মত-বিশ্লেষণ

শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশে অভিভাবকের করণীয়

সাজিয়া হাফিজ: বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বাধিক ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা সমস্যা না হয়ে সম্পদে পরিণত হতে পারে, যদি মানবসম্পদ উন্নয়নে সঠিক বিনিয়োগ করা যায়। মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য শিশুর জীবনের শুরুর বছরগুলোতে বিনিয়োগ করতে হবে, কারণ একটি শিশুর বিকাশের ভিত্তি গড়ে ওঠে জীবনের প্রথম দিকের বছরগুলোতেই। গর্ভাবস্থা থেকে প্রথম আট বছর শিশুর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। সুস্থ-সবল, উদ্যমী ও দক্ষ হয়ে উঠতে যে প্রস্তুতির প্রয়োজন, তা শিশুর জীবনের প্রথম পাঁচ-দশ বছর বয়সের মধ্যেই হয়ে থাকে। শিশুর জীবনের প্রথম পর্যায়ে শারীরিক বৃদ্ধির জন্য কী কী করা প্রয়োজন সে সম্পর্কে আমাদের কম-বেশি ধারণা থাকলেও মানসিক বিকাশের জন্য কী করা দরকার, সে বিষয়ে আমাদের পর্যাপ্ত জ্ঞান ও দক্ষতার অভাব রয়েছে। শিশুর প্রথম পাঁচ বছরকে প্রারম্ভিক শৈশবকাল বলা হয় এবং এই বিকাশকে বলা হয় শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ।

মায়ের গর্ভকাল থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত একটি শিশুর শরীর ও মনের পুরোপুরি যে বিকাশ ঘটে, সেটিই হলো ‘শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ’। ধীরে ধীরে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পরিবর্তন ও আকারে বড় হওয়াকে বলে শারীরিক বৃদ্ধি। আর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবহার এবং ভাষা, চিন্তাচেতনা, অনুভূতি, জ্ঞান, বুদ্ধি, মেধা ও ভাবের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে অনেক বেশি দক্ষ হয়ে ওঠাকে বলা হয় মানসিক বিকাশ।

শরীরের বৃদ্ধি ও মনের বিকাশ একসঙ্গে ঠিকভাবে হতে থাকলে সত্যিকার অর্থে শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে। যেহেতু মায়ের গর্ভাবস্থা থেকে পাঁচ বছর বয়সের মধ্যেই শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশের ভিত্তি তৈরি হয়, তাই এ সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় সে যা শেখে ও যেভাবে শেখে তার ওপরই গড়ে ওঠে তার ভবিষ্যৎ বুদ্ধিমত্তা, ব্যক্তিত্ব এবং নৈতিক ও সামাজিক আচরণ। আর এ কারণেই এ বয়সেই শিশুর সার্বিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। তবেই তা শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনকে পরিপূর্ণ ও অর্থবহ করে তুলবে।

জন্মের পর থেকেই শিশু শিখতে শুরু করে। যখন একটি শিশু তার পরিবার থেকে পর্যাপ্ত পুষ্টি ও যথাযথ স্বাস্থ্য পরিচর্যার পাশাপাশি আদর, মনোযোগ ও উদ্দীপনা পায়, তখন তার শেখার গতি বেড়ে যায়। দেখা, শোনা, ছোঁয়া, গন্ধ ও স্বাদÑএই পাঁচ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই একটি শিশু ধীরে ধীরে তার চারপাশের পৃথিবীকে আবিষ্কার করে চলে। শিশুর জন্মের মুহূর্ত থেকেই এসব ইন্দ্রিয় কাজ করতে থাকে। শিশু নতুন নতুন জিনিস দেখতে, ধরতে ও তা নিয়ে খেলতে চায়। সে নতুন নতুন শব্দও শুনতে চায়। মানুষের কণ্ঠস্বর হলো শিশুর শোনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। শিশুর বিকাশের জন্য খেলাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে শিশুরা কল্পনা করতে শেখে ও সৃজনশীলতার চর্চা করে। শব্দ, অক্ষর ও সংখ্যা মুখস্থ করার চেয়ে খেলাধুলার মাধ্যমে শেখা শিশুদের জন্য অনেক বেশি উপযোগী। তাই শিশুর সার্বিক বিকাশের জন্য তাকে নানা রঙের জিনিস দেখানো, ধরতে দেওয়া, বিভিন্ন শব্দ করে মনোযোগী করে তোলা এবং তার সঙ্গে খেলা প্রত্যেক মা-বাবা অথবা শিশু পরিচর্যাকারীদের করা উচিত। তাই শিশুর সঙ্গে বিভিন্নভাবে যাতে সে তার পঞ্চেন্দ্রিয় ব্যবহার করার সুযোগ পায়, সেভাবে প্রতিনিয়ত পারস্পরিক ক্রিয়া ঘটাতে হবে। কাজেই শিশুর প্রারম্ভিক শৈশবকালেই যদি সঠিকভাবে মস্তিষ্কের বিকাশের প্রতি মনোযোগ দেওয়া না হয়, অর্থাৎ তাকে পারস্পরিক ক্রিয়ামূলক যত্ন (ইন্টারঅ্যাকটিভ কেয়ার) দেওয়া না হয়, তাহলে তার সারা জীবনের বিকাশই বাধাপ্রাপ্ত হয়। সে কারণেই এমন সুযোগ কাজে লাগানো খুবই প্রয়োজন। তাই সব মা-বাবাকেই এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।

এর লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা যেখানে শিশুর প্রারম্ভিক বছরগুলোতে বিনিয়োগ করার গুরুত্ব উপলব্ধি করা সম্ভব হবে এবং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে শিশুর প্রারম্ভিক বছরগুলোয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিনিয়োগ করতে হবে। শিশুর গর্ভাবস্থা থেকে আট বছর বয়স পর্যন্ত সব শিশুর চাহিদা, অধিকার ও মঙ্গলের জন্য পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যা শিশুর উপযুক্ত প্রারম্ভিক শৈশবকালীন বিকাশে সহায়ক হবে এবং সে সফলতার সঙ্গে বিদ্যালয়-উত্তরণে সক্ষম হবে। বর্তমান সরকার শিশুর প্রারম্ভিক যতœ ও বিকাশের গুরুত্ব উপলব্ধি করে এ বিষয়ে একটি নীতি-কাঠামো তৈরি করেছে, যাতে এ খাতে কর্মরত সবার কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে শিশু তথা জাতির উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়।

শিশুর সমন্বিত প্রারম্ভিক যতœ ও বিকাশের জন্য নীতি-কাঠামো প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা প্রকল্পটি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি কর্তৃক বাস্তবায়িত হচ্ছে। এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় অনেক। গর্ভকালে মা ও বয়স অনুযায়ী শিশুদের বিভিন্ন ধরনের পারস্পরিক ক্রিয়ামূলক যতœ দেওয়া আমাদের জন্য আবশ্যক। জন্ম থেকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়ানো বা শিশুর অন্যান্য পরিচর্যার সময় তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা; শিশুকে মৃদুস্বরে গুনগুন করে গান, ছড়া বা কবিতা শোনানো; তার মতো করে বিভিন্ন শব্দ করা; মায়ের চুড়ির শব্দ, মৃদু আওয়াজের ঝুনঝুনি বা আঙুলের তুড়ি দিয়ে দিনে কিছু সময় শিশুকে উদ্দীপ্ত করা; শিশুকে বুকে জড়িয়ে আদর করা; শিশুর শরীর প্রতিদিন মালিশ করা; শিশুর সঙ্গে মুখ ঢেকে ‘টুকি’ বা লুকোচুরি খেলা এবং আনন্দসূচক শব্দ করে কথা বলা শিশুর বিকাশের জন্য সহায়ক।

সাত মাস থেকে দেড় বছর বয়স পর্যন্ত শিশুকে পরিচিত জিনিসগুলোর নাম বলা এবং তা দেখাতে বলা; শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের নামগুলো বারে বারে বলা এবং বলতে উৎসাহিত করা; হাত-পা ব্যবহার করে শিশুকে খেলতে দেওয়া এবং তার সঙ্গে খেলা; শিশুকে ছোট ছোট প্রশ্ন করা এবং প্রয়োজনে জবাব দেওয়া; শিশু কোনো কিছু দেখে ভয় পেলে তার ভয় ভাঙিয়ে দেওয়া; দাঁত মাজা, হাত ধোয়া, নিজে নিজে পোশাক পরা প্রভৃতি বিষয়কে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করতে সাহায্য করা এবং নয়-দশ মাস বয়স থেকে শিশুকে দাঁড়াতে ও হাঁটতে সাহায্য করা মা’সহ পরিচর্যাকারীদের দায়িত্ব।

দেড় বছর থেকে তিন বছর বয়স পর্যন্ত শিশুকে অন্য শিশুর সঙ্গে খেলার সুযোগ করে দেওয়া এবং নিরাপদ পরিবেশে ছোটাছুটি করতে উৎসাহিত করা; প্রতিদিন ব্যবহƒত হয় এমন জিনিস, যেমন: বল, হাতের চুড়ি, ফল, বইÑএসব দিয়ে বিভিন্ন রং ও আকৃতি শেখানো; ছবির বই নাড়াচাড়া করতে দেওয়া এবং কাগজে বা মাটিতে আঁকাআঁকি করতে উৎসাহ দেওয়া; গল্প ও ছড়ার মাধ্যমে শিশুকে নতুন নতুন শব্দ শেখানো, পরিবারের ছোট ছোট কাজ করতে শিশুকে উৎসাহিত করা ও প্রশংসা করা এবং শিশুকে প্রস্রাব ও পায়খানার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা ব্যবহার করতে শেখানো শিশুর বিকাশের জন্য জরুরি।

তিন বছর থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত কথা বলা, গান গাওয়া, বই পড়া প্রভৃতির মাধ্যমে শিশুকে ভাষা শেখাকে উৎসাহিত করা; নিজেকে প্রকাশের সুযোগ করে দেওয়া, যেমন: ছবি আঁকা ও কাগজ, মাটি, পুরোনো কাপড় ইত্যাদি দিয়ে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করা; বড়দের সালাম বা আদাব দেওয়া, মেহমান এলে বসতে বলার মতো বিষয়গুলি, অর্থাৎ বড়দের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হয় তা শেখানো এবং পালন করতে উৎসাহিত করা; শিশুকে ঘরের বাইরের অন্য শিশুর সঙ্গে খেলার সুযোগ করে দেওয়া এবং শিশুকে কিছু পছন্দ করা অথবা দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হলে শিশু স্বাবলম্বী হতে শেখে, যা তার বিকাশের ক্ষেত্রে সহায়ক।

বয়স অনুযায়ী শিশুকে এ ধরনের পারস্পরিক ক্রিয়ামূলক যত্ন দেওয়ার ওপরই তার মানসিক বিকাশের ভিত্তি গড়ে ওঠে। শিশুকে তার বয়স অনুযায়ী পারস্পরিক ক্রিয়ামূলক যত্ন দিয়ে শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশে মা-বাবার অবদান রাখা অত্যন্ত জরুরি। শিশুর সুস্থতা ও পূর্ণ বিকাশের ক্ষেত্রে আমাদের এ দায়িত্ব ভুললে চলবে না কোনোভাবেই।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..