মত-বিশ্লেষণ

শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশ

ফারজানা ইয়াসমিন: শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশের মজবুত ভিত্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার প্রারম্ভিক শৈশবকালের গুরুত্বকে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে ‘শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশের সমন্বিত নীতি, ২০১৩’ প্রণয়ন করেছে। এ নীতি বাস্তবায়নে মহিলা ও শিশু-বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ ১৫টি মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সামগ্রিকভাবে মহিলা ও শিশু-বিষয়ক মন্ত্রণালয় ‘শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশের সমন্বিত নীতি, ২০১৩’ পরিচালনা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রমের সমন্বয় ও অগ্রগতি মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পালন করছে। অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় ও সংস্থা এ কাজে ধারাবাহিকভাবে মহিলা ও শিশু-বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সহায়তা করছে।

বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০১৩ সালে অনুমোদিত শিশুর প্রারম্ভিক যতœ ও বিকাশের সমন্বিত নীতিতে(ECCD Policy 2013) শিশুর প্রারম্ভিক শৈশবকাল হিসেবে গর্ভাবস্থা থেকে আট বছর বয়স পর্যন্ত সময়কে নির্ধারণ করা হয়েছে। এই আট বছরের মধ্যে গর্ভ থেকে পাঁচ বছর শিশুর সার্বিক বিকাশের ভিত্তি গড়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুর প্রবেশ ও উত্তরণের যাত্রাপথকে মসৃণ করার জন্য ছয় থেকে আট বছর শৈশবকাল খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে শিশুর শারীরিক ও মানসিক যেসব পরিবর্তন হয়, সেটাই শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ। ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আকার বড় হওয়া এবং ওজন বৃদ্ধি পাওয়াকে বলে শারীরিক বৃদ্ধি। আর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবহার এবং ভাষা, চিন্তা-চেতনা, বুদ্ধি, মেধা, বোধশক্তি, অনুভূতি ও ভাবের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে ক্রমেই অধিক সক্ষমতা অর্জন করা এবং দক্ষ হয়ে ওঠাকে বলে মানসিক বিকাশ।

প্রারম্ভিক শৈশবকালেই মানবজীবনের পরিপূর্ণ শারীরিক বৃদ্ধি ও সার্বিক বিকাশের ভিত্তি গড়ে ওঠে। ভিত্তি মজবুত হলেই পরবর্তীকালে বৃদ্ধি ও বিকাশ সঠিকভাবে হয়। শৈশবকালে শিশু যদি যথাযথ পারিবারিক পরিবেশ, ক্রিয়া, যত্ন ও উদ্দীপনা না পায়, তাহলে পরবর্তী সময়ে চেষ্টা করেও তার মধ্যে সার্বিক বিকাশ-সম্পর্কিত গুণাবলি সম্পূর্ণভাবে প্রস্ফুটিত করা সম্ভব হয় না। একটা শিশুকে জন্মের পর চার মাস অন্ধকারে রাখলে পরে তাকে আলোতে আনলেও সে কখনও আর চোখে দেখতে পারে না, অর্থাৎ সময় পেরিয়ে গেলে হাজারো চেষ্টা করেও তা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। এজন্য প্রারম্ভিক শৈশবকালকে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় ধরা হয়।

শিশুর প্রারম্ভিক বৃদ্ধি ও বিকাশের মূল চাহিদা খাদ্য ও পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, আদর-যত্ন, খেলাধুলা, শিক্ষা ও অন্যের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ প্রভৃতি বিষয়কে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। পর্যাপ্ত পুষ্টি, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা এবং পারস্পরিক ক্রিয়ামূলক যত্ন শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং উভয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ। বৃদ্ধির জন্য মূলত প্রয়োজন পর্যাপ্ত পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা এবং বিকাশের জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক ক্রিয়ামূলক যত্ন ও শিক্ষার সুযোগ। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে পর্যপ্ত পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা যদি পারস্পরিক ক্রিয়ামূলক যত্নের মাধ্যমে দেয়া যায়, তাহলে তা শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। তাই শিশুর পরিপূর্ণ শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশের জন্য পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি পারস্পরিক ক্রিয়ামূলক যত্ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আমরা জানি আমাদের শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয় ছাড়াও আবেগ-অনুভূতিসহ সব কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্ক। তাই মানুষের এসব বিকাশ নির্ভর করে মস্তিষ্কের বিকাশের ওপর। একটি শিশু যখন জন্ম গ্রহণ করে, তখন তার মস্তিষ্কে কোটি কোটি কোষ থাকে। জন্মের পর এই কোষের সংখ্যা আর বাড়ে না। উল্লেখ্য, একটি কোষের সঙ্গে অন্য কোষের সংযোগ ছাড়া এই কোষগুলো একা একা কাজ করতে পারে না। বিকাশ-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডগুলো সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মস্তিষ্কের পরিপক্বতা প্রয়োজন। আর তা সম্ভব হয় কেবল মস্তিষ্কের কোষের মধ্যে ব্যাপক সংযোগ ঘটানোর মাধ্যমে। এর জন্য প্রয়োজন শিশু ও তার আশপাশের মানুষ, পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়ামূলক যত্ন (Interactive care) এবং পারস্পরিক ক্রিয়া (Interaction)  ঘটানো। পর্যাপ্ত পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সঙ্গে শিশুর মস্তিষ্কের পরিপক্বতার জন্য এই পারস্পরিক ক্রিয়ামূলক যত্নের গুরুত্ব অপরিসীম এবং এর কোনো বিকল্প নেই। কেননা মস্তিষ্কের কোষের মধ্যে সংযোগ ঘটানোর জন্য কোষগুলোকে উদ্দীপ্ত করা প্রয়োজন। একমাত্র পারস্পরিক ক্রিয়ামূলক যত্নের মাধ্যমেই কোষগুলোকে উদ্দীপ্ত করা সম্ভব। এ প্রসঙ্গে লক্ষণীয়, মস্তিষ্কের কোষগুলো উদ্দীপ্ত হয়ে কোষের মধ্যে সংযোগ ঘটানোর ক্ষমতা প্রাকৃতিক নিয়মেই পাঁচ বছর বয়সের পর আর থাকে না বললেই চলে। তাই পাঁচ বছর বয়সের মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়ামূলক যত্নের মাধ্যমে মস্তিষ্কের বিকাশের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে, অন্যথায় এই সুযোগ সারা জীবনের জন্য হারিয়ে যাবে। এটাকে বলা হয় ‘ব্যবহার করো, না হয় হারিয়ে ফেলো (Use it or lose it)Õ প্রক্রিয়া।

শিশুর যত্নকারী এবং শিশুর চারপাশের পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়া ঘটানোর জন্য শিশুকে তার বয়স-উপযোগী যে বিশেষ ধরনের যত্ন দেয়া প্রয়োজন, তাকেই বলে পারস্পরিক ক্রিয়ামূলক যত্ন। প্রতিটি শিশুর জীবনেই এর গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ পারস্পরিক ক্রিয়ামূলক যত্নের মাধ্যমেই শিশুর সঙ্গে পারস্পরিক ক্রিয়া ঘটে। আর পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা পারস্পরিক ক্রিয়া ঘটলেই মস্তিষ্কের সব অংশের কোষকে উদ্দীপ্ত করে কোষের সংযোগ ঘটানো সম্ভব। এজন্য শিশুর জন্মের পর থেকেই শিশুকে প্রতিদিনই পারস্পরিক ক্রিয়ামূলক যত্ন নিতে হবে। শিশুকে আদর করা, গান, গল্প, ছড়া শোনানো, গোসল করানো, খাওয়ানোর সময় বিভিন্ন বস্তুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া প্রভৃতি বারবার করাতে হবে। তবেই শিশুর মস্তিষ্কের কোষগুলো উদ্দীপ্ত হয়ে কোষের মধ্যে সংযোগ ঘটাবে এবং বারবার ব্যবহƒত সংযোগগুলো ক্রমান্বয়ে সুসংগঠিত হতে সহায়ক হবে। বয়স অনুযায়ী শিশুর সঙ্গে ইতিবাচক আচরণ করতে হবে। শিশুর বয়সের ওপর তার গ্রহণক্ষমতা নির্ভর করে। বয়স অনুযায়ী পারস্পরিক ক্রিয়ামূলক যতœ দিলে সেটা শিশু সহজেই গ্রহণ করতে পারবে এবং তা তার মস্তিষ্কের সঠিক বিকাশে সহায়তা করবে। যদি বয়স অনুযায়ী গ্রহণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি শিশুর ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়, তাহলে তা তার বিকাশের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন ছয় মাস বয়সের একটি শিশুর সঙ্গে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে লুকোচুরি খেলা যথার্থ হলেও দুই-তিন বছর বয়সের কোনো শিশুর সঙ্গে তা খেললে লাভ হবে না। নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশে শিশুকে পারস্পরিক ক্রিয়ামূলক যতœ নিলে শিশু স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেড়ে ওঠে। শিশুকে ধমক না দিয়ে বিষয়টি বুঝিয়ে বলা, শিশু কোনো ভালো কাজ করলে তার প্রশংসা করা এবং ছেলে ও মেয়ে সব শিশুর প্রতি সম-আচরণ করা প্রয়োজন।

আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ। এই শিশুরাই একদিন দেশ ও জাতির নেতৃত্ব দেবে। তাই তাদের সুস্থ ও সুন্দরভাবে গড়ে তোলা আমাদের সবার দায়িত্ব। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিশুদের নিয়ে ভাবনার কোনো বিকল্প নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য একটি উন্নত জাতি গঠন করতে হবে। আর এ উন্নত জাতি গঠিত হবে বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের দিয়ে। আমরা যদি আমাদের শিশুদের সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে গড়ে তুলতে পারি, তবেই একটি কর্মক্ষম ভবিষ্যৎ প্রজš§ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। আর এর মাধ্যমে জাতির পিতা যে উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা অর্জন করা সহজ হবে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..