আজকের পত্রিকা

শীত মৌসুমে তাপমাত্রা বৃদ্ধি লোকসানের আশঙ্কায় যশোরের আলুচাষিরা

মীর কামরুজ্জামান মনি, যশোর: ভালো ফলনের আশা নিয়ে মাত্র এক সপ্তাহ আগে যে কৃষক তার আলু ক্ষেতের পরিচর্যা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছিলেন, তাদের মাথায় এখন রাজ্যের হতাশা। শীত মৌসুমে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে আলু ক্ষেতে ছত্রাকবাহী রোগের আশঙ্কায় আলুর নিশ্চিত ফলন বিপর্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। চলমান আবহাওয়া সহসা পরিবর্তন না হলে এ বছর আলুর ফলনে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখোমুখি পড়বেন কৃষক, এমন ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, আলু মূলত নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার জন্য উপযুক্ত। নি¤œ তাপমাত্রার কারণে আলুর কন্দ গঠনে সহায়ক হয়। তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির উপরে গেলেই আলুর কন্দ গঠন ও অঙ্কুরোদগম বাধাগ্রস্ত করে। এ জন্য শীত মৌসুমে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকায় আলুর ফলনে সমস্যা হয় না। তবে চলতি মৌসুমে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক আচরণে আলু চাষিদের মধ্যে হতাশা নেমে এসেছে। চলমান আবহাওয়া আলু চাষিদের জন্য সহায়ক নয় বলে কৃষি বিভাগ ও চাষিরা জানিয়েছেন।

জানা গেছে, দেশের মোট চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ সবজি যশোর থেকে সরবরাহ করা হয়। শীত মৌসুমে জেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে বড় অংশে চাষ করা হয় আলু। এ অঞ্চলের মাটি উপযোগী হওয়ায় এবার জেলার আট উপজেলাতেই ব্যাপক আলুর চাষ হয়েছে। শুরুতে শীতের প্রকোপ থাকায় কোনো সমস্যা দেখছিলেন না চাষিরা। তারা মনে করছিলেন, এ আবহাওয়া অব্যাহত থাকবে। তবে হঠাৎ তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে আলু ক্ষেতে ছত্রাকবাহী রোগের আশঙ্কায় রয়েছেন তারা।

যশোর বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান বিমান ঘাটির আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সর্বশেষ ২৯ ডিসেম্বর এ অঞ্চলে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় আট দশমিক ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াস। এরপর থেকেই তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। গত চার দিন ধরে এ অঞ্চলের তাপমাত্রা ১৬ ডিগ্রির মধ্যে উঠানামা করছে, যা অনেকটা অস্বাভাবিক বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। তবে সামনের এক সপ্তাহ পর তাপমাত্রা কিছুটা কমতে পারে বলে আবহাওয়া অফিস আভাস দিয়েছে। 

আলু চাষিরা বলছেন, অন্যান্য বছর তারা ক্ষেতে আলু রোপণের সময় শীত না পাওয়ায় ফলন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন। কিন্তু এ বছর চাষের উপযুক্ত সময়ে শীত পেলেও মাঝামাঝি সময়ে এসে নেই। এ আবহাওয়া আলু চাষের জন্য চরম ক্ষতিকর বলে তারা মনে করছেন। জেলার সাতমাইল, খাজুরা, নোঙরপুর, তীরের হাট, আব্দুল্লাহপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকার মাঠজুড়ে দেখা গেছে শুধু আলুর ক্ষেত। এসব চাষিরা তাদের ক্ষেত পরিচর্যায় ব্যস্ত। তবে তাদের সবার চোখে-মুখে শুধু হতাশার ছাপ।

নোঙরপুর মাঠের আলু চাষি শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘উচ্চ তাপমাত্রা আমাদের জন্য কাল হয়ে দেখা দিয়েছে। খারাপ আবহাওয়া ও আলুর বাজারদর কম থাকায় এর আগে কয়েক বছর আলু চাষ করে ক্ষতিতে পড়েছি। তবে ২০১৯ সালে আলুর ফলন বিপর্যয়ের মুখে পড়লেও দাম পেয়ে তারা কিছুটা টিকে থাকেন। কিন্তু শেষ সময়ে এসে আবহাওয়ার চরিত্র চৈত্রের মতো, যা মোটেও আলু চাষের জন্য উপযুক্ত নয়। দিনে রাতের তাপমাত্রার মধ্যে বেশি পার্থক্য নেই। প্রচণ্ড খরায় আলুর কন্দক গঠন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’

একই মত কৃষক আমজাদ হোসেনের। তিনি বলেন, ‘গরমের কারণে অনেক আলু গাছের পাতা মরে যাচ্ছে। গোড়ায় কোনো ফল আসছে না। এতে আমরা চরম চিন্তায় আছি। সামনে আদৌ শীত পাব কি নাÑতা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’

এ বিষয়ে যশোর সদর উপজেলার কৃষি অফিসার সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘চলমান আবহাওয়া আলু চাষের জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়। বলা চলে ভয়াবহ। আমরা এ মুহূর্তে চরম দুশ্চিন্তায় আছি, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয় কি নাÑতা নিয়ে। আলু চাষের জন্য কুয়াশা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি খুবই ক্ষতিকর। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হলে আলু ক্ষেত রক্ষার কোনো সুযোগ নেই।’

তিনি বলেন, ‘তাপমাত্রা কমে গেলে এবং সামনে বৃষ্টি না হলে কৃষক ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে বলে আশা করছি। গত বছরে সদর উপজেলায় ১২০০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়েছিল। এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়েছে। এছাড়া যে সব জমিতে কপি চাষ করা হয়েছে, সেগুলো ক্ষেত থেকে উঠার পর নাবি জাতের আলু চাষ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন কৃষক।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের অতিরিক্ত উপপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘উচ্চ তাপমাত্রার কারণে এ পর্যন্ত যশোরে আলু ক্ষেতে তেমন ক্ষতি হয়নি। তবে এ মুহূর্তে কৃষকদের আমরা দিনে একবার ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে বলেছি। কারণ চলমান আবহাওয়ায় আলু ক্ষেতে নাবি ধসা বা লেটক্লাইট রোগের প্রকোপ দেখা দিতে পারে। আশা করছি খুব দ্রুত সময়ে আবহাওয়ার বিরূপ আচরণের পরিবর্তন আসবে।’ এ সময় যশোরে চলতি মৌসুমে দুই হাজার ৭৭০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে বলে তিনি জানান।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..