শিশুশ্রম নিরসনে দরকার বাস্তবানুগ পরিকল্পনা

সব শিশুর একটা স্বপ্ন থাকে। কিন্তু অনেকের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে ঢাল হয়ে দাঁডায় দারিদ্র্য। যে বয়সে শিশুর বই হাতে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, সেই জীবিকার অন্বেষণে কারখানায় যাচ্ছে, সেই বয়সে তারা হাতুড়ি নিয়ে ইট ভাঙতে যায়, তাদের হোটেল বয়ের কাজ করতে দেখা যায়, বাসের হেলপার হিসেবে। যে বয়সে সে কাঁধে স্কুলব্যাগ নিয়ে পড়তে যাবে, সে বয়সে তার ছোট কাঁধে তুলে নেয় সংসারের দায়িত্ব। জাতিসংঘ শিশু সনদে ১৮ বছরের কম বয়সী সবাইকে শিশু বলা হয়েছে। পেনাল কোডের ধারায় শিশুদের বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ বছরের কম।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ঘোষণায় আঠার বছর বয়স পর্যন্ত যেকোনো ধরনের শারীরিক ও মানসিক শ্রমকে শিশুশ্রম বলা হয়েছে। শিশুশ্রম অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটা বিষয়। বাংলাদেশে এখন ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু কর্মরত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার শিশু রয়েছে, যাদের কাজ শিশুশ্রমের আওতায় পড়েছে। বাকি শিশুদের কাজ অনুমোদনযোগ্য।

কর্মরত শিশুদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত আছে ১২ লাখ ৮০ হাজার জন। আর ২ লাখ ৬০ হাজার শিশু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে। তাদের কাজের বৈশিষ্ট্য জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য বেশ হুমকিস্বরূপ।

সংবিধানে শিশুশ্রমকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও সমাজে শিশুশ্রম বেড়েই চলছে। বাংলাদেশে শিশুশ্রম নির্মুল করার জন্য বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা থাকলেও বাস্তবিকভাবে এর কোনো প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায় না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও ইউনিসেফ পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে প্রায় ৩০১ ধরনের অর্থনৈতিক কাজ-কর্মে শিশুরা শ্রম দিচ্ছে। এদের মধ্যে রয়েছে কুলি, হকার, রিকশাচালক, ফুলবিক্রেতা, আবর্জনা সংগ্রাহক, ইট-পাথর ভাঙা, হোটেল বয়, বুননকর্মী, মাদক বাহক, বিড়ি শ্রমিক, কলকারখানার শ্রমিক ইত্যাদি। অথচ আমাদের দেশে শিশুশ্রমকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

শিশু শ্রমিক শব্দটির সঙ্গে গেঁথে আছে অপমান, অবহেলা, শোষণ কিংবা স্বপ্নভঙ্গের বীভৎস গল্প। যেসব শিশু শ্রম বিক্রি করে তারা প্রতিনিযত নিগৃহীত হয় কথিত সুশীল সমাজের মানুষদের কাছে। তারা একটু সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে পারে না। আগামীর কর্ণধার শিশু সুন্দরভাবে বেড়ে উঠতে না পারলে আমরা সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে ব্যর্থ হবো। তাই দেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার জন্য আমাদের উচিত শিশুশ্রমকে নির্মূলে ব্যবস্থা নেয়া।

কেবল শিশু শ্রমিক এবং ঝুঁকির মুখে থাকা শিশুদের জন্যই নয়, পিতা-মাতা এবং জ্যেষ্ঠ ভাই-বোনদের জন্য উপযুক্ত কাজের সুযোগ প্রদান করার লক্ষ্যেও বাধ্যতামূলক শিক্ষা, দক্ষতা বিকাশ এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে গুরুত্ব দিয়ে আমরা আমাদের অংশীদারদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ চালিয়ে যাব। একটু ভালোবেসে হাত বাড়ালেই আমরা গড়তে পারি সুন্দর একটি পৃথিবী। শিশুশ্রমমুক্ত বাংলাদেশ। এজন্য সব নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে সচেতনভাবে। আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গডতে হলে অবশ্যই শিশুশ্রম বন্ধ করতে হবে। তাই আসুন শিশুশ্রম বন্ধে সবাই আওয়াজ তুলি। সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলি।

আবির হাসান সুজন

শিক্ষার্থী, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় 

সর্বশেষ..