মত-বিশ্লেষণ

শিশুর মানসিক বিকাশ, খেলাধুলা ও আমাদের করণীয়

জীবন রায়হান

প্রবাদ আছে, ‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।’ শিশুকে কখনোই তার নিজস্ব গণ্ডির বাইরে রাখা উচিত নয়। তাকে তার মতো করে বেড়ে উঠতে দিতে হবে। আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। সুতরাং ভবিষ্যৎ নাগরিকদের যথাযথভাবে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে রাষ্ট্র, অভিভাবক তথা সমাজের সবারই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। শিশুদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে দরকার তার সঠিক মানসিক বিকাশ। আর এ মানসিক বিকাশে লেখাপড়ার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক চর্চা।

অনেক শিশুই হয়তোবা স্কুল ছাড়া খেলাধুলার সুযোগ পায় না। এজন্য প্রতিটি স্কুলে খেলাধুলার জন্য প্রয়োজনীয় মাঠ থাকা একান্ত প্রয়োজন। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুরা পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ উপভোগ করতে পারে। স্কুলগুলোয় দেখা যায় টিফিনের ঘণ্টা বাজতেই সবার ভোঁ দৌড়। কে কার আগে মাঠে নামবে! কলরব তুলে কেউ ছুটছে কারও পেছনে, কেউ এক নিঃশ্বাসে দৌড়ে সবার আগে মাঠের শেষ মাথায় গিয়ে হাজির। কারও হাতে ব্যাট, কারও পায়ে বল আবার কেউ বা লাফাচ্ছে অকারণে। সময় কখন ফুরিয়ে যায়, খেয়ালই থাকে না। টিফিন শেষে ঘণ্টা বাজতেই মাঠ ছেড়ে আবার ক্লাসে ফেরা। গ্রামের বেশিরভাগ স্কুলেই এটি পরিচিত দৃশ্য। সাধারণভাবে গ্রামের কিছু কিছু স্কুলে অবকাঠামোগত সামান্য সমস্যা থাকলেও খেলার মাঠের তেমন সমস্যা নেই, যা শহরের স্কুলগুলোয় দেখা যায় প্রকট আকারে।

রাজধানীর বেশিরভাগ স্কুলে ভবন আছে, মাঠ নেই। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কাছে টিফিন পিরিয়ড মানে কেবলই টিফিন খাওয়া। স্কুলের চার দেয়ালে বন্দি হয়ে পড়েছে তাদের সব শৈশব। পাড়া বা মহল্লাতেও দুরন্তপনায় মেতে ওঠার মতো পর্যাপ্ত খোলা জায়গা নেই স্কুলের শিশুদের। তাই ভিডিও গেমস, মোবাইল, কম্পিউটার আর ল্যাপটপ হয়ে উঠছে তাদের খেলাধুলার প্রধান অবলম্বন।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য পাঁচ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের দিনে অন্ততপক্ষে এক ঘণ্টা খেলাধুলা করা প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) সাম্প্রতিক জরিপ থেকে জানা যায়, রাজধানীর মাত্র দুই শতাংশ শিশু ঘরে-বাইরে কিংবা স্কুলে গিয়ে খেলাধুলার সুযোগ পায়। রাজধানীর শিশুদের মুটিয়ে যাওয়া অর্থাৎ স্থূলতার হারও সারা দেশের শিশুদের তুলনায় বেশি। এর অন্যতম কারণ, শিশুদের খেলাধুলা এবং শরীরচর্চার অভাবকে দায়ী করেছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ৩৩৮টি প্রাইমারি স্কুল, এনজিও পরিচালিত আরও প্রায় সাড়ে ৪০০ এবং ১১ হাজারের বেশি কিন্ডারগার্টেন রয়েছে। সরকারি স্কুলগুলোর মাঠ থাকলেও বেসরকারি স্কুল, কিন্ডারগার্টেন, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর শতকরা ৯৮ ভাগেরই খেলার মাঠ নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কনসালট্যান্ট সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মেহজাবীন হক বলেন, ভুলে গেলে চলবে না খেলার মাধ্যমেই শিশুর মানসিক বিকাশ হয়। শিশুর সুস্থ ও স্বাভাবিক মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলার বিকল্প নেই। বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী মোহিত কামাল বলেন, খেলাধুলা বা ছোটাছুটি করতে না পারা শিশুরা পরবর্তীকালে নানা সমস্যায় ভোগে। মাঠে খেলাধুলার সময় শিশুদের শরীরে রক্ত প্রবাহ অনেক বেড়ে যায়। এটা শিশুদের দেহ-মন গঠন এবং সুস্থ জীবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুরা নানা পরিস্থিতি সামাল দিতে শেখে। আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে শিখে পরাজয় মেনে নিতে। বাইরে খেলাধুলা ছাড়া এসব সম্ভব নয়।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিশু বিকাশের ক্ষেত্রে লেখাপড়ার পাশাপাশি অবশ্যই যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে না এবং বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই রেজাল্ট ওরিয়েন্টেড। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে লেখাপড়ার পাশাপাশি অবশ্যই খেলার পরিবেশ, খেলার মাঠ, এক্সট্রা কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিজকে গুরুত্ব দিতে হবে। এতে শিশুদের সামাজিকীকরণ ক্ষমতা বাড়বে, সামাজিক দক্ষতা অর্জনে সফল হবে তারা। সুস্থ সমাজ তথা দেশ গঠনে শিশুদের এ দক্ষতা অত্যন্ত প্রয়োজন।

পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুর খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। তাদের জন্য খেলার মাঠ খুবই প্রয়োজন, কিন্তু বড় শহরে বর্তমান বাস্তবতায় পর্যাপ্ত খালি জায়গা নেই এবং পাওয়ার সম্ভাবনাও কম। তবে অভিভাবকদের উচিত সময় করে শিশুদের নিয়ে দর্শনীয় জায়গায় ঘুরতে যাওয়া।

স্কুলে মাঠ না থাকলেও শিশুকে খেলাধুলার সুযোগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে দায়িত্ব নিতে হবে অভিভাবকদের। খেলার জন্য শিশুকে সময় দিতে হবে। রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় এখনও কিছু কিছু খেলার মাঠ ও পার্ক রয়েছে। ইলেকট্রনিক খেলার সরঞ্জাম দিয়ে ঘরের মধ্যে বন্দি না রেখে শিশুকে বাসার কাছাকাছি উপর্যুক্ত কোনো স্থানে নিয়ে যেতে হবে অভিভাবকদেরই। খেলার মাঠ বাসা থেকে একটু দূরে হলেও, সময় করে সপ্তাহে অন্তত দুই-তিন দিন শিশুদের খেলার সুযোগ করে দেওয়া।

ক্রীড়াক্ষেত্রে উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগে দেশের প্রতিটি উপজেলায় একটি করে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হচ্ছে। সে লক্ষ্যে ৪৯০টি মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় এসব মিনি স্টেডিয়ামগুলো সঠিকভাবে কাজে লাগানো এবং এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উপজেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোকে আরও সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে যাতে খেলাধুলার বিকাশ ঘটে এবং খেলাধুলার সুযোগ সৃষ্টি হয়, সে লক্ষ্য নিয়েই সরকার উপজেলা পর্যায়ে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ ও সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে নতুন খেলোয়াড় সৃষ্টি হবে, খেলার মানোন্নয়ন ঘটবে, বিশ্বে বাংলাদেশ খেলাধুলায় অন্যতম সেরা দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।

বর্তমান সরকার ক্রীড়াবান্ধব সরকার। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে লুকিয়ে থাকা প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করতে অঞ্চলভিত্তিক ফুটবল ও ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হচ্ছে। তৃণমূল থেকে প্রতিভা অন্বেষণ কার্যক্রম বর্তমান সরকারের নেওয়া সবচেয়ে আলোচিত পদক্ষেপ। ক্রীড়াঙ্গনকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি ক্রীড়ার উন্নয়নের স্বার্থেই এই উদ্যোগ। শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের মানস গঠনে শিক্ষার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চার

কোনো বিকল্প নেই। খেলাধুলা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ অনুধাবন করে প্রতি বছর বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট এবং বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হচ্ছে। বছরব্যাপী তৃণমূল পর্যায় থেকে বালক ও বালিকাদের বাছাই করে আয়োজন করা হয় এ টুর্নামেন্ট।

শিশুরাই আগামী দিনের কর্ণধার। তাদের খেলাধুলায় পারদর্শী করে তোলা সরকারের পাশাপাশি আমাদের সবার দায়িত্ব। বর্তমান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশ ক্রীড়াক্ষেত্রে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। মেয়েদের অনূর্ধ্ব ১৮ সাফ ফুটবল চাম্পিয়নশিপে রানার্সআপ হয় এবার বাংলাদেশ। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা ক্রীড়াঙ্গনে সফলতা অর্জন করছে। শিশুদের খেলাধুলায় সৎসাহিত করতে মিডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে সবার আগে পরিবার এবং এক্ষেত্রে মা-বাবাকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

পিআইডি নিবন্ধ

সর্বশেষ..