প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

শে ক ড় ক থ ন: রানী রাশমণির নাতি গোপালের নামেই ‘গোপালগঞ্জ’

নামকরণের পেছনে রয়েছে লোকমুখে প্রচলিত নানা মিথ, রহস্য। এ পর্বে ‘গোপালগঞ্জ’ জেলার লোককথা গদ্যে সাজিয়েছেন শরিফুল ইসলাম পলাশ

দিগন্তবিস্তৃত সবুজ ফসলের ক্ষেত, হাওর-বাঁওড় ও নদ-নদীবিধৌত প্রকৃতির এক অনন্য লীলাভূমি গোপালগঞ্জ। এ জেলার টুঙ্গীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতা। সেই স্বপ্ন বুকে জড়িয়ে গোপালগঞ্জের মাটিতে শায়িত আছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

গোপালগঞ্জের নামকরণ নিয়ে অনেক মতবাদ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত মতবাদটি হচ্ছে দক্ষিণেশ্বরের রানী রাশমণির নাতি গোপালের নামানুসারে নাম করা হয় গোপালগঞ্জ। আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে গোপালগঞ্জের পরিচিতি ছিল ছোট্ট একটি বাজার হিসেবে। এ অঞ্চলটি মাকিমপুর এস্টেটের জমিদার রানী রাশমণির এলাকাধীন ছিল। সিপাহি বিদ্রোহের সময় তিনি একজন উচ্চপদস্থ ইংরেজ সাহেবের প্রাণ রক্ষা করেন। পরবর্তীতে তারই পুরস্কার হিসেবে ব্রিটিশ সরকার রাশমণিকে মাকিমপুর এস্টেটের জমিদারি প্রদান করেন ও তাকে ‘রানী’ উপাধিতে ভূষিত করেন। রানী রাশমণির এক নাতির নাম ছিল নব গোপাল। তিনি তার নাতির নাম ও পুরোনো ইতিহাসকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ‘গোপাল’ অংশটি প্রথমে রেখে তার সঙ্গে রাজগঞ্জের ‘গঞ্জ’ যোগ করেন। তখন থেকে জায়গাটির নাম হয়ে যায় গোপালগঞ্জ। গোপালগঞ্জ নাম হওয়ার আগে ওই অঞ্চলের নাম ছিল রাজগঞ্জ।

১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলা ছিল যশোর জেলার অধীনে। ফরিদপুর জেলার সঙ্গে ছিল গোপালগঞ্জ জেলার বাকি অংশ। ১৮০৭ সালে মুকসুদপুর উপজেলাকে যশোর থেকে আলাদা করে ফরিদপুর জেলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ১৮১১ সালে ফরিদপুর শহরে কোর্ট বিল্ডিং নির্মিত হয়। ওই সময়কে ফরিদপুর জেলার প্রতিষ্ঠাকাল হিসেবে ধরা হয়। সে সময় যশোর ও ফরিদপুর জেলার মধ্যকার বিভক্তিরেখা ছিল চন্দনা ও মধুমতি নদী। অন্যদিকে বর্তমান গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুর জেলা ছিল বিশাল জলাভূমি। সেখানে নৌ-ডাকাতির প্রকোপ অনেক বেশি ছিল। ডাকাতি ঠেকাতে ১৮৫৪ সালে মাদারীপুরে নতুন একটি মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৭২ সালে মাদারীপুর মহকুমার অধীনে ‘গোপালগঞ্জ’ থানা গঠন করা হয়। ১৮৭৩ সালে মাদারীপুর মহকুমাকে ফরিদপুর জেলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। আরও প্রায় চার দশক পর ১৯০৯ সালে মাদারীপুর মহকুমাকে ভেঙে গোপালগঞ্জ, কোটালীপাড়া ও ফরিদপুর মহকুমার মুকসুদপুর থানা নিয়ে গোপালগঞ্জ মহকুমা গঠন করা হয়।

গোপালগঞ্জ মহকুমার প্রথম মহকুমা প্রশাসক ছিলেন সুরেশ চন্দ্র সেন। ১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জ মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হয়। গোপালগঞ্জের প্রথম জেলা প্রশাসক ছিলেন এএফএম এহিয়া চৌধুরী।

বাংলাদেশের মানচিত্রে গোপালগঞ্জ জেলা ঢাকা বিভাগের অধীনস্থ। এর আয়তন প্রায় এক হাজার ৪৮৯ দশমিক ৯২ বর্গকিলোমিটার।  গোপালগঞ্জের উত্তরে ফরিদপুর, দক্ষিণে পিরোজপুর ও বাগেরহাট; পূর্বে মাদারীপুর ও বরিশাল এবং পশ্চিমে নড়াইল জেলা। মধুমতি নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে গোপালগঞ্জের নিজস্ব সভ্যতা, সংস্কৃতি ও অবকাঠামো। গোপালগঞ্জ জেলা দিন দিন সাফল্যের শিখরে আরোহণ করছে। সে সঙ্গে কৃতী সন্তানদের কারণে সমৃদ্ধ হচ্ছে জেলার শিল্প-সংস্কৃতিও। এ জেলার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহও বাড়ছে।