আজকের পত্রিকা

শিশু অপব্যবহারের প্রভাব ও গৃহীত পদক্ষেপ

খোন্দকার খোন্দকার মাহ্ফুজুল হক: শিশু জাতি গঠনের মূল ভিত্তি। জাতি গঠনের ক্ষেত্রে শিশুকে পূর্ণ মর্যাদাবান মানুষরূপে গড়ে তোলার বিকল্প নেই। শিশুর বিকাশকে সুষ্ঠু, স্বাভাবিক ধারায় ত্বরান্বিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক প্রতিষ্ঠানসহ সব ক্ষেত্রে শিশুর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেকের একান্ত কর্তব্য।
শিশুর শারীরিক, মানসিক, আবেগীয়, যৌন নির্যাতন, নিগ্রহ, অবহেলাকে শিশু অপব্যবহার বলা হয়ে থাকে। শিশুর প্রতি দুর্ব্যবহারও শিশু অপব্যবহার বলে গণ্য করা হয়। শিশু অপব্যবহার বলতে বোঝায়, শিশুর পিতামাতা অথবা অন্য কোনো তত্ত্বাবধায়ক দ্বারা এমন আচরণ, যা শিশুর শারীরিক, মানসিক ও যৌন ক্ষতিসাধন করে। এর ফলে শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
শিশু অপব্যবহার বিষয়ে সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট এল বার্কার বলেছেন, নির্ভরশীল অপরিণতদের ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত, অনিয়ন্ত্রিত দৈহিক শাস্তি, ধারাবাহিক উপহাস ও বিরূপ এবং অমর্যাদাকর ভাষা প্রয়োগ অথবা বিকৃত যৌন ব্যবহারের মাধ্যমে দৈহিক ও আবেগীয়ভাবে নিয়মিত আঘাত করা; যা সাধারণভাবে পিতামাতা, অন্য কেউ এবং অভিভাবকের দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবে সংগঠিত হয়।
শিশু অপব্যবহারের ক্ষেত্রে শারীরিক, যৌন, মানসিক ও অবহেলা চারটি ধরন দেখা যায়। শিশুর শারীরিক অপব্যবহার বলতে বোঝানো হয় কোনো বয়স্ক ব্যক্তি দ্বারা শিশুকে থাপ্পড় মারা, আঘাত করা, লাথি মারা, ধাক্কা দেওয়া, পোড়ানো, শরীরে ছ্যাঁকা দেওয়া, কান ধরে টানা, চুল ধরে টানা, ছুরিকাঘাত, শ্বাসরোধ করা, প্রহার করা, ঝাঁকুনি দেওয়া, পায়ুপথে বাতাস ঢোকানো প্রভৃতিকে বোঝায়।
শিশুর যৌন অপব্যবহার বলতে যৌন হয়রানি, অশ্লীল শব্দ ব্যবহার, ধর্ষণ, পর্নোগ্রাফি প্রকাশ, যৌন যোগাযোগ জাতীয় কার্যক্রমকে বোঝায়। যৌন অপব্যবহার শিশুর প্রতি বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিশুর মানসিক অপব্যবহারের মধ্যে রয়েছে গালি দেওয়া, তিরস্কার করা, উপহাস করা, আক্রমণাত্মক অভিব্যক্তি, অধিক সমালোচনা, অত্যধিক চাহিদা, দুর্বলতার অতিরিক্ত সমালোচনা প্রভৃতি।
শিশুকে অধিক মাত্রায় নিগৃহীত করা, আত্মসমালোচনার পরিবর্তে অধিক সমালোচনা, কম মূল্যায়ন করা, শারীরিক ত্রুটি উপস্থাপন করা, গুরুত্ব না দেওয়া প্রভৃতি অবহেলার অন্তর্ভুক্ত। শিশু অপব্যবহারের ফলে শিশুর ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব দেখা যায়, যা শিশুর মাঝে বিচ্যুত আচরণসহ নেতিবাচক আচরণ সৃষ্টি হয়। শিশুর প্রারম্ভিক জীবনে বিকাশের স্বাভাবিক ধারার ওপর এটি মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এর ফলে শিশু আক্রমণাত্মক আচরণ করে। আদর, যত্নভালোবাসা, সদাচরণ, সদাশয় থেকে শিশু দূরে সরে যায়। তার মধ্যে আক্রমণাত্মক আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। খামচি মারা, কেড়ে নেওয়া থেকে শুরু করে সব ধরনের আক্রমণাত্মক আচরণ শিশু থেকে প্রকাশিত হয়।
শিশু অপব্যবহারের আরেকটি নেতিবাচক প্রভাব হচ্ছে শিশুর জীবনে হতাশা ও বিষণœতা মিশ্রিত অনুভূতির সৃষ্টি হয়। বর্ধন পর্যায়ে শিশুর আচরণে হতাশাগ্রস্ত, বিষণœতা বেশি বিদ্যমান থাকে। অপব্যবহƒত শিশুর মাঝে প্রতিশোধ স্পৃহা ও প্রবঞ্চনা তৈরি হয়। শৈশবকালে নিজে যেসব নির্যাতনের স্বীকার হয়েছিল, পরে সুযোগ পেলে তার মাঝে ওই রকম নির্যাতন ও নিপীড়নের প্রতিশোধ স্পৃহা কাজ করে। মানব আচরণে শিশু অপব্যবহারের আরেকটি ক্ষতিকর প্রভাব হলো হীনমন্যতা ও আত্মবিশ্বাসহীনতা। কারও দ্বারা শিশু নির্যাতিত হলে বা অতিমাত্রায় ভীতিকর পরিবেশে কাজ করতে করতে শিশুর মধ্যে আত্মবিশ্বাসহীনতার জš§ হয়। জীবনকে আকাক্সক্ষা অনুযায়ী গড়ার ক্ষেত্রে শিশু হীনমন্যতায় ভোগে এবং তার ভেতর আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি দেখা দেয়।
শিশু অপব্যবহারের প্রভাবে শিশুর মাঝে অন্যায় আচরণ, অপরাধ, দুর্নীতি, ধূর্ত, অপকর্ম, জুয়া, মাতলামি, অসাধুতা, প্রতারণা, ব্যভিচার, কর্তব্যে ফাঁকি, অনৈতিকতা, অসততা, চুরি, বিশ্বাসঘাতকতা, হত্যা প্রভৃতি বিচ্যুত আচরণের আশঙ্কা দেখা দেয়। অপব্যবহƒত শিশু আস্তে আস্তে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, মাদকের চালান আনা-নেওয়ার কাজে নিয়োজিত শিশুদের অধিকাংশই মাদকসেবী হয়।
শিশুশ্রমের প্রভাবে শিশুর স্বাস্থ্যহানি, অঙ্গহানি এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, এমনকি শিশুমৃত্যুর কারণও হতে পারে। অনেক শিশু নিয়োগকারীর অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। অপব্যবহারে শিশুর মাঝে দেশদ্রোহী মনোভাব তৈরি হয়। সে ভাবে, ছোটবেলায় তার প্রতি যে দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল রাষ্ট্র তা পূরণ করেনি। ফলে তার মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের পরিবর্তে দেশদ্রোহী মনোভাব গড়ে ওঠে।
শিশুদের ধরা হয় বিশ্ব নাগরিক হিসেবে। শিশু অপব্যবহার রোধে সরকার জাতীয় শিশুনীতি প্রণয়নসহ বহুবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জাতীয় শিশুনীতিতে সব শিশুর জš§ ও বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। প্রচলিত আইনের প্রয়োগ সংশোধনের ক্ষেত্রে শিশু স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিকে সর্বাগ্রে স্থান দেওয়া হয়েছে। শিশুদের মানসিক বা দৈহিক পীড়ন পরিহার নিশ্চিতের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শিশু দিবস, শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস ও মেয়েশিশু দিবস পালনের মাধ্যমে সরকার শিশু, শিশুর অধিকার, শিশুর প্রতি পরিবার ও সমাজের দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এছাড়া শিশু মৃত্যুহার হ্রাস করা, শৈশবের জন্য সহায়ক পরিস্থিতি তৈরি এবং তার সম্প্রসারণ, অপুষ্টি হ্রাস, শিশুশ্রম হ্রাস, শিশু অপহরণ রোধ, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা দমন, শিশুদের বেঁচে থাকা, বেড়ে ওঠা এবং তাদের শক্তি ও সম্ভাবনা উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। অবহেলিত, অনাথ, দুস্থ ও আশ্রয়হীন শিশুদের উপযুক্ত পরিবেশে আশ্রয়, ভরণ-পোষণ, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। শিশু অপব্যবহার রোধে তথ্য মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো কাজ করছে। শিশু অপব্যবহার কার্যকরভাবে বন্ধ করা এবং অপরাধী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরকার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করছে। এ বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপের আলোকে শিশুদের অবস্থার উন্নয়ন সম্পর্কে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ ও প্রচারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
শিশু অপব্যবহার রোধে সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত ও বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলো নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। সম্প্রতি সরকার শিশুর আপদকালীন সময় সুরক্ষা সেবা প্রদানের লক্ষ্যে মোবাইল অ্যাপ ‘জয়’ চালু করেছে। স্মার্টফোনে অ্যাপটি চালু থাকা অবস্থায় কোনো ঘটনা ঘটলে আপনা থেকেই ঘটনাস্থলের অবস্থান, ছবি ও শব্দ পৌঁছে যাবে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জরুরি সেবা নম্বর ১০৯-এর সার্ভারে। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পুলিশ কর্মকর্তার কাছেও তা পৌঁছবে, যাতে দ্রুততম সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
শিশু অপব্যবহার রোধে বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(৪) ধারায় রাষ্ট্রের বিশেষ বিধান প্রণয়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথমদিকে।
শিশু অপব্যবহার সমাজের মানুষকে শিশুদের তাচ্ছিল্য ও অবজ্ঞা করতে শেখায়। এতে করে শিশু সমাজে সুষ্ঠুভাবে বিকশিত হতে পারে না এবং শিশুর জীবনে ক্ষতিকর দিকগুলো প্রকাশিত হয়। এর ফলে শিশুর সামাজিকীকরণ বিঘিœত হয়। সমাজের মানুষদের সঙ্গে শিশু যথার্থ ভূমিকা পালন করতে পারে না। ফলে সমাজে অসঙ্গতি দেখা দেয়।
শিশু অপব্যবহার রোধ এবং শিশুর সুস্থ স্বাভাবিক বিকাশ ও জীবনমান নিশ্চিতকরণে কার্যকরী ভূমিকা পালন করা এখন সময়ের অনিবার্য দাবি। আমাদের মনে রাখতে হবে, আগামীদিনের জাতি গঠনের মূল ভিত্তি হলো আজকের শিশু। আর তাই আমাদের শিশুদের অপব্যবহার রোধ করে তাদের সুরক্ষা দিতেই হবে।

পিআইডি নিবন্ধ

সর্বশেষ..