Print Date & Time : 17 August 2022 Wednesday 8:43 pm

শেরপুরে ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধি আতঙ্কে নদী-তীরবর্তী মানুষ

রফিক মজিদ, শেরপুর: প্রতিদিনই বাড়ছে শেরপুরের ব্রহ্মপুত্র নদের পানি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার করে পানি বাড়ছে। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরের রেকর্ড অনুযায়ী বিপৎসীমার প্রায় ২৩১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। ইতোমধ্যে নদীর দুই ধার টইটম্বুর হয়ে পড়ে বেশ কিছু স্থান দিয়ে পানি প্রবেশ করে নদী-তীরবর্তী বিভিন্ন গ্রামের সবজিক্ষেত তলিয়ে গেছে। ফলে স্থানীয় নদী-তীরবর্তী মানুষ এখন বন্যা আতঙ্কে রয়েছেন। 

গতকাল সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, জামালপুরের যমুনা নদীর পানি বাড়ার পরপরই বেড়ে যায় শেরপুর সদর উপজেলার পুরোনো ব্রহ্মপুত্র নদের পানি। বিপৎসীমানার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ার আগেই ওই নদীর পুরোনো বাঁধের ভাঙা অংশ নিয়ে হু হু করে পানি প্রবেশ করে উপজেলার ১৪ ইউনিয়নের মধ্যে ৬ থেকে ৭ ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে। এসব ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের প্রায় অর্ধলাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে ওইসব গ্রামের রোপা-আমন এবং সবজিক্ষেত তলিয়ে নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া বন্যার পানি কমতে শুরু করলে উপজেলার চর পক্ষীমারি ও চর মুছারিয়া ইউনিয়নের চুনিয়ার চর, বাগলদি, কুলুর চর, খাশ পাড়া, ডাক পাড়া গ্রামে শুরু হয় নদীভাঙন। ইতোমধ্যে গত এক মাসে প্রায় ২০ একর জমি নদীতে চলে গেছে। আর বিগত ২০ বছরে নদীতে গেছে পুরো একটি গ্রাম। এসব জমিতে ঢ্যাঁড়শ, কুমড়া, কদু, বেগুনসহ বিভিন্ন ফসল ছিল। অবশিষ্ট যেসব জমিতে এখনও উল্লেখিত সবজি রয়েছে তা বন্যাতঙ্কে তুলে নিয়ে আসছে কৃষকরা।

চরপক্ষীমারি ইউনিয়নের চুনিয়ার চর গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম, মনোয়ারা বেগম ও উসমান আলী জানায়, গত এক মাসে আমাদের বেশ কিছু সবজি ক্ষেত নদীতে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে পানি বাড়ার কারণে ভাঙন একটু কমেছে। তবে পানি কমে গেলে আমাদের এ গ্রামের অর্ধেকটাই নদীতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর যদি দুই তিন দিনের মধ্যে নদীর পানি ঢুকে বন্যাকবলিত হয়। তবে আমাদের সব সবজিক্ষেত ভেসে যাবে। তাই ক্ষেতের সব সবজি আগামই তুলে ফেলতে হচ্ছে।

একই গ্রামের মোতালেব জানায়, আমাদের এ নদীর তীরের আগের বাঁধটা অনেক বছর আগেই ভেঙে যাওয়ায় প্রতি বছর বন্যায় কবলিত হয়ে পড়তে হয়। যদি বাঁধটা নির্মাণ করা হয় তবে আমাদের আর ভাঙন ও বন্যাকবলিত হতে হবে না। বর্তমানে নদী-তীরবর্তী মানুষ এখন বন্যাতঙ্কে রয়েছেন। কখন পানি ঢুকে পড়ে, তাই বন্যার সময়ে আশ্রয় নিয়ে তারা চিন্তায় রয়েছেন।

নদী-তীরবর্তী বাড়ি-ঘরের মানুষ এখন নদীর তীরে বসে পর্যক্ষেণ করছেন এবং আতঙ্কে রয়েছেন কখন নদী উপচে পানি ঢুকে তাদের বসতভিটায় উঠে তলিয়ে যাবে তাদের বাড়ি-ঘর, রাস্তাঘাট ও সবজিক্ষেত।

স্থানীয়রা জানায়, পানি যেভাবে বাড়ছে তাতে দুই এক-দিনের মধ্যেই পুরো এলাকা বন্যাকবলিত হয়ে পড়বে। এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ গতকাল বেলা ১২টার রিপোর্ট অনুযায়ী ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ২৩১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে।

শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী মো. শাহজাহান মিয়া বলেন, আপাতত আমাদের পূর্বাভাসে দেখা গেছে, আগামী দুই দিন পানি বেড়ে আবারও তা কমে যেতে পারে। সে হিসাবে এখনই বন্যার আশঙ্কা নেই। তবে নিচু এলাকা প্লাবিত হতে পারে।

সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মেহনাজ ফেরদৌস বলেন, যদি বন্যা হয় তবে উপজেলার ১৪ ইউনিয়ের মধ্যে ৬ থেকে ৭টি ইউনিয়ন কবলিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আমাদের সব প্রস্তুতি নেয়া আছে। পর্যাপ্ত ত্রাণও রয়েছে। এ ছাড়া পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধার করতে সরকারি ও বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রস্তুত রয়েছে। মেডিকেল টিমও গঠন করা আছে। আমরা নদীর পানি বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছি।

এদিকে নদী-তীরবর্তী উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম বন্যাকবলিত হওয়া ওই নদের শেরপুর প্রান্তে বাঁধ নির্মাণ না করা হলে প্রতি বছর এভাবেই স্থানীয়রা হারাবে তাদের ঘর-বাড়ি ও ফসলের ক্ষেত। তাই ব্রহ্মপুত্র নদের স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে সদরের চরাঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষকে বন্যার হাত থেকে বাঁচতে জোর দাবি সচেতন মহলের।