মত-বিশ্লেষণ

শেষ দশ দিনের ফজিলত ও ইবাদত

আরবি ‘রমজ’ শব্দ থেকে ‘রমজান’ শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ ‘দহন’, ‘জ্বলন’। আর রোজাকে আরবিতে বলা হয় ‘সিয়াম’। ‘সিয়াম’ পালনের কারণে সায়েম বা রোজাদারের পেট জ্বলতে থাকে। আর এই অবস্থা বোঝানোর জন্য আরবি ভাষায় বলা হয়, আস-সায়িমু ইয়ারমাদু, তথা রোজাদার দগ্ধ হয়। এই শব্দ থেকে গঠিত হয় আর-রামাদাউ তথা উত্তাপের তীব্রতা। এই অর্থ থেকে রমজান হলো অব্যাহত তীব্র দহনের সমষ্টি। রমজান হিসেবে এ মাসের নামকরণের কারণ হলো, রমজানের নেক আমল সব গুনাহ জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেয়।

রোজার আরবি হলো সাওম বা সিয়াম, আর সাওম বা সিয়াম অর্থ বিরত থাকা। সুবহে সাদিক থেকে সুর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকার নাম রোজা। রমজান মাসের সবিশেষ গুরুত্বের অন্যতম কারণ হলো, এ মাসে জ্ঞানের আকরগ্রন্থ আল-কোরআনুল কারিম অবতীর্ণ হয়, যেটি গোটা মানবতার পথনির্দেশক। মহান আল্লাহ বলেন, ‘রমজান সে মাস, যাতে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে মানবজাতির পথনির্দেশিকা, সঠিক পথের স্পষ্ট প্রমাণ ও ফুরকান (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী) হিসেবে।’ (সুরা: বাকারা, আয়াত: ১৮৫)

রমজান মাসের প্রতিটি ক্ষণ মুসলিম উম্মাহর জন্য মহামূল্যবান। এই মাস প্রাপ্তিতে পরকালীন চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য মুমিনমাত্রই অবিমিশ্রভাবে আমল করে। প্রথম ১০ দিনে আল্লাহর রমহতে বান্দা নিজেকে পূততায় সিক্ত করে নেয়, দ্বিতীয় ১০ দিনে ক্ষমা লাভের মাধ্যমে বান্দা নিজেকে আল্লাহর কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়, আর শেষ ১০ দিনে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার নিশ্চয়তা লাভের চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করে। এজন্য মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুল রমজানের শেষ ১০ দিনের প্রতি অসাধারণভাবে গুরুত্বারোপ করেছেন এবং নানা নফল ইবাদতের দ্বারা শেষ ১০ দিনকে সমৃদ্ধ করেছেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) রমজানের শেষ ১০ দিনে (ইবাদত-বন্দেগিতে) যে পরিশ্রম করতেন, তা অন্য কোনো সময় করতেন না। (মুসলিম, তিরমিজি)

হজরত আলী (রা.) বলেন, রমজানের শেষ ১০ দিনে রাসুল (সা.) (ইবাদত-বন্দেগি করার নিমিত্তে) তাঁর পরিবারবর্গকে (রাতে) জাগিয়ে দিতেন। (তিরমিজি, মুসনাদে আহমাদ)

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসুল (সা.) যখন রমজানের শেষ ১০ দিনে প্রবেশ করতেন, তখন রাতে জেগে থাকতেন, পোশাক-পরিধেয় বেঁধে নিতেন এবং পরিবারবর্গকে (ইবাদত-বন্দেগি করার জন্য) জাগিয়ে রাখতেন। (বুখারি, মুসলিম)

আমাদেরও রমজানের শেষ দশকে ইবাদতে নিমগ্ন হওয়া চাই সবিশেষ বিজোড় রাতগুলোয়। কারণ এ রাতগুলোতেই আছে হাজার বছরের সেরা রজনী লাইলাতুল কদর, যেটি কোরআন নাজিলের মতো মহা-অর্জনসমৃদ্ধ। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.)-এর বাণী হলো, ‘যে ব্যক্তি বিশ্বাস ও ইহতিসাবসহ কদররাত ইবাদত-বন্দেগিতে কাটায়, তার আগের জীবনের সব পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে।’ (বুখারি, হাদিস: ১৯০১)

অধিকন্তু ২৭তম রাতকেই মুসলিম সমাজ কদরের রাত হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। কারণ হজরত বিলাল (রা.), হজরত উবাহ (রা.), মুআবিয়া (রা.)-সহ বেশিরভাগ সাহাবার বর্ণনা সপ্তবিংশ রাতকেই নির্দেশ করে। তবে আল্লাহর রাসুল (সা.) উম্মাহর মহাকল্যাণার্থে নির্দিষ্ট করে দেননি। আমরা সব বিজোড় রাতে আল্লাহর রাসুলের শিখিয়ে দেয়া দোয়া দিয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ভিক্ষা চাইব। আর তা হলো, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন কারিম তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।’ অর্থাৎ হে আল্লাহ, আপনি মহা সম্মানিত ও ক্ষমাশীল, ক্ষমাই আপনার পছন্দ। অতঃপর আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।’ (বুখারি)

শেষ ১০ দিনের আরেক মহামূল্যবান আমল হলো ‘ইতিকাফ’ তথা ইবাদত-বন্দেগির নিমিত্তে নিয়ত করে মসজিদে অবস্থান নেয়া। কোরআন যে ইবাদতের কথা উদ্ধৃত করেছে। এটি এমন গুরুত্বপূর্ণ আমল যে আল্লাহর রাসুল (সা.) হজরত উমর (রা.)-কে জাহিলি যুগের ইতিকাফের মানত ইসলাম গ্রহণের পর পূরণ করতে বলেছিলেন। এ প্রসঙ্গে হজরত আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনায় এসেছে, নবী (সা.) ইন্তেকাল অবধি প্রতিবছরই ইতিকাফ থেকেছেন। তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর সহধর্মিণীরাও ইতিকাফ পালন করতেন। (বুখারি,  মুসলিম)

ড. মুহাম্মদ ফরিদুদ্দিন  

অধ্যাপক, আরবি বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..