দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

শীর্ষ খেলাপি থেকে ঋণ আদায়ে ব্যর্থ রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক?

জয়নাল আবেদিন: কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রতি বছরই বেঁধে দেওয়া হয় খেলাপি ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা। আর প্রতি বছরই এ লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয় ব্যাংক। ২০১৩ সাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত কোনো বছরই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ঋণখেলাপিদের থেকে অর্থ আদায়ের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। সর্বশেষ তথ্যমতে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত শীর্ষ ২০ খেলাপি থেকে লক্ষ্যমাত্রার চার শতাংশ অর্থও আদায় করতে পারেনি রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংক। কিন্তু চার ব্যাংকের খেলাপিদের থেকে ক্যাশ রিকভারি ও শীর্ষ ২০ খেলাপি থেকে আদায়ের লক্ষ্য ছিল তিন হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৩৪৯ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংককে ২০২০ সালে শীর্ষ ২০ খেলাপি থেকে ২৫০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু ছয় মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা; যা বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১ দশমিক ৯৪ শতাংশ। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ব্যাংকটির মোট খেলাপির ৯০ শতাংশই মন্দমানের খেলাপি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ছয় মাসে মাত্র শূন্য দশমিক ২৪ শতাংশ খেলাপি ঋণ আদায় করতে পেরেছে জনতা ব্যাংক। বছরব্যাপী শীর্ষ ২০ খেলাপি থেকে এক হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও প্রথম ছয় মাসে মাত্র দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা আদায় করেছে ব্যাংকটি। আর ২০০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা আদায় হয়েছে অগ্রণী ব্যাংকের; যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৩ দশমিক ২৮ শতাংশ। বছরব্যাপী রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩৫০ কোটি টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ১ কোটি ৬৩ লাখ; যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার শূন্য দশমিক ৪৭ শতাংশ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপিদের তালিকায় রয়েছে দেশের বড় বড় শিল্প গ্রুপ। তাদের মধ্যে মেসার্স টিঅ্যান্ড ব্রাদার্স গ্রুপ, মেসার্স হলমার্ক গ্রুপ, মডার্ন স্টিল মিলস লিমিটেড, মেসার্স ফেয়ার ট্রেড ফেব্রিক্স লিমিটেড, মেসার্স রহিম গ্রুপ, এননটেক্স গ্রুপ, ক্রিসেন্ট গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, থার্মেক্স গ্রুপ ও মুন গ্রুপ অন্যতম।

২০২০ সালের মধ্যে সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের খেলাপি কমানোর লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে ২৫ শতাংশ। সে অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাসে অন্তত সাড়ে ১২ শতাংশ খেলাপি কমানোর কথা ছিল ব্যাংকগুলোর। কিন্তু সেই লক্ষ্য কোনো ব্যাংকই অর্জন করতে পারেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরের শুরু থেকেই সব গ্রাহককে খেলাপির খাতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ সুবিধায় পুনঃতফসিল করা হচ্ছে খেলাপি ঋণ। এতে করে এমনিতেই ব্যাংকগুলোর খেলাপির পরিমাণ কমে আসছে। তারপরও খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্য পূরণ করতে পারছে না কোনো ব্যাংক। ডিসেম্বরের তুলনায় জুন মাসে জনতা ব্যাংকের খেলাপি কমেছে ৫৯৭ কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে যা ৪ দশমিক ০৯ শতাংশ। কিন্তু ছয় মাসে অন্তত ১২ শতাংশ খেলাপি ঋণ কমানোর কথা ছিল ব্যাংকটির। আলোচ্য ছয় মাসে ১৪ হাজার ৬০৩ কোটি থেকে ১৪ হাজার ৬ কোটিতে নেমে এসেছে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ।

এদিকে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি কমেছে ২৯৪ কোটি টাকা। হিসাব করে দেখা গেছে, ডিসেম্বরের চেয়ে জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি কমেছে ৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ছয় হাজার ৬৪৩ কোটি থেকে ৬ হাজার ৩৪৯ কোটিতে নেমে এসেছে অগ্রণী ব্যাংকের মোট খেলাপি পরিমাণ। এছাড়া রূপালী ব্যাংকের ঋণখেলাপি জুন শেষে এসে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ১৬৮ কোটি টাকায়। ডিসেম্বর শেষে যার পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৬১৪ কোটি। ছয় মাসের ব্যবধানে ৪৪০ কোটি টাকার খেলাপি কমেছে ব্যাংকটি। শতকরা হিসাবে যার পরিমাণ ৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, আমার জানা মতে, প্রতি বছরই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি বার্ষিক চুক্তি হয়। সামনাসামনি বৈঠকে নির্ধারণ করে দেওয়া হয় আসন্ন বছরের কর্মপরিকল্পনা। আমানত সংগ্রহ, ঋণ বিতরণ, খেলাপি ঋণ হ্রাস, লোকসানি শাখা কমানো, শীর্ষ ২০ খেলাপি থেকে আদায়, ঋণ পুনঃতফসিলসহ বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু ব্যাংকগুলো তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে কি নাÑবছর শেষে সে বিষয়ে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয় না। তাছাড়া ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলো স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারছে কি না বা সরকারকে লাভ দিতে পারবে কিনাÑএসব বিষয়ে কোনো নজরদারি নেই। প্রতিবছরই ব্যাংকগুলো ব্যর্থ হয় আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন করে লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়। প্রক্রিয়াটা যেন লক্ষ্য নির্ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নানা অনিয়মের কারণে বৈদেশিক বাণিজ্য থেকে ছিটকে পড়ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। সংস্থাটি বলছে, একসময় দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য (আমদানি-রপ্তানি) সেবা প্রদানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকই ছিল চালকের আসনে। কিন্তু ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতায় এ স্থান দখলে নিয়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। ২০১৮ সালে দেশের মোট রপ্তানির মাত্র ৭ শতাংশ হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মাধ্যমে। বছরটিতে রপ্তানি বাণিজ্যের ৭৪ শতাংশই সম্পন্ন হয়েছে বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এখনও আমাদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের তিন-চতুর্থাংশই সম্পন্ন হচ্ছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..