মত-বিশ্লেষণ

শিশুশ্রম মুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ

ফরিদা রিয়াজ: প্রচলিত আইনে নির্ধারিত বয়সের চেয়ে কম বয়সে কাজে নিয়োজিত সব শ্রমিকই শিশুশ্রমিক। প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক সকল ক্ষেত্রে শিশুর জন্য শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে ক্ষতিকর এবং শিশুর প্রয়োজন ও অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন বঞ্চনামূলক শ্রমই শিশুশ্রম। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে শিশুশ্রম একটি সামাজিক সমস্যা। এই সামাজিক সমস্যাটির উৎস মূলত পিছিয়ে পড়া নির্দিষ্ট এক জনগোষ্ঠী।

জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ এবং বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী সব বাংলাদেশি ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে এবং ১৪ থেকে ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের কিশোর-কিশোরী হিসেবে গণ্য করা হয়। স্কুল চলাকালে ১৪ বছরের নিচে কোনো শিশুকে তার পরিবারের লিখিত অনুমতি ছাড়া উৎপাদনশীল কাজে নিয়োগ দেয়া বা কাজ করিয়ে নেয়াকে শিশুশ্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইউনিসেফ শিশুশ্রম হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেÑযে কোনো ধরনের কাজ, যা শিশুর স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে ব্যাহত করে, তা-ই শিশুশ্রম। শিশুশ্রম দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু আইন প্রয়োগ করেও বন্ধ হয়নি শিশুশ্রম প্রথা। দেশের যেখানে মোট জনগোষ্ঠীর ২১ শতাংশ দরিদ্র্যসীমার নিচে, সেখানে ক্ষুধার তাড়নায় ছোট্ট শিশুকেও ঘরের বাইরে কাজে যেতে হয় জীবনধারণের নিমিত্তে, অন্ন-বস্ত্রের আশায়। দরিদ্র পরিবারকে টিকিয়ে রাখার তাগিদে স্কুলের বারান্দা ছেড়ে অনেক শিশুকে পাড়ি জমাতে হয় কোনো এক কারখানার বারান্দায়। কোনো শিশু এভাবেই ছাত্র থেকে পরিণত হয় শিশুশ্রমিকে।

আবার কর্মক্ষেত্রে একটি শিশুশ্রমিককে হতে হয় নানাভাবে নির্যাতিত। অনেক সময়ই বয়স উপযোগী কাজ না পেয়ে করতে হয় বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। ফলে শিশু প্রাণটির ব্যবহার করা হয় অতি তুচ্ছভাবে। কাজ শেষেও প্রায়ই ন্যায্য মজুরি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে হয় শিশুশ্রমিকদের। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন শারীরিক নির্যাতন। প্রায় ক্ষেত্রে অধীনস্থ মালিকের দ্বারা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাদের। মেয়ে শিশুশ্রমিকের বেলায় বিষয়টি আরও বেশি মর্মান্তিক। যৌন হয়রানি ও ধর্ষণ ছাড়াও বিভিন্ন প্রকার অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয় মেয়ে শিশুশ্রমিককে। শিশু গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতনের খবর মাঝে মাঝেই গণমাধ্যমে দেখা যায়।

সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগের ফলে শিশুশ্রমিকদের হার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হলেও একে সমূলে উৎপাটন করা আজও সম্ভব হয়নি। দেশের ছোট-বড় প্রায় সব নগর-মহানগরেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে শিশুশ্রমিকেরা। মহানগরের অলিগলিই যেন অধিকাংশ শিশুশ্রমিকের কর্মসংস্থানের মূল প্রাণকেন্দ্র।

দেশে শিশুশ্রমিক সৃষ্টিতে বিভিন্ন কারণ ক্রিয়াশীল থাকলেও এর প্রধান কারণ যে দারিদ্র্য, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। দরিদ্র শ্রেণির মানুষদের অধিকাংশই নিজেদের অধিকার বিষয়ে অজ্ঞ ও অসচেতন। তাছাড়া তাদের মধ্যে রয়েছ অসচেতনতা, বিবিধ কুসংস্কার ও অজ্ঞতা এবং শিক্ষার অভাব। এসব কারণেই শিশু-কিশোররা শিশুশ্রমে নিযুক্ত হয়। আবার অনেক বাবা-মা অর্থের লোভে শিশুকে কাজে পাঠায়।

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। এই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষা করা এবং তাদের মেধা বিকাশে সহযোগিতা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাদের প্রতি অবহেলা জাতির জন্য ক্ষতিকর। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও শিশুশ্রমের করুণ চিত্র এখনও বিদ্যমান। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা আর সহযোগিতায় এ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

বিবিএসের জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, শিশুশ্রমের সঙ্গে জড়িত শিশু ১৭ লাখ। এর মধ্যে ১২ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে শিশুদের বাধ্যতামূলক অবৈতনিক শিক্ষা, ১৮ অনুচ্ছেদে পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা, ২৮ অনুচ্ছেদে কল্যাণ ও উন্নয়নে বিশেষ আইন প্রণয়ন করা এবং ৩৪ অনুচ্ছেদে জোর করে শিশুশ্রমে নিয়োগ নিষিদ্ধ করার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। শিশুশ্রম বন্ধের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রয়েছে অসংখ্য নীতিমালা। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে শিশুদের বয়স, শ্রম, অধিকার ও কল্যাণ প্রভৃতির ব্যাপারে আইনি কাঠামো ছিল দ্য চিলড্রেন অ্যাক্ট ১৯২৯, শিশুশ্রম আইন ১৯৩৩, শিশু নিয়োগ অ্যাক্ট ১৯৩৮, ফ্যাক্টরিজ অ্যাক্ট ১৯৬৫ এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৪ সালে চিলড্রেন অ্যাক্ট, ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘের শিশু আধিকার সনদ, ১৯৯৪ সালে জাতীয় শিশুনীতি, ২০০৬ সালে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০১০ সালে জাতীয় শিশুশ্রম নিরোধ নীতিমালা, ২০১১ সালে জাতীয় শিশু নীতিমালা, ২০১২-২০১৬ শিশুশ্রম নিরসন জাতীয় পরিকল্পনা, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ শিশু আইন এবং বাংলাদেশ শ্রম আইনের সংশোধনী, ন্যাশনাল চাইল্ড লেবার ওয়েলফেয়ার কমিটি, বিভাগীয় চাইল্ড লেবার ওয়েলফেয়ার কমিটি, জেলা শিশু অধিকার ফোরাম, উপজেলা চাইল্ড লেবার মনিটরিং কমিটিসহ অসংখ্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ২০১০ সালে গৃহীত জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি কার্যকরের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০১২-২০১৬ গ্রহণ করে সরকার। এতে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, ২০১৬ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নির্মূল করা হবে। কিন্তু আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে শিশুশ্রম সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। তাই আবার ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধ করার নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করে সরকার। বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির কারণে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সরকার, আইএলও, ইউনিসেফ, ওয়ার্ল্ড ভিশন, সেভ দ্য চিলড্রেনসহ বিভিন্ন এনজিওর গৃহীত উদ্যোগের কারণে শিশুশ্রম কমে এসেছে। বাংলাদেশ শিশুশ্রম নিরসনে ফলপ্রসূ উদ্যোগ নিয়েছে। সারাদেশে শিশুশ্রম রোধে সরকার পাঁচটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে ৫০ হাজার শিশু, যারা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত, তাদের পুনর্বাসন করা হয়েছে। এক লাখ ৭১ হাজার দরিদ্র শিশুকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। তাদের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক কর্মসূচির ব্যবস্থা করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিশুশ্রম নিরসনের জন্য মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। এছাড়া সরকারের দেশব্যাপী দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করছে। তবে শিশুশ্রম নিরসনের মতো এত বড় কাজ শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে শিশুদের বিরত রাখার জন্য দেশের ব্যবসায়ী ও বিত্তবান ব্যক্তিরা উদ্যোগ নিতে পারেন।

শিশু অধিকার সনদ ও আন্তর্জাতিক চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইনি কাঠামো এবং বিশেষ শিশুনীতি গ্রহণ ও দেশের সব শিশু, বিশেষ করে দুস্থ শিশুদের কল্যাণ সাধনের জন্য সরকার ২০টি জেলা চিহ্নিত করেছে। জেলাগুলো হলোÑজামালপুর, নেত্রকোণা, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, বরগুনা, পটুয়াখালী ও ভোলা জেলা। এ বিশেষ জেলাগুলো ছাড়াও ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগীয় শহরে পথশিশুদের অধিকার সুরক্ষা ও উন্নয়নের নিমিত্ত শিশু বিকাশ কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন (সংশোধিত-২০১৮) অনুযায়ী ১৪ বছরের নিচে কোনো শিশুকে শ্রমে নিযুক্ত করা যাবে না, তবে ১৪ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ নয়, এমন হালকা কাজ করতে পারবে মর্মে উল্লেখ রয়েছে। শিশুশ্রম নিরসনে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে ২২টি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে জাতীয় শিশুশ্রম কল্যাণ পরিষদ গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি শিশুশ্রম নিরসনে সামাজিক আন্দোলন এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। মাঠপর্যায়ে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর শিশুশ্রমের বিষয়টিকে শ্রম পরিদর্শনের আওতায় এনেছে। শ্রম মন্ত্রণালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন প্রকল্পের মাধ্যমে শিশুদের উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম গ্রহণ, বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি সংস্থার অংশগ্রহণে সচেতনতামূলক সভা এবং শ্রম পরির্দশনের কারণে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুশ্রমের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে ।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ৩৮টি ঝুঁকিপূর্ণ কাজের মধ্যে ২০১৭-২০১৮ সালে তৈরি পোশাকশিল্প এবং চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প সেক্টরকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম থেকে মুক্ত করা হয়েছে এবং আরও ২২টি সেক্টরকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম মুক্ত করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে ট্যানারি, চামড়াজাত দ্রব্য, জাহাজ ভাঙা শিল্প, সিল্ক, সিরামিক ও কাচ শিল্প সেক্টরে শিশুশ্রম মুক্ত করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনে ২৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে শ্রম মন্ত্রণালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন প্রকল্পের চতুর্থ পর্যায়ের কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। চতুর্থ পর্যায়ে এক লাখ শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে সরিয়ে এনে তাদের উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকালীন শিশুর বাবা-মাকে মাসিক অর্থ সহায়তা দেয়া হচ্ছে।

আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ শিশুশ্রম মুক্ত হবেÑএ ব্যাপারে সরকার দৃঢ় অঙ্গীকার এবং বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী শিশুশ্রম মুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব এ প্রত্যয়ে কাজ করে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..