মত-বিশ্লেষণ

শীতবস্ত্র বিতরণে প্রদর্শনেচ্ছা নয়

শীতকাল আসতে না আসতেই শীতের আগাম কেনাকাটা করে যেমন আলমারি ভর্তি গরম কাপড়, হাত মোজা, পা মোজা, টুপি ইত্যাদি মজুত করে রাখা হয়। শীতের মৌসুমে এসব গরম কাপড় পরেও যেন শীত নিবারণ কষ্টকর হয়ে ওঠে। আবার অনেক পরিবার তো পিঠাপুলির আমেজ মেতে ওঠে। খেজুর গুড়ের হরেক রকমের পিঠার তালিকায় ব্যস্ত সমাজের বিত্তবান শ্রেণির মানুষজন। শীতের আমেজে এতই মাতোয়ারা ধনিক শ্রেণি গোষ্ঠীর লোকেরা, তারা ভুলেই যায় রাস্তায়, খোলা আকাশের নিচে থাকা সর্বস্বান্ত মানুষগুলোকে। আমাদের দেশের বহু লোক এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা প্রভৃতি মৌলিক অধিকার হলেও আমরা এ অধিকারগুলো সবার জন্য নিশ্চিত করতে পারিনি। বাংলাদেশে এখনও বহু মানুষ আছে যাদের শীতবস্ত্র কেনার মতো সামর্থ্য নেই। এখনও অনেক করুণ চিত্র  দেখা যায় রাস্তার ফুটপাতে, খোলা আকাশের নিচে, বস্তিতে। তাদের সঙ্গে রয়েছে ছিন্নমূল পথশিশু। গায়ে পাতলা চাদর, ছেঁড়া কাঁথা, পলিথিন মুড়িয়ে কাঁপতে কাঁপতে শীতকাল পাড়ি দেয় এসব অসহায় মানুষ। উষ্কখুষ্ক চুল, শুষ্ক চামড়া আর ঠোঁট ফাটা এগুলো বৈশিষ্ট্য যেন প্রমাণ করে দেয় শীতকাল না জানি কত কষ্টের। কোথাও কোথাও খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত পোহাতে দেখা যায় অসহায় মানুষকে। বাংলাদেশে নীলফামারী, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, রংপুর, লালমনিরহাট অর্থাৎ উত্তরাঞ্চলে প্রচুর শীত পড়ে। আর এই শীতে প্রতি বছরই মানুষের মৃত্যু হয়। কিছু সংখ্যক মৃত্যুর খবর আমরা পাই আর এর বাইরেও অনেক মানুষের মৃত্যু হয় শীতে, যা আমাদের দৃষ্টির অগোচরে থাকে। খেটে খাওয়া, দিনমজুর,  রিকশাওয়ালা তাদের তো কষ্টের অন্ত নেই। শীতের সকালে কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যে তাদের কাজে যেতে হয় আবার অনেকে ঠিকমতো কাজও পায় না। একদিকে গরম কাপড়ের অভাব, অন্যদিকে অর্থের অভাব এই দৈন্যদশা নিম্ন শ্রেণির মানুষের জন্য কাল হয়ে আসে। বয়োবৃদ্ধদের জন্য শীতকাল আরেকটি অভিশাপের নাম। তাদের প্রতি নজর দেওয়ার মতো কেউ থাকে না। শীতকালের বিভীষিকাময় এই চিত্র বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলসহ, ঢাকা ও বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় কমবেশি দেখা যায়। তবে ভয়ঙ্কর বিষয় হচ্ছে, তাদের জন্য নিরাপদ বাসস্থান না থাকায় শীতের মধ্যে তারা উদ্বাস্তু হয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করে। আমাদের চোখের সামনে বৈরী আবহাওয়া মানুষের প্রাণ কেড়ে নেবে এ বিষয়টি ভাবা সত্যিই আমাদের জন্য কষ্টকর। নিজে যদি নিজের জায়গা থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী সবাই সাহায্য করতে পারি তাহলে অনেকাংশেই এই দরিদ্র মানুষদের শীত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। শীতের মৌসুমে বেশ কয়েকটি সংগঠন ও ব্যক্তি উদ্যোগে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়। তবে কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের পরিচিতি বাড়ানোর জন্য আবার সুনাম অর্জনের জন্যও শীতবস্ত্র বিতরণ করে থাকে। তবে আমাদের সবার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত প্রকৃত অসহায় মানুষকে সাহায্য করা। মানবতার দৃষ্টিকোণ থেকে অসহায়, উদ্বাস্তু মানুষদের পাশে দাঁড়ানো। সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের উদ্যোগে ও সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা পারে শীতের যুদ্ধ থেকে এসব মানুষদের রক্ষা করতে।

খন্দকার নাঈমা আক্তার নুন

 শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..