কৃষি কৃষ্টি

শীতকালীন সবজি শিম, সরষেশাক, মুলা

শীতকালীন সবজি শিম, সরষেশাক, মুলা। আজকের আয়োজন এগুলোর নানা দিক নিয়ে

শিম: প্রোটিনের চাহিদা মেটায় শীতকালে সবার প্রিয় সবজি শিম। রোগ প্রতিরোধের জন্য এটি বেশ উপকারী সবজি। অনেকে মাছ-মাংস পছন্দ করে না, তারা শিম বা শিমের বীজ খেয়ে প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে পারে।

পুষ্টিগুণ: শিমে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, ফাইবার, ভিটামিন, মিনারেল, ভিটামিন

‘সি’, বি৬, জিংক, খনিজ দ্রব্য, লৌহপ্রভৃতি রয়েছে।

উপকারিতা

#     শিমে বিদ্যমান খনিজ পদার্থ চুল পড়া রোধে সহায়তা করে ও চুলের স্বাস্থ্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে

#     এ সবজি কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে

#     শর্করা ও চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিশেষ সহায়ক

#     শিমের বীজে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান রয়েছে, যা হƒদরোগ প্রতিরোধে সহায়ক

#     এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘বি৬’ বা ফোলেট রয়েছে। উপাদানটি স্নায়ুতন্ত্রের জন্য বিশেষ উপকারী

#     শিম পরিপাকের জন্য ভালো। এতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার রয়েছে, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সহায়ক

#     শিম রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়

#     এতে সিলিকনজাতীয় উপাদান থাকে, যা হাড় মজবুত করে। প্রচুর ফলেট থাকায় গর্ভবতী নারীদের জন্য বিশেষ উপকারী

#     লিউকোরিয়াসহ মেয়েদের নানা সমস্যা দূর করে। এছাড়া শিশুদের অপুষ্টি দূর করতে বেশ সহায়ক শিম ও শিমের বীজ।

দোআঁশ মাটিতে ভালো জন্মে

ঠাণ্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়া শিম চাষের জন্য উপযুক্ত। দোআঁশ, এঁটেল দোআঁশ ও বেলে মাটিতে শিম চাষ করা যায়। তবে দোআঁশ মাটিতে এর উৎপাদন তুলনামূলকভাবে ভালো হয়। চাষের জমির পাশাপাশি বসতবাড়িতেও শিম চাষ করা যায়।

আমাদের দেশে এর নানা ধরনের জাত রয়েছে। এদের মধ্যে বারি শিম-১, ইপসা শিম-১, ইপসা শিম-২ প্রভৃতি চাষ করা হয়ে থাকে। বীজ বপনের সময় আষাঢ় থেকে ভাদ্র, অর্থাৎ জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত।

জমি তৈরির জন্য কয়েকটি চাষ দিয়ে মাদা তৈরি করতে হবে। মাদায় বপনের আগে বীজ ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখা প্রয়োজন। এরপর প্রতি মাদায় চার থেকে পাঁচটি বীজ বপন করে পানি ছিটিয়ে দিতে হবে। চারা গজিয়ে গেলে মাদা থেকে দু-তিনটি সবল চারা রেখে বাকিগুলো তুলতে হবে। চারা গজানোর দুই সপ্তাহ পরপর ইউরিয়া ও এমপি সার দিতে হবে। গাছ ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার লম্বা হলে সহজে বেড়ে ওঠার জন্য গাছের গোড়ার সঙ্গে বাঁশের খুঁটি বেঁধে দিতে হবে। কিছুটা ওপরে বাঁশের মাচা তৈরি করতে হবে।

শিমের সবচেয়ে ক্ষতিকর পোকা হলো ছিদ্রকারী ও জাব পোকা। লাল ক্ষুদ্র মাকড়ও অনেক সময় আক্রমণ করে। এছাড়া মোজেইক ও অ্যানথ্রাকনোজ রোগে আক্রান্ত হয় শিম গাছ। কৃষি দফতরের পরামর্শ অনুযায়ী কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ওষুধ ব্যবহার করতে হবে।

বীজ বপনের চার থেকে পাঁচ মাস পরে ফসল সংগ্রহ করা যায়। বপনের দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে গাছে ফুল আসে। ফুল ফোটার এক মাস পর ফসল সংগ্রহ করা যাবে। এটি চার মাসের বেশি সময় ধরে ফল দেয়।

ঠাণ্ডাজনিত রোগ দূর করে

শীতকালে শরীর সুস্থ রাখতে নিয়মিত শাক ও সবজি খেতে হয়। এ সময় কয়েক ধরনের শাক চোখে পড়ে, যা অন্য সময় পাওয়া যায় না। এমনই একটি শাক সরষে। ঠাণ্ডাজনিত রোগ প্রতিরোধে এ শাক বিশেষ কার্যকর। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি উপাদান।

পুষ্টিগুণ: এ শাকে রয়েছে আয়রন, পটাশিয়াম, ম্যাংগানিজ, ভিটামিন ‘সি’, ‘এ’, ‘কে’সহ আমিষ ও স্নেহজাতীয় পদার্থ।

উপকারিতা

শীতে সরষেশাক শরীরের ভীষণ উপকার করে।

#     সরষেশাকে ক্যালরির পরিমাণ খুবই কম। পেটে চর্বি রয়েছে এমন মানুষ নিয়মিত খেতে পারেন শাকটি

#     শীতকালে নিয়মিত এ শাক খেলে রক্তে উপকারী এইচডিএল কোলেস্টেরল বাড়ে

#     সরষেশাক শরীরে ভিটামিন ‘ডি’ তৈরিতেও সহায়ক

#     অ্যাজমার সমস্যা রয়েছে? তাহলে এ শাক খেতে পারেন। সর্দি দূর করতেও এটি কার্যকর

#     প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’ রয়েছে। এর অভাবে কারসিনোজেন রোগ হয়। এ শাক নিয়মিত খেলে রোগটি থেকে রেহাই পাওয়া যায়

#     ভিটামিন ‘সি’ ও ম্যাংগানিজ রয়েছে এ শাকে। এ উপাদানগুলো ফুসফুস স্বাভাবিক রাখে। এছাড়া ফুসফুস সংকুচিত হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে

#     রক্তপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে বেশ সহায়ক

#     সরষেশাকের লুটিন নামক পুষ্টি উপাদান চোখের স্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপকারী

#     এটি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতেও সাহায্য করে। এছাড়া এর বিটা-ক্যারোটিন হƒদরোগের ঝুঁকি কমাতে বেশ সহায়ক

#     লিভার পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। শরীরের বিষাক্ত পদার্থকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়

#     এর ভিটামিন ‘কে’ হাড় মজবুত ও রক্ত জমাট বাঁধতে সহায়তা করে।

চাষে উপযুক্ত শীতল আবহাওয়া

সরষে শাক চাষের জন্য শীতকাল উপযুক্ত। এ সময় আবহাওয়া শীতল ও শুষ্ক থাকে, যা সরষে চাষের জন্য প্রয়োজন। এটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ও সুস্বাদু হওয়ায় অনেকেই শুধু শাক হিসেবে খাওয়ার জন্য চাষ করে থাকেন।

সরষে চাষের জন্য দোআঁশ মাটি উত্তম। এ মাটিতে সরষের চাষ তুলনামূলক ভালো হয়। এ শাকের দুটি জাত বাংলাদেশে বেশি চাষ করা হয়Ñরাই ও টরি। তবে বারি সরষে-৬, বারি সরষে-৮, দৌলত প্রভৃতি শাক হিসেবে চাষ করা যায়।

বপনের আগে জমি ভালো করে চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝরঝরে করে নিতে হবে। বপণের উত্তম সময় সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর। সরষের বীজ জমিতে ছিটিয়ে বপন করা হয়। বীজ বপনের পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে চারা গজায়। চারা একটু বড় হলে গাছ পাতলা করে দিতে হয়। ভালো ফলন পেতে সঠিক নিয়মে সার দিতে হবে। অবশ্যই জমি শুকিয়ে গেলে সেচ দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, সরষে গাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না।

সরষে শাকের সবচেয়ে ক্ষতি করে জাব পোকা। ফুলের কুঁড়িতে এ পোকা আক্রমণ করে। এছাড়া এ শাকে ঝলসানো রোগ হতে দেখা যায়। প্রথম দিকে গাছের বয়স্ক পাতা আক্রমণ করে। ধীরে ধীরে কচি পাতা ও কাণ্ডে কালচে দাগের সৃষ্টি করে। ফলে ফলন কমে যায়। এসব পোকা ও রোগবালাই থেকে রক্ষা পেতে কীটনাশক এবং ছত্রাকনাশক ওষুধ স্প্রে করতে হবে।

সরষে বীজ বপনের এক মাসের মধ্যে শাক তুলে খাওয়া যায়। এরপর ধাপে ধাপে তুলে দীর্ঘদিন খাওয়া যায়।

পুষ্টিগুণে ভরপুর মুলা

শীতকালীন সবজি মুলা। পুষ্টিগুণ বিচারে শীর্ষস্থানীয় সবজি এটি। অনেকে গন্ধের কারণে মুলা খেতে চান না বা পছন্দ করেন না। তবে জেনে রাখুন, মুলা ও মুলার পাতা দুটিই পুষ্টিতে ভরপুর। তাই মুলার নানা পদ বানিয়ে খেতে পারেন।

পুষ্টি উপাদান: মুলা ও এর পাতায় রয়েছে ভিটামিন ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’সহ প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ফাইবার, পানি প্রভৃতি।

উপকারিতা

#     মুলা শাকে বিদ্যমান ফাইবার রক্তের শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে

#     সবজিটি হƒৎপিণ্ডের সুরক্ষায় বেশ উপকারী

#     এর ‘সি’ শরীরকে নানা রোগ থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করে

#     মুলা রুচিবর্ধক একটি সবজি। এটি রুচি বাড়িয়ে দেয়, ফলে ক্ষুধা বাড়ে

#     আঁশ-সমৃদ্ধ সবজিটি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং তা নিরাময়ে সাহায্য করে

#     কাঁচা মুলা যকৃতের রোগ, প্লীহা ও জন্ডিস সারাতে বেশ কার্যকর

#     মুলা শীতলকারক সবজি। দেহ ঠাণ্ডা রাখতে বেশ সহায়ক

#     যাদের পাইলসের সমস্যা রয়েছে বা পাইলসের কারণে রক্ত পড়ে, তারা নিয়মিত মুলা খেতে পারেন

#     মুলা শরীরের রক্ত পরিষ্কারক হিসেবে কাজ করে। সে সঙ্গে লিভার ও পাকস্থলীর সব বর্জ্য পরিষ্কার করে

#     ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ রোগীদের জন্য মুলা ভীষণ উপকারী

#     মুলার রস প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া ও মূত্রতন্ত্রের প্রদাহ দূর করে।

শীতে বেশি ফলে

বাংলাদেশে সাধারণত সাদা ও লাল রঙের মুলার চাষাবাদ হয়। এটি শীত মৌসুমে চাষ করা হয়। গ্রীষ্মে চাষ করলে মুলা ঝাঁঝালো হয়, ফলন কমে যায়। তাই এ মৌসুমে চাষ করতে অনীহা দেখান কৃষক। পানি সেচের ব্যবস্থা রয়েছেÑএমন বেলে-দোআঁশ মাটি মুলা চাষের জন্য উত্তম। তবে পলি-দোআঁশ ও

এঁটেল-দোআঁশ মাটিতে পরিমিত সার এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করলে চাষ করা যেতে পারে। মুলা চাষের জমি গভীরভাবে ধুলো ধুলো করে চাষ করতে হয়।

বাংলাদেশে আবহাওয়া উপযোগী মুলার চারটি জাত উল্লেখযোগ্য। এগুলো হচ্ছে বারি মুলা-১ থেকে বারি মুলা-৪ পর্যন্ত। মুলার বীজ বপনের প্রধান সময় সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর। বীজ সরাসরি জমিতে বপন করা হয়। তাই জমি চাষাবাদের জন্য আগেই তৈরি করে নিতে হবে। মুলার বীজ না ছিটিয়ে সারিতে বপন করা উত্তম। বীজ ৩০ সেন্টিমিটার দূরত্বে রেখে দুই থেকে তিনটি বপন করতে হবে। বপনের সঙ্গে সঙ্গে মাটি দিয়ে ভালোভাবে বীজ ঢেকে দিতে হবে। শেষে একটি সেচ দেওয়া উত্তম।

বীজ থেকে চারা গজানোর পর প্রত্যেক সারিতে একটি ভালো চারা রেখে বাকিগুলো তুলে ফেলতে হবে। আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। সে সঙ্গে জৈব, টিএসপি, এমওপি সার ছিটিয়ে দিতে হবে।

এ সবজির পাতায় ফ্লি বিটল পোকা আক্রমণ করে। এ পোকা পাতা ছিদ্র করে খেয়ে ক্ষতি করে। এছাড়া বিছা পোকা ও ঘোড়া পোকাও আক্রমণ করে। মুলার মধ্যে গ্রে মোল্ড রোগ দেখা দেয়। পোকা ও রোগ দমনের জন্য কীটনাশক এবং ছত্রাকনাশক ওষুধ ব্যবহার করতে হবে।

বপনের দেড় থেকে দুই মাস পর ফসল সংগ্রহ করা যাবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..