ট্যাগ »

সর্বশেষ..