দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

শিশুশ্রম মুক্ত দেশ ও আমাদের প্রত্যাশা

সাজিয়া হাফিজ: শিশুশ্রম আমাদের দেশে একটি বহুল প্রচলিত শব্দ। শিশুদের আর্থিক লেনদেনসহ অথবা আর্থিক লেনদেন ছাড়াই কোনো কাজের জন্য নিয়োগ করা হলে তা শিশুশ্রমের আওতায় পড়ে। শোষণমূলক বিবেচনায় আইনে শিশুশ্রম অবৈধ। বর্তমান বিশ্বে ১৫ বছরের নিচে প্রায় মোট জনসংখ্যার দশ ভাগ শিশু বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত আছে, যা ১৬০ মিলিয়নের অধিক। এ বিরাট অংশ শিশুদের বেড়ে ওঠা আর বেঁচে থাকা দুই-ই হয় চরম দারিদ্র্য আর বঞ্চনার মধ্য দিয়ে। উন্নত জীবনের জন্য শিক্ষা গ্রহণ ও দক্ষতা উন্নয়নের কোনো সুযোগ পায় না তারা। শিক্ষা এবং উন্নত জীবনের স্বপ্ন অধরাই থেকে যায় তাদের জীবনে।

১৮ শতকের শেষভাগে গ্রেট ব্রিটেনে শিল্প-কারখানা চালু হলে সর্বপ্রথম শিশুশ্রম চিহ্নিত হয় একটি সামাজিক সমস্যা হিসেবে। ব্রিটেনে ১৮০২ সাল পরবর্তী বছরগুলোয় সংসদে গৃহীত আইন করে বন্ধ করা হয় এ শিশুশ্রম। ইউরোপের অন্যান্য দেশেও অনুসরণ করা হয় এ আইন। ১৯১০ সালের পর শিশুশ্রম দেখা দেয় একটি স্বীকৃত সমস্যা হিসেবে। তখন শিশুরা কাজ করত কারখানায় শিক্ষনবিশ অথবা গৃহপরিচারক হিসেবে। কিন্তু তা ক্রমেই শোষণের ভয়ানক রূপ ধারণ করে। শুরু হয় দাস প্রথার ভিন্ন আরেক রূপ। ১৯৪০ সালে বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশে শিশুশ্রম বন্ধের আইন প্রণীত হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উৎপাদন বৃদ্ধির আবশ্যকতা আবার পেছন ফেরায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯১৮ এবং ১৯২২ সালে সুপ্রিম কোর্ট নিষিদ্ধ ঘোষণা করে মার্কিন কংগ্রেস প্রণীত শিশুশ্রম আইন। ১৯২৪ সালে কংগ্রেসে একটি সংবিধান সংশোধনী পাস করা হলেও অনুমোদন পায়নি অনেক অঙ্গরাজ্যে। ১৯৩৮ সালে প্রণীত প্রথম লেবার স্ট্যান্ডার্ড অ্যাক্টস ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত পেশার জন্য বয়স ধার্য করে ন্যূনতম ১৮ বছর এবং সাধারণ নিয়োগের জন্য ১৬ বছর।

আইএলও’র সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বের প্রায় ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিশু নানাভাবে বিক্রি করছে তাদের শ্রম। এদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত প্রায় সাড়ে ৮ কোটি শিশু। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত ‘জাতীয় শিশু জরিপ ২০০৩’ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিভিন্ন শ্রমে নিয়োজিত আছে প্রায় ৩৪ লাখ শিশু। এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত প্রায় ১২ লাখ শিশু। ২০০৬ সালের শিশু সনদে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের সার্বিক শ্রম এবং ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে কারখানায় ১৮ বছরের কম বয়সের শ্রমিক নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ন্যূনতম মজুরি অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী, কিশোরসহ সব শ্রমিকের জন্য ন্যূনতম মজুরি প্রদানের নির্দেশ এবং নিয়োগকারী কর্তৃক ১৮ বছরের কম বয়সী শ্রমিককেও বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাণের কম মজুরি প্রদান বেআইনি বলে ঘোষণা করা হয়েছে। দোকান ও স্থাপনা আইন ১৯৬৫ অনুসারে দোকানে বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ১২ বছরের কম বয়সী শিশু নিয়োগ নিষিদ্ধ। এই আইন ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যক্তির জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছে শ্রমঘণ্টা। কারখানা আইন ১৯৬৫ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগগদান নিষিদ্ধ করেছে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুকে। কারখানার নারী শ্রমিকদের ৬ বছরের নিচে সন্তানদের লালন-পালনের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির নির্দেশ দিয়েছে এই আইন। ‘শিশু আইন ১৯৭৪’ এবং ‘শিশু বিধি ১৯৭৬’-এ সব ধরনের আইনগত প্রক্রিয়ায় শিশুর স্বার্থ রক্ষা করাসহ আলাদা কিশোর আদালত গঠনের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। ‘খনি আইন ১৯২৩’ অনুযায়ী খনিতে নিয়োগদান নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে ১৫ বছরের কম বয়সীদের। রেলওয়ের কয়েকটি কাজে শিশুদের নিয়োগ এবং রেলওয়ে যানবাহনে অথবা কোনো বন্দরের অধীন এলাকায় শিশুদের ভাসমান ব্যবসা নিষিদ্ধ করেছে ‘শিশু নিয়োগ আইন ১৯৩৮’।

২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি বাস্তবায়নের জন্য ২০১২ সালে গৃহীত হয় পাঁচ বছর মেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০১২-২০১৬), যেখানে ২০১৬ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনের বিষয়ে অঙ্গীকার করা হয়েছে। সরকারের নানা উদ্যোগের ফলে শিশুশ্রম পুরোপুরি বন্ধ না হলেও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৮টি পেশাকে। আর ২০২১ সালের মধ্যে এসব পেশার ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধে প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।

শিশুশ্রম নিরসনে রয়েছে সরকারি-বেসরকারি অনেক পদক্ষেপ। শিশুশ্রমের সঙ্গে জড়িত রয়েছে অনেকগুলো কারণ। অনেকের মতে, দারিদ্র্য আসল সমস্যা। তবে অশিক্ষা, অনিশ্চয়তা আর অসচেতনতার নজরকাড়ার মতো। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অন্যতম লক্ষ্য সব শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে দেশের বিদ্যমান অনেক সমস্যার সমাধান সহজ হয়ে উঠতে পারে। তবে শিক্ষিত জাতি গঠন করে শিশুশ্রম বন্ধ করা সহজ নয়। আগে শিশুশ্রম বন্ধ করতে পারলে শিক্ষিত জাতি গঠন সম্ভব হবে। আর এজন্য চাই সচেতনতা বৃদ্ধি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিশুদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালে প্রথম শিশু আইন প্রণয়ন করেন। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার শিশুদের সুস্থ পরিবেশে মানুষ হওয়ার সুযোগ দিতে, তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে ২০০১ সালে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম-সংক্রান্ত আইএলও কনভেনশনে অনুস্বাক্ষর করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের ২০০৩ সালের এক জরিপে দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ৩৪ লাখ শিশুশ্রমে নিযুক্ত। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন প্রকল্প গ্রহণ, মা-বাবা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে গত এক দশকে শিশুশ্রমের সংখ্যা নেমে আসে অর্ধেকে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন (সংশোধিত-২০১৮) অনুযায়ী ১৪ বছরের নিচে কোনো শিশুকে শ্রমে নিযুক্ত করা যাবে না, তবে ১৪ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ নয়Ñএমন হালকা কাজ করতে পারবে। বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিযুক্ত শিশুশ্রমের সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। শিশুশ্রম নিরসনে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে ২২টি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে জাতীয় শিশুশ্রম কল্যাণ পরিষদ গঠন করা হয়। বিভাগীয় পর্যায়ে কমিশনার জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও এ কমিটি সদস্য। এই কমিটিগুলো শিশুশ্রম নিরসনে সামাজিক আন্দোলন এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। মাঠ পর্যায়ে কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর কল-কারখানায় শিশুশ্রমের বিষয়টিকে শ্রম পরিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত করেছে। শ্রম মন্ত্রণালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন প্রকল্পের মাধ্যমে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম থেকে মুক্ত করে উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম গ্রহণ, বিভাগীয় এবং জেলা পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি সংস্থার অংশগ্রহণে সচেতনতামূলক সভা, সেমিনার এবং কঠোর মনিটরিংয়ের কারণে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুশ্রমের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে।

ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম মুক্ত কর্মস্থলের পরিধিও বাড়ছে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ সালে তৈরি পোশাক শিল্প এবং চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প সেক্টরে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম মুক্ত করা হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আরও ২২টি সেক্টরকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম মুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ইতোমধ্যে ট্যানারি, চামড়াজাত দ্রব্য, জাহাজ ভাঙা, সিল্ক, সিরামিক ও কাচ শিল্প সেক্টরে শিশু শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ করা হয়েছে। জাতীয় মনিটরিং কমিটি বিষয়টি নিয়মিত পরিদর্শন করছে। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনে ২৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে শ্রম মন্ত্রণালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন প্রকল্পের চতুর্থ পর্যায়ের কার্যক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে। চতুর্থ পর্যায়ে এক লাখ শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে সরিয়ে আনা হবে। তাদের উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকালীন শিশুর মা-বাবাকে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হবে। সরকারি-বেসরকারি সংস্থা সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী শিশুশ্রম মুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। প্রয়োজন শুধু সচেতনতা এবং আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসা।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..