মত-বিশ্লেষণ

শিশুর যথাযথ বিকাশে সমাজের দায়িত্ব

মো. হাবিবুর রহমান: প্রত্যেক শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বিশেষ যতেœর প্রয়োজন। এটি শিশুর প্রতি করুণা নয়, শিশুর অধিকার। জাতিসংঘ ঘোষিত শিশু অধিকার সনদেও এর উল্লেখ বয়েছে। কিন্তু নানা কারণে আমাদের সমাজে এর ব্যত্যয় ঘটে। আদর-যতেœর অভাব, অসুস্থ পারিবারিক পরিবেশ, সঠিক দিকনির্দেশনা ও বিদ্যমান পারিপার্শ্বিক অবস্থার বিরূপ প্রভাবে অনেক শিশুকিশোর প্রত্যাশিত বিকাশ থেকে বিচ্যুত হয়। পারিবারিক পর্যায় থেকে শিশুর ছোটখাটো ভুলত্রুটি সংশোধন না করলে একসময় তারা বড় ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, যা সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন ও মূল্যবোধের পরিপন্থি। এতে বিঘিœত হয় রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা। সামাজিকভাবে তারা কিশোর অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হয়। শিশুদের কাছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড যেমন প্রত্যাশিত নয়, তেমনি তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে সুস্থ ও মানবিক বোধসম্পন্ন করে তোলাও পরিবারের দায়িত্ব।  

শিশুর বিকাশে পরিবার প্রথম ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। পরিবারের পরই সমাজ গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে ভূমিকা রাখে। একটি শিশুকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই শিশুর পারিবারিক ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বব্যাপী শিশুদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য ১৯২৪ সালে জেনেভায় এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে ‘শিশু অধিকার’ ঘোষণা করা হয়। শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সব ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। শিশু অধিকার সনদে ৫৪টি ধারা এবং ১৩৭টি উপ-ধারা রয়েছে। এই উপ-ধারাগুলোতে শিশুদের ক্ষেত্রে যে কোনো ধরনের বৈষম্য থেকে বিরত থাকা, শিশুদের বেঁচে থাকা ও বিকাশের অধিকার, নির্যাতন ও শোষণ থেকে নিরাপদ থাকার অধিকার, পারিবারিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবনে পুরোপুরি অংশগ্রহণের অধিকার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার মতো বিষয়গুলো বর্ণিত রয়েছে। সনদে বর্ণিত প্রতিটি অধিকার প্রত্যেক শিশুর মর্যাদা ও সুষম বিকাশের জন্য অপরিহার্য। স্বাস্থ্য পরিচর্যা, শিক্ষা ও আইনগত, নাগরিক ও সামাজিক সেবা প্রদানের মান নির্ধারণের মাধ্যমে এ সনদ শিশুদের অধিকার সংরক্ষণ করে থাকে। শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো শিশুদের সর্বোচ্চ স্বার্থ বিবেচনা করে যাবতীয় নীতি প্রণয়ন ও কার্যক্রম গ্রহণ করতে দায়বদ্ধ।

শিশু সনদের মূলনীতি চারটি। বৈষম্যহীনতা, শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ, শিশু অধিকার সমুন্নত রাখতে পিতামাতার দায়িত্ব এবং শিশুর মতামতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আওতার্ভুক্ত। একটু বিশদভাবে বললে বৈষম্যহীনতা বলতে সব শিশুর লিঙ্গ, অর্থনৈতিক অবস্থা, ধর্ম, ভাষা, জাতীয়তা, গোত্র, বর্ণ, শারীরিক সামর্থ্য অথবা জন্মর ভিত্তিতে কোনোরকম বৈষম্য ছাড়াই সনদে বর্ণিত অধিকারগুলো ভোগের অধিকার রয়েছে।

শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বলতে মা-বাবা, সংসদ, আদালত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবশ্যই শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থে কাজ করবেন এ বিষয়টিকে বোঝানো হয়েছে।

শিশুর অধিকার সমুন্নত রাখা পিতামাতার দায়িত্ব। এটি বলতে সনদে বর্ণিত অধিকারসমূহ প্রয়োগের ক্ষেত্রে মা-বাবার একটি বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে বিষয়টি বোঝার।

শিশুর মতামতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আওতায় নিজের মতামত গঠনের উপযোগী বয়সের শিশুর নিজস্ব বিষয়ে অবাধে মতপ্রকাশের অধিকারকে বোঝানো হয়েছে। ‘এমন একদিন আসবে যখন সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তি দেখে একটি দেশকে বিচার করা হবে না, বরং অসহায় অবস্থায় পতিত শিশুদের মানসিক ও দৈহিক বিকাশের জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে, সেই নিরিখেই দেশটিকে বিচার করা হবে।

আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ শিশু। এর মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ শিশু দরিদ্র। এই দরিদ্র শিশুদের মধ্যে রয়েছে শ্রমজীবী শিশু, গৃহকর্ম ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশু, প্রতিবন্ধী শিশু, পথশিশু, শিশুবিয়ের শিকার শিশু এবং চর, পাহাড় আর দুর্গম এলাকায় বসবাসরত শিশু। ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধামুক্ত, সুস্বাস্থ্য, মানসম্মত শিক্ষা, লিঙ্গ সমতা, সুপেয় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার মতো টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের উন্নয়ন খুব গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

শিশু অধিকার সংরক্ষণ ও শিশু কল্যাণে শিশুর সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ, পুষ্টি, শিক্ষা ও বিনোদনের সুবিধা নিশ্চিতের কোনো বিকল্প নেই। তাই শিশু-কিশোরদের কল্যাণে জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী শিশু অধিকার সংরক্ষণ, শিশুর জীবন ও জীবিকা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ প্রদান, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচি পরিচালনাসহ শিশু নির্যাতন বন্ধ, বিশেষ করে কন্যাশিশুদের বৈষম্য বিলোপ সাধনে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে শিশু স্বার্থ ও অধিকার রক্ষা এবং শিশুশ্রম রোধকল্পে প্রণীত হয়েছে ‘জাতীয় শিশু সুরক্ষা নীতি-২০১১’। এছাড়া নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন, ২০১০’ এবং ‘শিশু আইন ২০১৩’। জাতীয় শিশুশ্রম সুরক্ষা নীতির আলোকে ঝুঁকিপূঁর্ণ কাজ থেকে শিশুদের বিরত রাখার জন্য কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সরকার শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে সরিয়ে এনে তাদের জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এসব শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করতে তাদের পিতামাতাকে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করছে সরকার।

স্বাধীন বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধানে শিশুদের অধিকার সংরক্ষণ ও কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রথম ১৯৭৪ সালে শিশু আইন প্রণয়ন করেন। এর ১৫ বছর পর জাতিসংঘ ১৯৮৯ সালে শিশু অধিকার সনদ প্রণয়ন করে। বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথ ধরে বর্তমান সরকার শিশুর অধিকার ও সুরক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে অগ্রগতির ফলে মা ও শিশুমৃত্যু কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে এবং এমডিজির লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষায় অগ্রগতি, শিক্ষায় লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাস, উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, শিশু বিকাশকেন্দ্র স্থাপন, উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত দিবাযতœ কেন্দ্র স্থাপন, শিশুর প্রারম্ভিক মেধা বিকাশ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিশুদের যথাযথ বিকাশের জন্য নেয়া হয়েছে বিভিন্ন পদক্ষেপ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় গত এক দশকে শিশুর উন্নয়ন ও সুরক্ষায় বিভিন্ন যুগান্তকারী আইন, নীতি ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা  হয়েছে। এর মধ্যে শিশুর প্রারম্ভিক যতœ ও বিকাশের সমন্বিত নীতি ২০১৩, শিশু আইন ২০১৩, ডিএনএ আইন ২০১৪, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭, যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮ ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমি আইন ২০১৮ উল্লেখযোগ্য।

বছরের প্রথম দিনেই দেশব্যাপী সব শিশুর হাতে নতুন বই তুলে দেয়া, ছাত্রী উপবৃত্তি, বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল চালু করার যুগান্তকারী কার্যক্রমও বাস্তবায়িত হচ্ছে। ফলে শিশুর ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। শিশুদের যথাযথ বিকাশ ও দক্ষ ক্রীড়াবিদ হিসেবে গড়ে তুলতে স্কুলগুলোতে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হচ্ছে। শিশুর পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, শিশু নির্যাতন এবং শিশু পাচার রোধসহ শিশুর সামগ্রিক উন্নয়নে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সফলতা অর্জন করেছে।

শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারের প্রচেষ্টার সঙ্গে প্রয়োজন সবার স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা। আমাদের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিতে পারে অসহায় ও নির্যাতিত শিশুদের জীবন। শিশুদের মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে তাদের অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা দিতে হবে। এগুলো পূরণে অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে আমাদের সবার। সমাজের বিবেকবান মানুষ হিসেবে এটি সবার দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে আজকের সুবিধাবঞ্চিত ও নির্যাতিত শিশু হবে আগামী দিনে জাতির অমূল্য সম্পদ। হবে বিবেকবান নেতৃত্ব। কাজেই আমাদের আজকের শিশুদের যথাযথ বিকাশে আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কোনো বিকল্প নেই।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..