মত-বিশ্লেষণ

শিশুর সুরক্ষায় মাতৃদুগ্ধপানের বিকল্প নেই

সেলিনা আক্তার: কন্যা, জায়া, জননী নারীর তিনটি পর্যায়। ‘মা’ শব্দটি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেকেরই আবেগের একটি জায়গা, তাতে কোনো দ্বিমত নেই। জীর্ণ কুটির থেকে দামি মহল সব জায়গায় ‘মা’-ই স্নেহ, ভালোবাসা ও মমতার আদি ও অকৃত্রিম আধার। এই মায়ের মাতৃত্বরূপ সৌন্দর্যের পূর্ণতায় পরিপূর্ণ। কথায় আছে, ‘বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।’

সন্তানের প্রতি মায়ের অবদানের কথা বলে শেষ করা যাবে না। মা শুধু গর্ভধারণই করে না, আমৃত্যু সন্তানের সঙ্গে থাকে তার অবিচ্ছেদ্য এক বন্ধন। এ বন্ধনের মূলমন্ত্র হলো ‘মায়ের দুধ’। এজন্য ইসলাম ধর্মে মাকে বিশেষ স্থান দেয়া হয়েছে।

তিন বছর বয়সী মেয়ে ময়না সারাবছরই ডায়রিয়া, বদহজম, কলেরাসহ নানারকম রোগে ভুগতে ভুগতে বর্তমানে কঙ্কালসার চেহারা নিয়ে মৃতপ্রায়। বাল্যবিয়ের শিকার চরম অভাবী সংসারের এ কিশোরী মা পুষ্টিহীনতায় নিজেই যেখানে হারিয়েছে শরীরের স্বাভাবিকতা, সেখানে এক বছরের ব্যবধানে পরপর জন্ম দিয়েছে অপুষ্ট দুটো নিষ্পাপ শিশু। চার বছর বয়সী বড় ছেলেটি জন্মের পর কয়েক মাস পর্যন্ত মাতৃদুগ্ধপানের সুযোগ পেলেও ময়নার ভাগ্যে জোটেনি এক ফোঁটা দুধও। রোগেশোকে অসুস্থ সালেহার পুষ্টিহীনতার কারণে জন্মের পর ময়না পায়নি বুকের দুধ। ওকে তাই চার-পাঁচ মাস পর্যন্ত একটানা খাওয়াতে হয়েছে ভাতের মাড়, গরুর দুধ প্রভৃতি কৃত্রিম শিশুখাদ্য। এরপর এই যে শুরু হলো বাছবিচারহীন খাওয়াদাওয়া আজও চলছে সেই ধারা। একনাগাড়ে ছয় মাস পর্যন্ত বুকের দুধ পান তো দূরের কথা, হাবিজাবি খেয়েই তাকে এ পর্যন্ত আসতে হয়েছে। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। মাতৃদুগ্ধ পানের সুযোগ না পাওয়ায় শিশুটির ওপর নেমে এসেছে প্রকৃতির খড়্গ।

ওপরের গল্প থেকে এটাই বোঝা যায়, ময়নার জন্য মাতৃদুগ্ধের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। মায়ের দুধের কোনো বিকল্প নেই। উন্নত জাতির জন্য চাই সুস্থ মা। একমাত্র সুস্থ মা-ই পারেন উপহার দিতে সুস্থ সন্তান। শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ জীবনের কর্ণধার। মাতৃদুগ্ধ সন্তানের সুস্থতা, পুষ্টি ও স্বাভাবিক মানসিক বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

প্রতিবছর বিশ্বের ১৭০টি দেশে ১ থেকে ৭ আগস্ট বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ পালন করা হয়। শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর উৎসাহ দিতে এবং শিশুদের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে এই কর্মসূচি। বুকের দুধ খাওয়ানোয় জোর দিতে ১৯৯০ সালের আগস্ট মাসে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের যৌথ ঘোষণাকে সফল করতেই এই কর্মসূচি। ১৯৮১ সালের মে মাসে বিশ্বস্বাস্থ্য সম্মেলনে ইন্টারন্যাশনাল কোড অব ব্রেস্ট সাবস্টিটিউট অনুমোদিত হয়। এর পর থেকে মায়ের দুধের প্রতি প্রাধান্য বা গুরুত্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে এর বিকল্প পণ্যের প্রচার বন্ধে রেডিও-টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়। 

বাংলাদেশে ১৯৯২ সাল থেকে প্রতিবছর ১ থেকে ৭ আগস্ট বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। তবে এ বছর ২ আগস্ট থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত সপ্তাহটি পালিত হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে জাতীয়ভাবে এই সপ্তাহ পালিত হয়। ২০২১ সালে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের মূলমন্ত্র হলোÑ‘প্রটেক্ট ব্রেস্টফিডিং: রেসপনসিবিলিটি’, যার ভাবার্থ হলো‘মাতৃদুগ্ধদান সুরক্ষায় সকলের সম্মিলিত দায়।’ নবজাতক ও শিশুদের শারীরিক সংকট থেকে মুক্ত করে তাদের বাঁচিয়ে তোলা এবং তাদের স্বাস্থ্য ও শরীরের উন্নতির জন্য মায়ের দুধের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিতেই এই কর্মসূচি। এদেশে আবহমানকাল থেকে দুই-আড়াই বছর পর্যন্ত শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রথা ও ঐতিহ্য চলে এলেও কিছু কিছু মা তার শিশুকে মাতৃদুগ্ধ পানের ক্ষেত্রে অনীহা প্রদর্শন ও আপত্তি করে থাকেন তাদের স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার অজুহাতে। আবার কেউ ফ্যাশন হিসেবেও বাজারের প্যাকেটজাত শিশুখাদ্য খাইয়ে শিশু প্রতিপালনে আগ্রহী। কিন্তু এর ফলে প্রাণাধিক শিশুর যে কী ক্ষতি হচ্ছে, তা তারা বুঝতেই পারেন না। জরুরি শারীরিক সংকটে শিশুরাই সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ে। এর মধ্যে আরও বেশি সমস্যায় পড়ে নবজাতক। এমনকি ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় তাদের মৃত্যুও হতে পারে। শারীরিক সংকটে মায়ের দুধই খাওয়ানো উচিত। এ সময়ে মায়ের দুধের বিকল্প কিছু অপরিমিত পরিমাণে একেবারেই খাওয়ানো উচিত নয়। এতে মায়ের দুধের উপকারিতাকে উপেক্ষা করা হয়।

উন্নত বিশ্বের তুলনায় আমাদের দেশের মায়েরা সন্তানকে অনেক বেশি পরিমাণে বুকের দুধ খাওয়ায়। এটা পরিমাণ ও সময় উভয় দিক দিয়ে বেশি। ডব্লিউএইচও বিভিন্ন দেশে সমীক্ষা করে দেখেছে, বাংলাদেশ এ ব্যাপারে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। সরকারিভাবে দিনটি পালন করার ফলে মায়ের দুধের উপকারিতা সম্পর্কে আরও অনেক তথ্য জনগণ জানতে পারে। এতে মায়ের দুধ খাওয়ানোর প্রবণতা আগের চেয়ে অনেকটা বাড়ছে। এক তথ্যে জানা যায়, অন্তত ৯ হাজার গবেষণাপত্রের ফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, স্তন্যদানকারী মা প্রসব-পরবর্তী বিষণœতায় কম ভোগে। স্তন্যদানকালে অক্সিটোসিন নামক একটি হরমোনের মাত্রা শরীরে বেড়ে যায়, যেটি মানসিক রিল্যাক্সেশন (প্রশান্তি) আনয়ন করে। স্তন্যদানকারী মায়ের শরীরে এই হরমোনের মাত্রা ৫০ শতাংশ, যেখানে অন্য মায়েদের মধ্যে এর মাত্রা আট শতাংশ। অন্যদিকে স্তন্যদানকারী মায়ের স্তন ও জরায়ুর ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কাও কম। স্তন ক্যানসার বর্তমানে নারীদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ। যত দিন মা সন্তানকে দুধ খাওয়ায়, তত দিন তার ডিম্বকোষ থেকে সাধারণত ডিম্ব নিঃসৃত হয় না, অর্থাৎ ডিম্বকোষটি নিষ্ক্রিয় থাকে। এ কারণে যেসব মা বুকের দুধ বেশি দিন খাওয়ায়, তাদের মাঝে ডিম্বকোষের ক্যানসারও কম দেখা যায়। আবার সন্তান গ্রহণের ফলে শরীরে যে বাড়তি মেদ জমা হয়, স্তন্যদান করলে তা আবার কমে যায়। স্তন্যদান করানোর মাধ্যমে গর্ভধারণের পরে আবার শরীরের স্বাভাবিক আকারে ফিরে আসা সহজ হয়।

মায়ের দুধে পর্যাপ্ত পরিমাণে আমিষ, চর্বি, লবণ, খনিজ পদার্থ ও এনজাইম আয়রন থাকে। প্রচুর পানি থাকে। তাই গ্রীষ্মকালেও শিশুকে আলগা পানি খাওয়াতে হয় না এবং শিশুদের কোনো অতিরিক্ত ভিটামিন খাওয়াতে হয় না। ফলে শিশুদের রক্তশূন্যতা হয় না। কোনো ধরনের রোগজীবাণু থাকে না, তাই এই দুধ খেয়ে শিশুরা অসুস্থ হয় না। বরং ডায়রিয়া হলে ডাক্তাররা মায়ের বুকের দুধ বেশি করে বারবার খাওয়াতে বলেন।

মায়ের দুধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর উপকরণ প্রচুর পরিমাণে থাকে। মায়ের দুধ খেলে শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ করার জন্য একরকম অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুমৃত্যুরোধে মায়ের দুধের বিকল্প নেই। জšে§র মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো নিশ্চিত করা গেলে নবজাতকের মৃত্যুর হার ৩১ শতাংশ কমে যায়। মায়ের দুধ প্রতিবছর ৫৫ হাজার নবজাতকের মৃত্যু প্রতিরোধ করতে পারে। আর বুকের দুধ ও সম্পূরক খাবার বছরে ১৯ শতাংশ শিশুমৃত্যু রোধ করতে পারে। পৃথিবীতে আর কোনো প্রতিরোধক নেই, যা একসঙ্গে ১৯ শতাংশ শিশুমৃত্যু কমাতে পারে।

মায়ের বুকের দুধ সবসময় তৈরি অবস্থায় পাওয়া যায়। এজন্য আলাদা কোনো শ্রম, টাকা বা সময় ব্যয় করতে হয় না। কর্মজীবী মায়েদের বিশেষ সুবিধা হলো তারা বুকের দুধ বোতলে করে ফ্রিজে ২৪ ঘণ্টা এবং ফ্রিজের বাইরে ছয় ঘণ্টা রাখতে পারে। এতে দুধের গুণগত মানের কোনো পরিবর্তন হয় না। মা বাইরে কর্মব্যস্ত থাকলেও এই দুধ বারবার খাওয়ানো যায়। এতে খরচ নেই বললেই চলে এবং মা ও সন্তানের বন্ধন দৃঢ় হয়।

বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশনের (বিবিএফ) কর্মসূচির পুষ্টিবিদরা মনে করেন, শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়াতে নিজেদের সচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। মায়েরা ইচ্ছা করলেই শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারে। এটি সম্পূর্ণ মায়ের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। জš§ থেকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর পেট কখনোই মায়ের দুধ ছাড়া অন্য কিছু নিতে প্রস্তুত থাকে না, এমনকি এক ফোঁটা পানিও না। জš§নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি হিসেবে মায়ের দুধের ভূমিকা অনেক বেশি।

মায়ের দুধ খাওয়ানো ধনী, সম্পদশালী কিংবা ভাগ্যবানদের বিলাসিতা নয়; বরং মায়ের দুধ খাওয়ানো সব মায়েরই ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব-কর্তব্য। যত দিন মা মাতৃদুগ্ধ পান করাবে, তত দিন শিশুর সঙ্গে মায়ের বন্ধন অটুট থাকবে। উন্নত দেশেও এর ওপর প্রচুর গবেষণা হচ্ছে। এছাড়া শিশুদের জরুরি শারীরিক সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতির অংশ হিসেবে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোয় প্রশিক্ষিত নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মী থাকা উচিত, যারা মাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে।

বর্তমানে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও বিভিন্ন কর্মসংস্থানে নিজেদের নিয়োজিত করছে। উদাহরণ হিসেবে আমরা দেখতে পারি, বর্তমানে বাংলাদেশে গার্মেন্টে কর্মরত শ্রমিকদের ৮৫ শতাংশই নারী, যারা দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। এক্ষেত্রে একজন কর্মী ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্যে সর্বোপরি দেশের উন্নয়ন বৃদ্ধিতে এসব নারী কর্মীকে গর্ভাবস্থা থেকে শুরু করে প্রসব-পরবর্তী প্রতিটি ধাপে আমাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রদান করা জরুরি। সেজন্য সরকার ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রদান করাসহ পরবর্তী কর্মক্ষেত্রে এসব মায়ের শিশুকে দুধ খাওয়ানোর অনুকূল পরিবেশ রাখার বিষয়ে উৎসাহ দিয়ে আসছে।

শিশুর নিরাপদ জন্মগ্রহণ ও বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালে জাতীয় শিশুনীতি প্রণয়ন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ উদ্বোধনকালে প্রতিটি অফিস, আদালত, শপিং মল, ব্যাংক, বিমা ও হাসপাতালে মাতৃদুগ্ধ পানের সুব্যবস্থা, আগে তৈরিকৃত ব্রেস্টফিডিং কর্নারগুলো সচল করা এবং নতুন কর্নার স্থাপনের ব্যবস্থা করাসহ মাতৃ ও শিশুপুষ্টি উন্নয়নে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন। বর্তমানে নিরাপদে মাতৃদুগ্ধ পান করতে ঢাকা শহরে ২৫টি, বিভাগীয় শহরে পাঁচটি, জেলা শহরে ১৩টিসহ মোট ৪৩টি ডে-কেয়ার সেন্টার চালু রয়েছে। মাতৃত্বকালীন ভাতার মেয়াদ দুই বছর থেকে বাড়িয়ে তিন বছর করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

এক্ষেত্রে গণমাধ্যম মানুষের সচেতনতা সৃষ্টি ও বৃদ্ধিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। ধর্মীয় নেতা ও স্কুল-কলেজের শিক্ষকরাও মাতৃদুগ্ধের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে শিশুদের সচেতন করতে পারেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠ্যপুস্তকে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হলে শিক্ষার্থীরা এ বিষয়ে আরও অধিক সচেতন হবে। সরকারসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা শিশুর মাতৃদুগ্ধ পানের অধিকারকে নিশ্চিত করতে পারে। বিশ্বের প্রতিটি শিশু বেড়ে উঠুক মাতৃদুগ্ধের আশীর্বাদ ও নিরাপদ ছায়াতলেÑএমন স্বপ্ন আমরা দেখতেই পারি।

পিআইডি নিবন্ধন

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..