মত-বিশ্লেষণ

শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন আইনে কর্মজীবী মায়েদের স্বস্তি

মো. আব্দুল আলীম: শারমিন আক্তার মতিঝিলের একটি বেসরকারি ব্যংকে চাকরি করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করার পরই চাকরিটা পেয়ে যান। চাকরির দু’বছরের মাথায় বিয়ে। স্বামী সরকারি কর্মকর্তা। সবকিছু সুষ্ঠুভাবে শুরু হলেও সমস্যা সৃষ্টি হয় সন্তান জন্ম নেওয়ার পর। ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি ভোগ করে কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার পালা। সন্তানকে কোথায়, কার কাছে রেখে যাবেন? শারমিনের অসুস্থ মা গ্রামে থাকেন। শাশুড়ি মারা গেছেন। এ অবস্থায় ঢাকায় আত্মীয়-স্বজনের কাছে কত দিন সন্তানকে রেখে যাওয়া যায়? কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না তিনি। এ অবস্থায় তার এক সহকর্মীর পরামর্শে বাংলাদেশ ব্যাংকের শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে যোগাযোগ করেন। সেখানে শিশুকে রেখেই নিশ্চিন্তে অফিস করেন শারমিন।

বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী মাতৃত্বকালীন ছুটির মেয়াদ ছয় মাস। যেসব প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে ৪০ নারীকর্মী রয়েছেন, সেখানে একটি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র থাকার বিধানও আগে থেকেই রয়েছে। কিছু দিন আগে হাইকোর্টও এ-সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা দিয়েছেন। আমাদের দেশে অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে নারীকর্মীর সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ জন কিংবা বা তার কম বা বেশি, সেখানকার কর্মজীবী মায়ের সমস্যা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। তাছাড়া এখনও দেশে প্রয়োজনের তুলনায় কম প্রতিষ্ঠানেই শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে।

এ বাস্তবতার নিরিখে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা শহরে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন করার বিধান রেখে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কর্মজীবী মায়েদের শিশুসন্তানকে নিয়ে কর্মক্ষেত্রে নির্বিঘ্নে দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে দেশের সব জেলা-উপজেলায় এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আধাসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক ভবনে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র  স্থাপন করা হবে। ছয় থেকে আট বছরের শিশুদের এসব কেন্দ্রে রাখা যাবে। বিনা মূল্যে পরিচালিত সরকারি, ভর্তুকি দিয়ে সরকারি, বাণিজ্যিক ও অলাভজনক ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে এই চার ধরনের শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে শিশু সেবাকারীর অনুপাত হবে ৪:১। অর্থাৎ প্রতি চার শিশুর জন্য এক সেবক সেবিকা থাকবে। কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন ছাড়া কোনো শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র পরিচালনা করা যাবে না। কোনো দণ্ডিত অপরাধী শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপনের নিবন্ধন ও নিবন্ধন সনদ পাবে না। এর ব্যত্যয় ঘটলে রয়েছে অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ডের বিধান। এ-সংক্রান্ত একটি আইনের খসড়া প্রস্তুত করেছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, যা ‘শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র আইন, ২০১৯’ নামে অভিহিত হবে।

আইন প্রণয়নের বিষয়ে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, দেশে কর্মজীবী ও পেশাজীবী মায়েদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। একই সঙ্গে সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মায়েদের শিশুসন্তানের দিবাকালীন নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যার চাহিদাও বাড়ছে সমান তালে। যৌথ পরিবার প্রথা বিলুপ্তপ্রায় এবং একক পরিবার বাড়ছে দ্রুত হারে। সে ক্ষেত্রে শিশুদের পরিচর্যায় সেবাকারীর অভাবও দেখা দিয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপনে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা ও প্রদেয় সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করতে একটি আইনি কাঠামো থাকা সময়ের দাবি। এরই মধ্যে আইনের একটি খসড়া প্রস্তুত করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মতামত নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

খসড়া আইনের চতুর্থ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, দিবাযত্ন কেন্দ্রে ভর্তি হওয়া শিশুর অবস্থানকালীন সার্বিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা বিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে। শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার বিষয় বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে নিশ্চিত করতে হবে। আইনের তৃতীয় অধ্যায়ের শেষাংশে বলা হয়েছে, সরকারি নিবন্ধনপ্রাপ্ত শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের পরিচালককে নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ যেকোনো নির্দেশ প্রদান করতে পারবে। নিবন্ধনের কোনো শর্ত ভঙ্গের কারণে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দিবাযতœ কেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিতে পারবে। আইনের তৃতীয় অধ্যায়ের শেষাংশে যে শর্তের কথা বলা হয়েছে, তা প্রতিপালন করতে না পারলে নিবন্ধন বাতিল করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দিবাযত্ন কেন্দ্রের নিরাপত্তার জন্য প্রবেশপথে ও অভ্যন্তরে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে। ওই ক্যামেরা সার্বক্ষণিকভাবে চালু রাখতে হবে।

নিবন্ধন ছাড়া শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র পরিচালনা করলে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকার অর্থদণ্ড এবং অনধিক দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। খসড়া আইন অনুসারে নিবন্ধন সনদ অফিসের দর্শনীয় স্থানে প্রদর্শন করে রাখতে হবে। না রাখলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকার অর্থদণ্ড আরোপ করা হবে। যত দিন প্রদর্শন না করা হবে ততদিন প্রতিদিনের জন্য দৈনিক এক হাজার টাকা করে জরিমানা করা হবে। কর্তৃপক্ষ কিংবা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা বা পরিদর্শককে পরিদর্শনকালে দিবাযত্ন কেন্দ্রের যাবতীয় রেকর্ড দেখাতে অস্বীকার করলে, পরিদর্শন কাজে অসহযোগিতা করলে, তা সরকারি কাজে বাধা বলে বিবেচিত হবে। সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার জন্য দেশের প্রচলিত দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তি আরোপ করা হবে। নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের যেকোনো আইন ও বিধিসিদ্ধ নির্দেশনা অমান্য করলে অমান্যকারীকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড আরোপ করা হবে। এই আইনের বিধানাবলি ভঙ্গের অপরাধগুলো ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর বিধান অনুযায়ী আদালতে সম্পন্ন হবে। শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের শিশুসংক্রান্ত বিষয়ে সংঘটিত অপরাধ বিষয়ে দেশে প্রচলিত প্রযোজ্য অন্য যেকোনো আইনের অধীনে যথাযথ আদালতে বিচার করা হবে।

আইনের বিধানাবলি ভঙ্গের কারণে কোনো শিশু দিবাযতœ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে আপিল করতে হবে। আপিলের শুনানি করবেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব। শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে শিশু ভর্তির জন্য নির্ধারিত ফি ও মাসিক সেবামূল্য প্রদান করতে হবে। শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের নিবন্ধন পাওয়ার জন্য প্রার্থীকে বাংলাদেশের নাগরিক, শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ এবং উন্নত চরিত্রের অধিকারী হতে হবে। আর্থিকভাবে সচ্ছল ও আয়কর প্রদানকারী হতে হবে। বিধিবিধানে উল্লেখিত পরিমাণ বৈধ স্পেস বা ভবন থাকতে হবে। ট্রেড লাইসেন্স থাকতে হবে। শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র পরিচালনার বিষয়ে অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আদালতে দণ্ডিতরা এই কেন্দ্র পরিচালনায় নিবন্ধন পাবে না। সব দিবাযত্ন কেন্দ্র মায়ের দুধ পানের জন্য উপযুক্ত স্থান, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে। শিশুর চিকিৎসা, পরিচর্যা, পুষ্টি, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, সুরক্ষা, বিনোদন, শিক্ষা ও পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা নির্ধারিত মান অনুসারে সম্পন্ন করতে হবে। কেন্দ্রের ভৌত অবকাঠামো, শিশুর আনুপাতিক পরিসর, সেবা প্রদানকারীর বয়স বিধির আলোকে নির্ধারিত হবে। কেন্দ্রের পরিবেশ শিশুবান্ধব হতে হবে। পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের সুব্যবস্থা থাকতে হবে।

দেশে সরকারিভাবে বর্তমানে ৪৩টি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে। পাশাপাশি সরকার ‘২০টি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০২১ মেয়াদে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। ঢাকা মহানগরীতে ১০টি, যথা ধানমন্ডি, মতিঝিল, রামপুরা (বিটিভি, ঢাকা), রায়েরবাজার, কমলাপুর, মুগদা, মহাখালী, আশুলিয়া, সায়েদাবাদ ও পল্লবী এবং ঢাকার বাইরে ১০টি, যথা রংপুর, গোপালগঞ্জ, গাজীপুর, নওগাঁ, গাইবান্ধা, ভোলা, কক্সবাজার, টাঙ্গাইল, নোয়াখালী ও চাঁদপুরে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের কাজ এগিয়ে চলেছে। এর মধ্যে কিছু শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে এবং শিশুদের ভর্তি করা হচ্ছে।

সরকারের এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির কর্মজীবী মায়েদের শিশুদের ছয় মাস থেকে ছয় বছর পর্যন্ত নিরাপদ দিবাকালীন সেবা প্রদান, দিবাযত্ন কেন্দ্রের শিশুদের যথাযথ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য এতে অবস্থানকারী শিশুদের সুষম খাবার প্রদান, ইপিআই প্রতিষেধকসহ প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা প্রদান, প্রাক-প্রাথমিক স্কুল শিক্ষা প্রদান এবং ইনডোর খেলাধুলা ও চিত্তবিনোদনের সুযোগ প্রদান করা।

বাংলাদেশে গত দুই দশকে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়েছে। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত গার্মেন্ট শিল্পে কাজ করছে লাখ লাখ নারী। এ পরিস্থিতিতে কর্মক্ষেত্রে শিশুর জন্য মাতৃদুগ্ধ পানের ব্যবস্থা রাখা এবং সরকারের শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন-সংক্রান্ত আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। পৃথিবীর অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও কর্মজীবী মায়েদের শিশু দিবাযতœ কেন্দ্র হতে পারে শেষ ভরসা। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপিত হলে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা আরও বাড়বে, তারা স্বস্তিতে কাজ করতে পারবে। আর নারীদের সুষ্ঠু ক্ষমতায়নে দেশ হবে আরও উন্নত ও স্বনির্ভর।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..