প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা

 

এম এ খালেক: সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে (২০১৬-১৭) দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে বৈদেশিক বিনিয়োগে রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। পুঁজিবাজারে নানা ধরনের অনিশ্চয়তা ও সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা গত অর্থবছরে ব্যাপক হারে বিনিয়োগ ও লেনদেন করেছেন। তাদের এ বিনিয়োগ বা লেনদেনের ফলে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। উল্লেখ্য, কোনো দেশের শেয়ারবাজার বা সাধারণ শিল্পকারখানায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তখনই অধিক হারে বিনিয়োগে আগ্রহী হন, যখন স্থানীয়রা বেশিমাত্রায় বিনিয়োগ করেন। কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো জনপদে বিনিয়োগের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয়দের আচরণ ও বিনিয়োগ প্রবণতা বিশেষভাবে বিবেচনায় নেন। তবে শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এ সাধারণ আচরিত নিয়মের কিছুটা হলেও ব্যত্যয় লক্ষ করা গেছে। গত অর্থবছরেও স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনেকটাই নেতিবাচক মনোভাবের পরিচয় দেন। তারা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনেকটা ‘ধীরে চলো’ নীতি অনুসরণ করেন। বছরের প্রায় পুরোটা সময়ই শেয়ারবাজারে এক ধরনের স্থিতিশীলতা বিরাজ করে; যদিও মাঝখানে দু’একবার কারসাজির গুজব শোনা গিয়েছিল। তবে সে কারসাজি কেলেঙ্কারির পর্যায়ে যেতে পারেনি। এ অবস্থায় বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রবণতা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। অনেকে অবশ্য এ প্রশ্নও তুলেছেন, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রবণতা অবশ্যই ভালো; তবে যে বিনিয়োগ আহরিত হয়েছে, তা কি নতুন বিনিয়োগ, না পুনর্বিনিয়োগ? শেয়ারবাজারে বিদ্যমান বিনিয়োগ থেকে যে লভ্যাংশ তারা অর্জন করেছেন, সেটিই আবার নতুন করে এখানে বিনিয়োগ করা হয়ে থাকতে পারে। তবে বিনিয়োগ নতুন হোক আর পুরোনোই হোক, তা দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনলেই হলো। উল্লেখ্য, বিদ্যমান বিনিয়োগ থেকে বিদেশি উদ্যোক্তারা যে মুনাফা অর্জন করেছেন, তা যদি তারা ইচ্ছে করতেন নিজ দেশে নিয়ে যেতে পারতেন। তা না করে তারা সে লভ্যাংশ বাংলাদেশেই বিনিয়োগ করেছেন। স্থানীয় শেয়ারবাজারের প্রতি এটি তাদের আস্থার প্রতিফলন বলে মনে করা যেতে পারে। তারা যদি আস্থাহীনতায় ভুগতেন, তাহলে নিশ্চয়ই লভ্যাংশ এখানে পুনর্বিনিয়োগ করতেন না। কেউই তার পুঁজি হারাতে বা ঝুঁকিতে ফেলতে চায় না।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে মোট ১০ হাজার ৯ কোটি টাকা লেনদেন করেছেন। পরিমাণটি এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ। আগের অর্থবছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে মোট আট হাজার ৮৪ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল। সে হিসেবে সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এক হাজার ৯২৫ কোটি টাকা বা ২৪ শতাংশ বেশি লেনদেন হয়েছে। একক মাস হিসেবে সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয় গত মার্চে। এর পরিমাণ ছিল এক হাজার ৯২ কোটি টাকা। আগের বছরের মার্চে লেনদেন হয়েছিল ৬০৯ কোটি টাকা। শেয়ারবাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১০ সালের ধসের পর আইনি সংস্কারসহ নানা কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে বাজারে স্বস্তি ফিরেছে। এছাড়া ভালো মৌলভিত্তির কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের মূল্য হ্রাস পাওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এসবে বিনিয়োগ করেছেন। একই সঙ্গে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ-এর শেয়ারে বড় ধরনের পরিবর্তন সাধিত হওয়ায় বিদেশিদের অনেকেই এ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে বিনিয়োগ করেছেন। গত অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে মার্চ মাসে, যার পরিমাণ ছিল এক হাজার ৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ক্রয়ের পরিমাণ ছিল ৭১১ কোটি এবং বিক্রির পরিমাণ ৩৮১ কোটি টাকা। ক্রয়-বিক্রয় হিসাব করে প্রকৃত বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৩০ কোটি টাকা। অর্থবছরের শেষ মাস অর্থাৎ গত জুনে লেনদেন মার্চের চেয়ে কিছুটা কম হলেও প্রকৃত বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল তুলনামূলক বেশি। জুনে এক হাজার ৭৩ কোটি টাকা লেনদেন হয়; কিন্তু এ সময় প্রকৃত বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৩৯০ কোটি টাকা। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করেছেন খাদ্য ও সংশ্লিষ্ট খাতের শেয়ারে। এ-খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারের ২০ শতাংশই ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। এছাড়া ওষুধ ও রসায়ন খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ১২ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে। তারা স্থানীয় শেয়ারবাজারের প্রতি বর্ধিত হারে আগ্রহ প্রদর্শন করায় স্থানীয়রাও উৎসাহী হয়ে উঠছেন। তবে বাজারকে আরও গতিশীল ও চাঙা করার জন্য ২০১০ সালের ধসের পর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা একান্ত প্রয়োজন ছিল। এ-ছাড়া বাজার ধসের পেছনে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও বাড়তো। কেলেঙ্কারির হোতাদের দু’একজনের শাস্তি হলেও বাকিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এখনও বাজারের প্রতি যথেষ্ট আস্থা ফিরে পাচ্ছেন না। অথচ বাজার বিকশিত হওয়ার জন্য তাদের আস্থা অর্জন করাটা জরুরি।

বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যেভাবে বিনিয়োগ শুরু করেছেন, তা ধরে রাখতে হলে এ মুহূর্তে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমেই বাজারে ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারের জোগান বাড়াতে হবে। চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভালো শেয়ারের জোগান বাড়াতে না পারলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ক্রমান্বয়ে বাজারে নিয়ে আসার উদ্যোগ নিতে হবে। উল্লেখ্য, কয়েক বছর আগে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ২৬টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। একাধিকবার এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বাজারে নিয়ে আসার জন্য ডেটলাইন ঘোষণা করা হলেও অজ্ঞাত কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার এখনও বাজারে আসেনি। এগুলো ভবিষ্যতে বাজারে আসবে কি না, তাও বলা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রায়ত্ত বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান দিনের পর দিন লোকসান দিয়ে চলেছে। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি লাভজনকভাবে চলতে না পারে, তাহলে সেটাকে ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেওয়াই উত্তম। তবে সে ক্ষেত্রে সরাসরি ব্যক্তির কাছে বিক্রি না করে শেয়ার হস্তান্তরের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক-বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশিরভাগের অবস্থাই ভালো নয়। তাই এগুলোও শেয়ার হস্তান্তরের মাধ্যমে ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। আবেগপ্রবণ হলে চলবে না। উপযুক্ত সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান শেয়ার হস্তান্তরের মাধ্যমে ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠান টানা লোকসান দেবে আর রাষ্ট্র সেটির ‘দায়ভার’ বহন করবেÑএটা চলতে পারে না। শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বাজারে ছাড়লেই সমস্যার সমাধান হবে না। ব্যক্তিমালিকানাধীন স্থানীয় উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও শেয়ারবাজারে নিয়ে আসতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশে ব্যবসারত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বেশিরভাগই এখনও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি। এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বাজারে নিয়ে আসার ব্যাপারে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীর আগ্রহ  বেশি। স্থানীয় উদ্যোক্তারা সাধারণত পারিবারিক আধিপত্য ক্ষুণœ হবে মনে করে প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বাজারে ছাড়তে চান না। ফলে বড় কোম্পানির শেয়ার বাজারে তেমন একটা নেই। যেসব বড় প্রতিষ্ঠান ব্যবসারত, সেগুলোকে শেয়ারবাজারে নিয়ে আসার জন্য উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। নতুন একটি কোম্পানি যখন বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটিতে (বিডা) নিবন্ধিত হবে, তখনই তাদের নির্দিষ্ট পরিমাণ শেয়ার বাজারে ছাড়ার বিষয়ে শর্তারোপ করা যেতে পারে। কোনো কোম্পানির শেয়ার বাজারে ছাড়া হলে তার পুঁজি গঠনে সেটা যেমন সহায়ক হয়, তেমনি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এসব কোম্পানির মালিকানায় অংশ নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। আমাদের দেশের উদ্যোক্তারা সাধারণত পুঁজির জন্য ব্যাংকে গিয়ে ধরনা দেন। কিন্তু শেয়ারবাজারের অবস্থা স্থিতিশীল, শক্তিশালী হলে তারা বাজারে শেয়ার ছেড়েও পুঁজি সংগ্রহ করতে পারবেন। বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটাই স্থিতিশীল। এ অবস্থায় পুঁজিবাজার বিকশিত হওয়ার চমৎকার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ভালো শেয়ারের পর্যাপ্ত জোগান না থাকায় মহলবিশেষ নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে বাজারকে কৃত্রিমভাবে প্রভাবিত করতে পারে। ১৯৯৬ অথবা ২০১০ সালে ঢাকা

শেয়ারমার্কেটে যে ধস নেমেছিল, তার পেছনে ছিল শেয়ারস্বল্পতার সংকট। একে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়ে একটি মহল ফায়দা লুটে নেয়।

অবশ্য বাজার যাতে কেউ প্রভাবিত করতে না পারে, সেজন্য ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকতে হবে। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে আগ্রহীদের বাজার ও শেয়ার ব্যবসার গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থাকা চাই। সব সময় মনে রাখতে হবে, আমি ১০০ টাকার একটি শেয়ার যত টাকা দিয়েই কিনি না কেনÑকোম্পানি কিন্তু ডিভিডেন্ড দেবে শেয়ারের ফেসভ্যালুর ওপর। কাজেই কোন কোম্পানি কী পরিমাণ ডিভিডেন্ড দিতে পারে, সে সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা রাখতে হবে। এখন অনেক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারীদের শেয়ারবাজারের লেনদেন পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। কারণ শেয়ারবাজার স্পর্শকাতর ক্ষেত্র; এখানে যেনতেনভাবে পুঁজি বিনিয়োগের কোনো অবকাশ নেই। সেক্ষেত্রে লোকসানের শঙ্কা প্রবল।

 

অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক