প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

শিশু-কিশোরদের ইন্টারনেট ও মোবাইল আসক্তি: আমাদের করণীয়

 

মো. শিবলুর রাহমান: হলের গেটে রিকশার জন্য অপেক্ষা করছিলাম, এমন সময় দুজন নিরাপত্তরক্ষীর কথোপকথনে চমকে উঠলাম। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের ক্লাস ফাইভে পড়া ছেলের মোবাইল ফোনে পর্নো ভিডিও দেখার বিষয় নিয়ে কথা বলছিল। ছেলেটি নাকি স্কুলে ক্লাস চলাকালে পেছনের বেঞ্চে বসে তার মোবাইল সেটে পর্নো ভিডিও দেখছিল। ক্লাসের শিক্ষক বিষয়টি বুঝতে পেরে ছেলেটির মোবাইল সেট কেড়ে নেন এবং স্কুল কর্তৃপক্ষ ও ছেলেটির বাবা-মাকে জানান। ইতোমধ্যে স্কুলের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায় আর জানাজানি হয় অভিভাবকদের মাঝেও। ছেলের জন্য মাথা হেঁট হয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষক বাবার। এ নিয়ে টানাপড়েন শুরু হয় ছেলেটির বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক বাবা ও মায়ের মধ্যে। প্রতিদিন এ ধরনের হাজারও ঘটনা ঘটছে আমাদের চারপাশে। নিজেকে ও সন্তানকে প্রযুক্তিতে উন্নত করতে গিয়ে আমরা ভালোবেসে, ভালো মনে করে মোবাইল ফোন তুলে দিচ্ছি আমাদের সন্তান ও কোমলমতি শিশু-কিশোরদের হাতে। আর জেগে জেগে স্বপ্ন দেখি তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর একটি আগামী প্রজন্মের। অথচ মোবাইল, ইন্টারনেট ও স্মার্ট ডিভাইসের প্রতি আসক্তি নতুন প্রজন্মকে তাদের পরিবার, আত্মীয়স্বজন, সমাজ ও বন্ধুদের থেকে নিয়ে যাচ্ছে দূরে; সরিয়ে দিচ্ছে সঠিক শিক্ষা ও সুন্দর ক্যারিয়ার থেকে। একটানা দীর্ঘ সময় মোবাইল বা কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে একদিকে তাদের চোখের ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে তাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, খিটখিটে ভাবসহ মানসিক সমস্যা। লন্ডনের বেসরকারি ক্লিনিক পোর্টল্যান্ডে প্রতিদিন আসা তরুণদের মধ্যে প্রায় ২৬ ভাগ ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফিতে আসক্তির কারণে সৃষ্ট মানসিক সমস্যার চিকিৎসা নিতে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের মতে, চার থেকে ১৭ বছর বয়সি অন্তত ৬০ লাখ শিশু-কিশোর বর্তমানে ‘এডিএইচডি’তে (অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার) আক্রান্ত। মাত্রাতিরিক্ত ইন্টারনেট ও মোবাইলের প্রতি আসক্তি এডিএইচডি নামক মানসিক রোগের সৃষ্টি করে। এই ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তি নির্দিষ্ট কোনো কাজে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারে না। গত দুই দশকে এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়েছে এবং মোবাইল ডিভাইসে অতিরিক্ত আসক্তিকেই এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। শিশুদের কল্পনাশক্তি এবং চিন্তাশক্তিও কমে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই বলা যায়, মোবাইল ও ইন্টারনেটের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি নষ্ট করছে শিশু-কিশোরদের সুন্দর ভবিষ্যৎ আর অকাল মৃত্যু হচ্ছে তাদের নিয়ে বোনা আমাদের সুন্দর সুন্দর স্বপ্নের।

মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, স্মার্ট ডিভাইস ও প্রযুক্তির ভালো দিকগুলো সবারই কমবেশি জানা। তথ্য-প্রযুক্তির অব্যাহত উৎকর্ষের ফলে আজ পুরো বিশ্ব আমাদের হাতের মুঠোয়। পড়াশোনা, গবেষণা, ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ, ধর্ম-কর্ম সবই চলছে তথ্য-প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে। এ বিষয়গুলো আজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসবের ব্যবহার আমাদের প্রতিদিনের পথচলাকে করেছে সহজ থেকে সহজতর এবং জীবনকে করেছে উন্নত। কিন্তু শিশু-কিশোরদের এই ভালো দিকগুলোতে আটকে রাখা সহজ নয়; বরং কঠিন। বিশ্বের অন্যতম বড় ব্যবসায়িক ইন্ডাস্ট্রি হলো পর্নো ইন্ডাস্ট্রি। বলা হয়, পর্নোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রি বর্তমানে একটি মাল্টি-ট্রিলিয়ন ডলারের ইন্ডাস্ট্রি! এমনকি সার্চ ইঞ্জিনসহ বড় বড় জনপ্রিয় সাইটই পর্নো ইন্ডাস্ট্রিকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করে। ইন্টারনেটে ইনডেক্স করা প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন পর্নোগ্রাফিক সাইট আছে,যেখানে সহজেই প্রবেশ করতে পারে যে কেউ, যখন তখন। সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের কারণে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে ৫-৭ বছরের ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুর ১২ শতাংশ এবং ৮-১৭ বছরের ১৬ শতাংশ শিশুর সামনে ইনডেক্স করা এই ৪৫০ মিলিয়ন পেজের সাজেশন্স চলে আসে; শিশুমন পরিচিত হয় পর্নোগ্রাফি নামক এক দানবের সঙ্গে। ধরুন, আপনার সন্তান একটি অনলাইন পত্রিকায় ঢুকেছে খবর পড়ার জন্য। তার ডানে-বাঁয়ে শত শত বিজ্ঞাপন আর অশালীন, অঙ্গভঙ্গির নানা বয়সের নারী-পুরুষের নগ্ন, অর্ধনগ্ন ছবি। কোমলমতি শিশু-কিশোর ও শিক্ষার্থীদের এসব বিজ্ঞাপন হাতছানি দেয় সহজ প্রবেশাধিকারসম্পন্ন পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হতে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, পর্নোগ্রাফি অন্যান্য মাদকের মতোই একটা আসক্তি। মাদক যেভাবে মাদকাসক্তকে প্রভাবিত করে, নীল ছবিগুলোও মানুষের মস্তিষ্কে ঠিক সেভাবেই প্রভাব ফেলে। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় পর্নোগ্রাফি আসক্তি মাদকের চেয়েও ভয়ানক হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। আবার অনেকেই পর্নোগ্রাফির আসক্তিকে তুলনা করছেন ‘ডিজিটাল কোকেন’ বা হেরোইনে আসক্তির সঙ্গে।

বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ব্যবহারের দিক দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে। শুধু কম্পিউটার নয়, মোবাইল থেকেও সহজে ব্যবহার করা যায় ইন্টারনেট। কাজে-অকাজে বা বিনাকাজে ইন্টারনেটে সময় কাটাচ্ছে মানুষ। বেসরকারি সংস্থা ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে, ঢাকায় স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের শতকরা ৭৭ ভাগ নিয়মিত পর্নোগ্রাফি দেখছে। সারা দেশেই এই চিত্র ভয়াবহ বলে দাবি সংস্থাটির। বয়ঃসন্ধিকালীন কিশোর-কিশোরী, এমনকি শিশুদেরও এ আসক্তির ঝুঁকি রয়েছে। যারা বাবা-মায়ের তত্ত্বাবধান ছাড়া অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার করার সুযোগ পায়, তাদের আসক্তির ঝুঁকি বেশি। এছাড়া বর্তমান যুগে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের চেয়ে ছেলেমেয়েরা কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সম্পর্কে অনেক বেশি জ্ঞান রাখে। এ কারণে বাবা-মা বুঝতে পারেন না, তাদের ছেলেমেয়েরা নেটে কখন কী করছে।

এবার দেখা যাক কীভাবে শিশু-কিশোরদের এই মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের নেতিবাচক দিক থেকে দূরে রাখা যায়:

এ ভয়াবহ সমস্যার সমাধান করার জন্য দরকার পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক সহযোগিতামূলক সদিচ্ছা। শিশু-কিশোরদের মোবাইল ও ইন্টারনেটের আসক্তি থেকে দূরে রাখতে হলে মা-বাবাকেই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে পারিবারিক শৃঙ্খলা, সঠিক নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় শিক্ষা, শিশুদের সুস্থ বিনোদন, উম্মুক্ত মাঠে খেলাধুলার সুযোগ করে দিতে হবে। কঠোর শাসন, মারধর কিংবা কম্পিউটার-মোবাইল ব্যবহারে বাধা না দিয়ে বরং সন্তানের জন্য একটি সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বাবা-মায়ের উচিত ইন্টারনেট ব্যবহার বিষয়ে সন্তানের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলা। বাসার কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা ফোনে প্রাইভেসি সেটিং অথবা পাসওয়ার্ড দিয়ে রাখতে হবে। কারণ আপনি বাসায় না থাকলে সে এই প্রযুক্তির অপব্যবহার করতে পারে। তাই সবসময় এসব প্রযুক্তি নিজের আয়ত্তে রাখার চেষ্টা করতে হবে। ঘরে এমন জায়গায় কম্পিউটার রাখতে হবে, যেখান দিয়ে সবাই সারাদিন যাওয়া-আসা করে। এর ফলে শিশুরা একা ইন্টারনেটে আজেবাজে জিনিস দেখতে পারবে না। ফোন তাদের কাছ থেকে যত দূরে রাখতে পারবেন, ততই ভালো। আর নির্দিষ্ট বয়সের আগে স্মার্টফোন একেবারেই নয়। আপনার সন্তানের ব্যবহার করা মোবাইল বা কম্পিউটারে ওয়েব প্রোটেকশন টাইপের সফটওয়্যার ইনস্টল করে দিতে পারেন। এরকম একটি ফ্রি সফটওয়্যার হলো ক৯ বিন ঢ়ৎড়ঃবপঃরড়হ। এ সফটওয়্যারের সাহায্যে খারাপ সাইটগুলো ব্লক করা যায় এবং ইন্টারনেটের যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সন্তানের সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় কাটানোও এক্ষেত্রে জরুরি। কেননা অনেক সময় একাকিত্বে ভোগা শিশুরা এ ধরনের কার্যকলাপে যুক্ত হয়ে পড়ে। সন্তানের সঙ্গে আপনার সহজ-স্বাভাবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এ ধরনের আসক্তি রোধে সর্বাপেক্ষা কার্যকর ভূমিকা রাখে।

আমাদের এমন একটি উপায় বের করা উচিত, যাতে এ সাইটগুলো বন্ধ করা যায়। শিক্ষার্থীদের জন্য যদি নির্দিষ্ট ইন্টারনেট প্যাকেজ দেওয়া হয়, যেখানে কিছু শব্দ ব্লক করা থাকবে। তাহলে তারা অশ্লীল সাইটে প্রবেশ করতে পারবে না। টেলিফোন অপারেটর কোম্পানিগুলো এ উদ্যোগ নিতে পারে। অনেক দেশেই এ ব্যবস্থা আছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন অ্যান্ড রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) একটা ভূমিকা রয়েছে। তারা চাইলে এ কাজগুলো করতে পারে। উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারে তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। আমেরিকান সোসাইটি, কানাডিয়ান সোসাইটির কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে পর্নো সাইটগুলোতে ঢোকা যায় না। সেখানে পর্নোসাইটের সার্ভারগুলো ব্লক করে দেওয়া থাকে। আমাদের সরকারও চাইলে পারে এসব সাইট ব্লক করে দিতে এবং সেটা নির্ভর করবে সরকারের রেগুলেটরি অথরিটি কতটুকু রেগুলেট করবে, তার ওপর। মোবাইল ও ইন্টারনেটের এই নেতিবাচক প্রভাব থেকে শিশুদের নিরাপদে রাখার দায়িত্ব কিন্তু পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র তথা আমাদের সবার। তাই ব্যবস্থা নিতে হবে এখনই সমাজের প্রতিটি কোণ থেকেই। বাঁচাতে হবে তরুণ সমাজকে, জাতির ভবিষ্যৎকে।

 

শিক্ষক, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

shiblu.juÑgmail.com