মত-বিশ্লেষণ

শিশুর স্কুলব্যাগের ভার কমাতে প্রয়োজন সচেতনতা

মো. আব্দুল আলীম: সাত বছরের শিশু রিফা প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। প্রতিদিন বইয়ের ব্যাগ নিজেই বহন করে নিয়ে স্কুলে যায় সে। বাবাকে কোনোভাবেই বইয়ের ব্যাগ নিতে দেবে না। ভারী বইয়ের ব্যাগ সন্তানের পিঠে দেখে বাবার মন মানে না। বাবা স্কুলব্যাগটা নিজে বহন করতে চাইলেও শিশু নাছোড়বান্দা। শিশুর পিঠে বইয়ের ব্যাগ অথবা অভিভাবকের কাঁধে বইয়ের ব্যাগসহ কাকডাকা ভোরে সন্তানের হাত ধরে স্কুল অভিমুখে ছুটতে থাকার দৃশ্য আমাদের দেশে নিয়মিত। এটা শহরের চিরচেনা দৃশ্য। এভাবেই চলছে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর।

অবুঝ শিশুরা জানে না, ভারী বইয়ের ব্যাগ তার মেরুদণ্ডের কতটা ক্ষতি করতে পারে। শিশু স্বাধীনতা চায়; স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যদিও বলেছিলেন, ‘শিশু হাসি-আনন্দের মধ্য দিয়ে মনের অজান্তেই শিক্ষা গ্রহণ করবে।’ কিন্তু বাস্তব অবস্থা ভিন্ন। ব্যাগে বইয়ের সমাহার যেন শিশুকে পড়ার প্রতিযোগিতায় নামানোর মতো। শহরের বেশিরভাগ স্কুলেই দুই শিফটে ক্লাস হয়। সকালের শিফটে পড়া শিশুদের ভোর ৬টা বা তার আগে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হতে হয়। কোনো শিশুই এত ভোরে ঘুম থেকে উঠতে চায় না। তাদের জোর করে ওঠানো হয়। এতে শিশুর স্বতঃস্ফূর্ততা নষ্ট হয়, লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ কমে যায়। আবার অতিরিক্ত বইয়ের ব্যাগ বহন করার ফলে তাদেও শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, মেরুদণ্ড ও হাড়ের বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে বেড়ে উঠছে তারা।

বই জ্ঞানের ধারক-বাহক, কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু প্রতিদিন শিশুকে তার সামর্থ্যরে চেয়ে অতিরিক্ত বইয়ের বোঝা বহন করতে হচ্ছে। আর এই বোঝা বহন করে গুরুতর শারীরিক ক্ষতির দিকে এগোচ্ছে আমাদের শিশুরা। এভাবে কত শিশু যে মেরুদণ্ডের অসুখে ভুগছে, তার কোনো পরিসংখ্যান নেই বলে মনে করেন শিশু বিশেষজ্ঞরা। লেখাপড়া প্রয়োজন, তবে তা কোনোভাবেই শিশুর শারীরিক অসুস্থতার বিনিময়ে নয়। স্কুলব্যাগের ভারে সৃষ্ট শিশুর শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যেও অসহায়ত্ব দেখা যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন স্কুলের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীর বইয়ের ব্যাগের ওজন তিন কেজির বেশি। ইংলিশ ভার্সনের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীর ব্যাগের ওজন গড়ে প্রায় চার কেজি। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীর বইয়ের ব্যাগের ওজন পাঁচ কেজির বেশি। চিকিৎসকদের মতে, পাঁচ বছরের একটি সুস্থ-সবল ছেলেশিশুর ওজন ১৮ দশমিক সাত কেজি, একটি মেয়েশিশুর ওজন ১৭ দশমিক সাত কেজি, আর ছয় বছরের একটি সুস্থ-সবল ছেলেশিশুর ওজন ২০ দশমিক ৬৯ কেজি আর একটি মেয়েশিশুর ওজন ১৯ দশমিক ৯৫ কেজি। সেই হিসেবে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীর ব্যাগের ওজন তার শরীরের ওজনের ১০ শতাংশ অর্থাৎ দুই কেজি হওয়ার কথা। সেখানে ঢাকার খ্যাতনামা স্কুলগুলোর প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীর ব্যাগের ওজন তিন থেকে সাড়ে পাঁচ কেজি পর্যন্ত দেখা যায়। অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও হিসাবটা একই রকম। অথচ সরকার-নির্ধারিত বইয়ের সংখ্যা প্রথম থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত তিনটি এবং তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির জন্য ছয়টি।

২০১৪ সালে প্রাথমিক স্কুলের শিশুদের শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি ভারী স্কুলব্যাগ বহন নিষেধ করে সুনির্দিষ্ট একটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে নির্দেশ দেন উচ্চ আদালত। এতে তদারকির জন্য সেল রাখা, ব্যর্থ হলে কী শাস্তির ব্যবস্থা থাকবে, তাও উল্লেখ করতে বলা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালের ১১ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি পরিপত্র জারি করা হয়। সেখানে বলা হয়, শিশুরা যে ব্যাগ বহন করবে, তার ওজন শিক্ষার্থীর ওজনের এক-দশমাংশের বেশি হবে না এবং সরকার অনুমোদিত বই ও উপকরণ ছাড়া অন্য কোনো কিছু ব্যাগে না দেওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়। বাস্তবে এর প্রতিফলন দেখা যায় না।

সুস্বাস্থ্য অর্থ সুন্দর জীবন। সুস্বাস্থ্য মানসিক ও সামাজিক বিকাশে ভূমিকা রাখে। ভারী ব্যাগ বহনের কারণে কোমলমতি শিশুদের মেরুদণ্ডের হাড় বাঁকা হয়ে যায়। এতে শিশুর স্বাস্থ্যগত জটিলতা দেখা দেয়। এতে শিশুরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে। শিশুরা যদি এই ভারী ব্যাগ বহন করতে থাকে, তাহলে তারা কখনও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে পারবে না। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে না পারলে তারা সুনাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠতে পারবে না। ফলে সমগ্র জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজš§ এই শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা করতে হবে আমাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে। বেশি ওজনের স্কুলব্যাগ বহনের কারণে প্রাথমিকে যাওয়া শিশুদের শরীরে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, ভারী ব্যাগ বহন করার ফলে শিশুরা দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। বইয়ের ভারী ব্যাগ বহন করার জন্য শিশুর পিঠে-ঘাড়ে যে ব্যথার কারণ হতে পারে, তা অনেকেই বুঝতে পারেন না। ফলে অনেকে দেরিতে চিকিৎসকের কাছে আসেন। এই ব্যথার হাত থেকে শিশুদের বাঁচানোর জন্য একমাত্র সমাধান বইয়ের বোঝা কমাতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে।

‘জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০১০’ অনুযায়ী বাংলাদেশের সংবিধানে সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা ও জাতিসংঘ শিশু অধিকার বিবেচনায় রেখে মানবতার বিকাশ এবং জনমুখী উন্নয়ন ও প্রযুক্তিতে নেতৃত্বদানের উপযোগী মননশীল, যুক্তিশীল, নীতিবান, নিজের ও অন্যের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কুসংস্কারমুক্ত, পরমতসহিষ্ণু, অসাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক ও কর্মকুশল নাগরিক হিসেব গড়ে তোলা শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। সময়ের চাহিদা ও প্রত্যাশা অনুযায়ী শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণীত হওয়া প্রয়োজন। যুগের দাবি মেটাতে না পারলে সে শিক্ষা মানুষের কাজে আসে না।

আমাদের দেশের শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় চার থেকে পাঁচ বছর বয়সের মধ্যে। যদিও পরিবার থেকে অনেক আগেই শিশুর হাতেখড়ি শুরু হয়। শিশুর শারীরিক বিকাশের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে স্কুলব্যাগ। কেবল বইয়ের কারণেই ব্যাগের ওজন বাড়ে তা নয়, বইয়ের সঙ্গে প্রত্যেকটি বিষয়ের জন্য সিডব্লিউ ও এইচডব্লিউ দুটি করে খাতাসহ আনুষঙ্গিকভাবে একটি ডায়েরি, পেনসিল বক্স, জ্যামিতি বক্স, ঢিফিন বক্স, পানির পট, স্কেল ইত্যাদি জিনিস ব্যাগের ওজনকে আরও বাড়িয়ে দেয়। শহরের স্কুলের পাশাপাশি গ্রামের স্কুলগুলোতেও এ দৃশ্য এখন আর নতুন নয়। ছোট শিশুর কাঁধে বড় ব্যাগ দেখে মনে হয়, লেখাপড়া শেখার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়ে যেন তারা বই বহন করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এটা শিশু শিক্ষার্থীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক সংকট। প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান, কিন্ডারগার্টেন ও ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে এ সংকট আরও ভয়াবহ। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের প্রতিবাদ একেবারেই মূল্যহীন। শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেজন্য আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও শিশুদের ওপর থেকে বাড়তি বইয়ের চাপ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শ্রেণি অনুসারে বইয়ের সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি ভারতে কিছু জায়গায় শ্রেণিকক্ষে বইবিহীন শিক্ষাপ্রকল্পও শুরু করা হয়েছে। উন্নত অনেক দেশে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অতিরিক্ত বইও পড়ানো হয়। তবে সে বই ব্যাগে আনা-নেওয়া করতে হয় না। সেখানে এসব বই স্কুল গ্রন্থাগারে বসেই পড়ার ব্যবস্থা রয়েছে শিশুদের জন্য। আমাদের দেশেও বইয়ের চাপ কমানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী ও উচ্চ আদালতেরও নির্দেশনা রয়েছে। উদ্যোগটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে খুদে শিশুরা বইয়ের ভারী ব্যাগ বহন করা থেকে মুক্তি পাবে। তবে তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অভিভাবক, শিক্ষক ও স্কুল কমিটির সদস্যদের আন্তরিকতা ও সচেতনতা প্রয়োজন। একইসঙ্গে কর্তৃপক্ষেরও যথাযথ মনিটরিং ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। সুষ্ঠু মানসিকতায় শিশুদের লেখাপড়া করার সুযোগ দেওয়ার জন্য সহযোগিতা করা প্রতিটি অভিভাবকের দায়িত্ব। শিক্ষা হতে হবে আনন্দময়। বইয়ের বোঝা বাড়িয়ে শিশুদের আনন্দময় শৈশব যাতে বিষাদময় না করা হয়, সে বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বয়স, মেধা ও গ্রহণক্ষমতা অনুযায়ী শিক্ষাবোর্ড যে শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করেছে তা উপেক্ষিত হচ্ছে। সরকার-অনুমোদিত বইয়ের বাইরে বিভিন্ন বই কিনতে গিয়ে অভিভাবকদের খরচও বেড়ে যাচ্ছে। বাড়তি বই পড়ার চাপ এবং বেশি পরীক্ষার কারণে শিশুর মনে পরীক্ষাভীতি তৈরি হচ্ছে। ক্লাসে ঠিকমতো পড়া না হওয়ার কারণে অভিভাবকরা কোচিংমুখী হচ্ছেন। এতে স্কুলের শিক্ষার্থীদের খাওয়া-দাওয়া ও ঘুম প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হচ্ছে। অভিভাবকদের অবস্থাও একই। অথচ এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় পড়ে শিশুর শৈশব আজ হুমকির সম্মুখীন।

প্রতিটি শিশুই অফুরন্ত সম্ভাবনাময়। তাদের প্রতিভা বিকাশের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আমাদের বোঝা উচিত শিশুর প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্জনের পথ মসৃণ হলে পরবর্তী শিক্ষাজীবন স্বাচ্ছন্দ্যময় হয়। কাজেই শিশু শিক্ষার্থীদের ঘাড় থেকে বইয়ের বোঝা কমাতে পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই। সরকারের নির্দেশনা ছাড়া এবং অনুমোদনহীন যেকোনো বই ও শিক্ষা উপকরণ শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানোর বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। শিশুর যথাযথ বিকাশে আইনের সঠিক বাস্তবায়ন অত্যন্ত প্রয়োজন। এতে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক হবেন এবং আমাদের শিশুরা অহেতুক পড়ার চাপ এবং বইয়ের ভার বহন থেকে মুক্তি পাবে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ ➧

সর্বশেষ..