প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

শীতের প্রকোপ কম গরম কাপড়ের ব্যবসায় মন্দা: সংকটে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা

নাজমুল হুসাইন: পৌষ মাস শেষপ্রায়। প্রতিবছর এ সময়টাতে শীতে গুটিসুটি হয়ে পড়তো দেশের মানুষ। উত্তরের বাতাসে প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে গায়ে জড়িয়ে নিতো গরম কাপড়। তবে এবার পরিস্থিতি উল্টো। এবার ঠাণ্ডাকে টেক্কা দিতে এখনও দরকার হয়নি মানুষের বাড়তি প্রস্তুতির। এতে দেশের গরম কাপড়ের জমজমাট ব্যবসা মাঝপথেই ঝিমিয়ে পড়েছে।

আবহাওয়া অধিদফতর বলছে, অন্য বছরগুলোতে এ সময়ে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়। তাপমাত্রা নামে ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। কিন্তু গতকালও দেশের সর্বনি¤œ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত ৫০ বছরের হিসাবে গত মাসে (ডিসেম্বর) দেশে গড় তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম ছিল। এবারের ডিসেম্বরে সেই তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে।

দেশে এ অবস্থায় উত্তরাঞ্চলে ঘন কুয়াশা ও শীতের আমেজ থাকলেও মধ্যাঞ্চলে বা রাজধানী ঢাকায় গরম কাপড়ের পুরোপুরি ব্যবহার প্রয়োজন হয় না। হালকা পাতলা শীতের পোশাকেই অধিকাংশের কেটে যায় সারা দিন। আর লেপ বা কম্বল এখনও বাক্সবন্দিই রয়েছে। ফলে আবহাওয়ার কারণেই জমেনি গরম কাপড়ের বাজার।

গরম কাপড়ের ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাদেশে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীতের মৌসুম ধরা হয়। ফলে এ সময়ের এক মাস আগে থেকেই গরম কাপড়ের বাজার জমে ওঠে। তবে সেই হিসেবে এবার মৌসুমের অর্ধেকের বেশি চলে গেলেও গরম কাপড়ের বাজারে হাওয়া লাগেনি। ফলে জমে ওঠেনি এ বাজার। ফলে কাপড় ও কম্বলের মৌসুমি ব্যবসার পুঁজি ওঠাতে হিমশিম খাচ্ছেন আমদানিকারকরা। আর পাইকারিসহ খুচরা মার্কেটের ব্যবসায়ী ও হকাররা ঠাঁয় বসে রয়েছেন ফুটপাতে-হাটে-মাঠে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কয়েকটি মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, ক্রেতা কম বলে দামও কম শীতের পোশাকের। রাজধানীর গুলিস্তান, বঙ্গবাজার, নিউমার্কেট, বসুন্ধরা সিটি শপিং মলসহ কোনোখানেই নেই ক্রেতার চাপ। সব মার্কেট, বিপণিবিতানের অনেক দোকান বিভিন্ন শীতবস্ত্রের পসরা সাজিয়েছে। সোয়েটার, জ্যাকেট, হুডি, হাইনেকসহ অনেক পোশাকের সমাহার দোকানে-দোকানে। কিন্তু ভিড় নেই কেনাবেচায়।

এদিকে বঙ্গবাজার ও পলওয়েল দেশের গরম পোশাকের অন্যতম পাইকারি মার্কেট। পলওয়েলে গিয়ে দেখা যায়, বেশিরভাগ দোকানেই শীতের কাপড়ের স্তূপ। এবার শীত না থাকার কারণে পাইকারি অর্ডার কম হয়েছে। ফলে নতুন কোনো ডিজাইনের শীতবস্ত্র আনছেন না দোকানিরা।

গরম কাপড়ের বড় বেচাকেনা হয় ফুটপাতেও। সেখানেও একই অবস্থা। ঘুরেফিরে এসব ফুটপাতে কিছু ক্রেতা আসছে। তবে তা দোকানিদের খুশি করার মতো নয়। ক্রেতাদের নজর কাড়তে হাঁকডাক দিচ্ছেন বিক্রয়কর্মীরা। কিছু বিক্রিও হচ্ছে। কিন্তু গত বছরের তুলনায় অনেক কম বলে জানান দোকানিরা।

মতিঝিল ফুটপাতে সেন্টু মিয়া নামের একজন দোকানি বলেন, শীত উপলক্ষে তিনি শীতের পোশাকের কিছু স্টক করেছিলেন। শীতের তীব্রতা না বাড়লে অনেক শীতবস্ত্র অবিক্রীত থেকে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

এদিকে গরম কাপড়ের বড় শেয়ার এখন কম্বলের বাজারে। বায়তুল মোকারমসহ রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটেই কম্বলের পসরা চোখে পড়ে। ইদানীং দেশে চীন থেকে আমদানি করা প্রচুর কম্বল বিক্রি হচ্ছে। এসব আমদানি করছে বায়তুল মোকাররম মার্কেটসহ নবাবপুর ও চট্টগ্রামের প্রায় তিন শতাধিক আমদানিকারক। তারাই সারা দেশের বিভিন্ন মার্কেটে এসব পাইকারি কম্বল সরবরাহ করে থাকেন।

নবাবপুরের এসবি টেড্রার্সের স্বত্বাধিকারী সিরাজুল হক বলেন, ‘এ বছর চীন ও কোরিয়া থেকে প্রচুর কম্বল আমদানি করে ধরা খেয়েছেন ব্যবসায়ীরা। নবাবপুরেই প্রায় দেড়শ ব্যসায়ী রয়েছেন, যারা শুধু কম্বল আমদানি করে। সবাই এ বছর শীতের প্রকোপ না থাকায় লোকসানে পড়েছি। এখন চালান ওঠাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এক হাজার ৫০০ টাকায় আমদানি করা কম্বল পাইকারি বিক্রি করেছি এক হাজার ৩৫০ টাকায়। উপায় নেই। এখন বিক্রি না হলে সারা বছর মূলধন পড়ে থাকবে। এতে ব্যাংকে সুদের হিসেবে আরও লোকসান হবে। এমন খারাপ বাজার এক যুগে দেখিনি।’

এ আমদানিকারকের কথার প্রমাণ মিললো ‘এনেক্স টাওয়ার’-এ কম্বল কিনতে আসা আকিব হাসানের কথায়। তিনি বলেন, ‘তুলনামূলকভাবে এবার শীতের কম্বলগুলোর দাম বেশ কম। আমি যে কম্বল কিনেছি, গতবার এসবের দাম ছিল এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার। এবার কিনলাম এক হাজার ৬০০ টাকায়।’

এদিকে দেশে পুরোনো শীতবস্ত্রের বড় বাজার চট্টগ্রাম। সেখানে খাতুনগঞ্জ এলাকায় রয়েছে পুরোনো কাপড়ের প্রায়  বড় ৩০ জন আমদানিকারক। তারা একদিকে নিজেরা সরাসরি বিদেশ থেকে কাপড় আমদানি করেন; অন্যদিকে সরকারি কোটায় কাপড় কেনেন। প্রতিবছরই সরকারের সহায়তায় ৬০ কোটি টাকার কাপড় আসে দেশে, যার অধিকাংশ আসে এ বাজারে। টেন্ডারে মোট পুরোনো কাপড়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় তিন লাখ ৬০ হাজার বেলের বেশি ( প্রতি বেলে ৮০-১০০ কেজি কাপড় থাকে)।

খাতুনগঞ্জ বাজারের হালচাল জানতে চাইলে চট্টগ্রাম পুরোনো কাপড় ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি ও ভিক্টরি ট্রেডিং এজেন্সির স্বত্বাধিকারী আবুল কালাম বলেন, ‘সরকারি কোটায় এখানে যে কাপড় এসেছে তা যৎসামান্য। তারপরও কোটায় এ বছর ৩০ কোটি টাকার টেন্ডারের কাপড় এসেছে। সব খরচসহ এর মূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকার ওপর। কিন্তু সিজন শেষ হলেও ৫০ শতাংশ কাপড় বিক্রি হয়নি। সব ব্যবসায়ীকেই লোকসান করতে হবে। ইতোমধ্যে নামমাত্র দামে পাইকারিতে এসব কাপড় বিক্রি করতে হচ্ছে।’