দিনের খবর শেষ পাতা

শীর্ষে জনতা সোনালী ডাচ্-বাংলা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও ইস্টার্ন ব্যাংক

ব্যাংকের বিরুদ্ধে গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ

শেখ আবু তালেব: ব্যাংকে গ্রাহক হয়রানির ক্ষেত্রে এক সময় ব্যক্তি পর্যায়ের ক্ষুদ্র গ্রাহকদের অভিযোগই সবচেয়ে বেশি ছিল। কিন্তু এখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে হয়রানি নিয়ে বড় উদ্যোক্তারাও অভিযোগ জমা দিচ্ছেন বাংলাদেশ ব্যাংকে। পণ্য রপ্তানি করে বিদেশি ব্যাংকও অভিযোগ করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। যেসব ব্যাংকের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অভিযোগ জমা পড়েছে তাদের মধ্যে শীর্ষে উঠে এসেছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা, সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংকের নাম। বেসরকারি খাতের মধ্যে রয়েছে ডাচ্-বাংলা, ব্র্যাক, ইস্টার্ন ব্যাংক, দি সিটি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে জনতা ব্যাংকের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অভিযোগ জমা হয় ৪৪২টি। সোনালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ৩২২টি। এছাড়া ডাচ্-বাংলার ব্র্যাক ব্যাংকের বিরুদ্ধে ২৭৮টি, অগ্রণী ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১৯৩টি, ইস্টার্ন ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১৮৪টি, দি সিটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১৭৭টি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১৫৪টি ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১৪৭টি অভিযোগ জমা দেন গ্রাহকরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘হয়রানি শব্দটাই ব্যাংকারদের সঙ্গে যায় না। ব্যাংকগুলো নিজেদের স্বার্থকেই বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে। অথচ ব্যাংকগুলোর কাজই হলো গ্রাহকের সেবা নিশ্চিত করে ব্যাংকিং করা। সব কিছুর ঊর্ধ্বে মানুষকে সেবা দেয়া। এর বিনিময়ে তো ব্যাংক সেবা ফি নিয়ে থাকে। এটাই বাংলাদেশ ব্যাংক চায়। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এফআইসিএস বিভাগটিতে অভিযোগ জানাতে সব রকম মাধ্যম ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। যাতে গ্রামের একজন কৃষকও অভিযোগ জানাতে পারেন। আবার তরুণ প্রজন্মও অ্যাপসের মাধ্যমে জানাতে পারেন।’

জানা গেছে, ছোট থেকে গুরুতর বড় ধরনের অভিযোগ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসবের মধ্যে রয়েছে আমানত থেকে কোটি টাকার অর্থ আত্মসাৎ, বৈদেশিক দায় তথা আমদানি হওয়া পণ্যের বিপরীতে পরিশোধযোগ্য অর্থ পরিশোধ না করা, অতিরিক্ত সুদ আদায়, ভুয়া ঋণ তৈরি, ব্যাংকারদের ভুয়া চেক তৈরি ও গ্রাহকদের সঙ্গে অসদাচরণ। এসব অভিযোগের ৫৭ শতাংশই বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে।

অন্যদিকে ব্যাংকের নিজস্ব অভিযোগ সেলেও জমা পড়ছে বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ। এতে শীর্ষে অবস্থান করছে বিদেশি খাতের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। দেশীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে দি সিটি ব্যাংক, ব্র্যাক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক। গ্রাহক হয়রানি অভিযোগের শীর্ষ ১০ ব্যাংকের তালিকায় স্থান নিয়েছে এইচএসবিসি বাংলাদেশ, ইস্টার্ন ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, দি ট্রাস্ট ব্যাংক, দি প্রিমিয়ার ব্যাংক, জনতা ও মার্কেন্টাইল ব্যাংক।

জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিদেশি কয়েকটি ব্যাংক এদেশীয় ব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে পণ্য রপ্তানি হলেও অর্থ পরিশোধ করছে না। অভিযোগের নিষ্পত্তি করে পাঁচ কোটি ৫২ লাখ ডলার পরিশোধে দেশীয় ব্যাংকগুলোকে বাধ্য করে বাংলাদেশ ব্যাংক। স্থানীয় মুদ্রায় যা ৪৬৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিযোগ কেন্দ্রে ১৫৪টি অভিযোগ জমা হয় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের বিরুদ্ধে। আর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের নিজস্ব অভিযোগ সেলে জমা পড়ে সাত হাজার ২৪৮টি অভিযোগ। এ ব্যাংকটির বিরুদ্ধে দেশীয় গ্রাহকের পাশাপাশি রয়েছে বিদেশি গ্রাহক প্রতিষ্ঠানেরও অভিযোগ।

গ্রাহকদের অভিযোগ-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আতাউর রহমান প্রধান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘অভিযোগ এলেই আমরা তা গুরুত্ব দিই। অনেক সময় দেখা যায়, গ্রাহক যা দাবি করছেন, তা আমাদের নীতিমালার মধ্যেই আসছে না। কিছু সময় দেখা যায়, চেক জমা দিয়ে টাকা পেতে সময় লাগছে, চেক বই পেতে দেরি হওয়া, হিসাবের ফরম না পাওয়া ইত্যাদি অভিযোগ পাওয়া যায়। আবার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও হয়রানির অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগ যেটিই আসুক আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিই। খুব বড় ধরনের যে অভিযোগ জমা হয় তা কিন্তু নয়। সোনালী ব্যাংক এক হাজার ২০০ শাখা নিয়ে দেশের বৃহৎ নেটওয়ার্কের ব্যাংক। কাজ করতে গিয়ে তো গ্রাহকের পক্ষ থেকে অভিযোগ আসাটা স্বাভাবিক।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এ বিভাগে মোট চার হাজার ৫৩০টি অভিযোগ জমা হয়। পুরোটাই নিষ্পন্ন হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মোট তিন হাজার ৫২১টি অভিযোগ জমা হয়। যার মধ্যে নিষ্পন্ন হয় তিন হাজার ৫১৯টি। এর পরে অর্থাৎ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আগের বছরের চেয়ে ৭৬ দশমিক ৩১ শতাংশ অভিযোগ বৃদ্ধি পায়। আলোচিত সময়ে অভিযোগ জমা হয় ছয় হাজার ২০৮টি। এর মধ্যে অভিযোগ নিষ্পন্ন হয় ছয় হাজার ২০৬টি।

সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরেও অভিযোগ জমা হয় ৫৬ দশমিক ১৮ শতাংশ বেশি। এ সময়ে মোট পাঁচ হাজার ৪৯৯টি অভিযোগ জমা হয়। যার মধ্যে পাঁচ হাজার ৪৯৩টি অভিযোগই নিষ্পন্ন হয়। শতাংশ হিসাবে যা ৯৯ দশমিক ৯০।

অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এক হাজার ৫৯৩টি এসেছে সাধারণ ব্যাংকিং-সংক্রান্ত। এরপরই রয়েছে ঋণ ও আগাম-সংক্রান্ত ৬১৬টি, বৈদেশিক বাণিজ্য-সংক্রান্ত ৫৪৬টি, কার্ড ইস্যুতে ৪৮৩টি ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের সেবা নিয়ে অসন্তুষ্টি-সংক্রান্ত ৩১৩টি। এসব অভিযোগের ১৯ দশমিক ২৮ শতাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বিরুদ্ধে, বিশেষায়িত ব্যাংকের বিরুদ্ধে এক দশমিক ৮৫ শতাংশ, বেসরকারি খাতের ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশ, দেশে কার্যরত বিদেশি ব্যাংকের শাখার বিরুদ্ধে তিন দশমিক ৭৬ শতাংশ।

প্রসঙ্গত, ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্ট (এফআইসিএসডি) নামে একটি বিভাগ রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকে। ব্যাংকিং-সংক্রান্ত ইস্যুতে যে কোনো অভিযোগ এখানে জমা দেয়া যায়। টেলিফোন, অনলাইন, লিখিত ও কল সেন্টারের মাধ্যমে অভিযোগ জমা দেয়া যায় এ বিভাগে। ২০১২ সাল থেকে এটিকে পৃথক বিভাগে রূপান্তরিত করা হয়।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..