প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

শৈল্পিক মমতায় তৈরি অটবি

করপোরেট টক ডেস্ক: বাংলাদেশের জন্য ফার্নিচার একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। সস্তা ও দক্ষ শ্রমিকের কারণে এ খাত সম্প্রসারণ হচ্ছে। দেশজুড়ে তৈরি হচ্ছে নতুন ক্রেতা। ফার্নিচার ব্যবসার এ উজ্জ্বল সম্ভাবনা হয়তো সত্তর দশকেই উপলব্ধি করেছিলেন চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর নিতুন কুণ্ডু। দেশের অন্যতম সফল এ উদ্যোক্তা তাই গড়ে তোলেন অটবি।

নিতুন কুণ্ডু ১৯৩৫ সালে দিনাজপুরে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতক ডিগ্রি নেন ১৯৫৯ সালে। এ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ইউনাইটেড স্টেটস ইনফরমেশন সার্ভিসে বা ইউএসআইএস-এ চিফ ডিজাইনারের দায়িত্ব পালন করেন। অংশ নেন স্বাধীনতা যুদ্ধে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চিত্রাঙ্কন, ভাস্কর্য নির্মাণ করেন অনেক দিন। এর পাশাপাশি ১৯৭২ সাল থেকে নানা ধরনের প্যাভিলিয়ন ডিজাইন ও উপহারসামগ্রী তৈরি শুরু করেন। ১৯৭৪ সালে কারুপণ্য তৈরিতে মনোযোগ দেন। এসব পণ্য বিক্রি করতে রাজধানীর শুক্রাবাদে নিজ বাসায় ছোট্ট একটি দোকান চালু করেন। দোকানের নাম ছিল ‘আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট’। মূলধন ছিল মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। একই সময় বাণিজ্যিকভাবে নানা ধরনের মেটাল ফার্নিচার তৈরি শুরু করেন। প্রথাগত কাঠের ফার্নিচারের পরিবর্তে মেটাল ফার্নিচারের ওপর গুরুত্ব দেন। পরের বছর ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন অটবি। এরপর ১৯৭৭ সালে রাজধানীর তোপখানা রোডে আরও একটি দোকান দেন। সেখানে ক্রেস্ট, ট্রফি, কোট পিন, কাপ, স্যুভেনির, টেবিল ল্যাম্পসহ মেটালিক ফার্নিচার তৈরি করতেন। কয়েকজন ডিজাইনার ও প্রকৌশলী নিয়ে কাজ করতেন। ১৯৮৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয় অটবি। ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ঢাকার মিরপুরের একটি কারখানায় তৈরি হতো তার নকশা করা ফার্নিচার। বিক্রি করতেন এলিফ্যান্ট রোডে একটি শোরুমে। নতুন ধরনের আসবাব ও ডিজাইনের কারণে বাড়তে থাকে ক্রেতা চাহিদা।

এ চাহিদা মাথায় রেখে নিতুন কুণ্ডু ঘরবাড়ি, অফিস, হাসপাতালের জন্য আসবাব তৈরি শুরু করেন। এর মধ্যে জাপানের অ্যাসোসিয়েশন ফর ওভারসিজ টেকনিক্যাল স্কলারশিপের (এওটিএস) প্রশিক্ষণ নেন। ব্যবসায় কাজে লাগান এ অভিজ্ঞতা। উন্নত করেন বিপণন প্রক্রিয়া। জনপ্রিয় হয়ে ওঠে তার হাতে গড়া অটবি। ১৯৯৩ সালে দিলকুশায় অটবি পণ্যের ডিসপ্লে সেন্টার উদ্বোধন করা হয়। উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে ১৯৯৪ সালে রাজধানীর শ্যামপুরে একটি কারখানা স্থাপন করেন নিতুন কুণ্ডু। সেই একই বছর ইউক্রেনে চেয়ার রফতানি করে এ প্রতিষ্ঠান। পরে ২০০৪ সালে ভারতের বাজারে তাদের তৈরি পণ্য বিক্রির মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করে অটবি।

শুধু মেটালিক ফার্নিচারেই সীমাবদ্ধ নয় অটবি। ১৯৯৯ সাল থেকে লেমিনেটেড বোর্ডে আসবাব তৈরি শুরু করে এ প্রতিষ্ঠান। এ ধরনের ফার্নিচার দেখতে অবিকল কাঠের ফার্নিচারের মতো। শুধু তাই-ই নয়, আভিজাত্যের দিকেও নজর দেয় এ প্রতিষ্ঠান। ফলে জনপ্রিয়তার শীর্ষে চলে আসে অটবি। প্রতিষ্ঠানটি ‘নক ডাউন’ পদ্ধতিতে আসবাব বিক্রি শুরু করে। এ নক ডাউন পদ্ধতিতে ফার্নিচার আলাদা কয়েকটি অংশে বিভক্ত থাকে। ফলে সংরক্ষণে কম জায়গা লাগে। এছাড়া সহজেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায়।

কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮১ সালে ঢাকা রফতানি মেলায় স্টলের জন্য প্রথম পুরস্কার পায় অটবি। এরপর ১৯৮২, ’৮৩ ও ’৮৫ সালেও একই পুরস্কার অর্জন করে। ১৯৯০ ও ১৯৯৫ সালে জাতীয় শিল্পমেলায় প্যাভিলিয়নের জন্য সেরার মর্যাদা পায়। ১৯৯৬, ’৯৮ ও ২০০১ সালে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় প্যাভিলিয়নের জন্য সেরার মর্যাদা লাভ করে। এছাড়া ১৯৯৭ ও ২০০৪ সালে দ্বিতীয় সেরার পুরস্কার পায় অটবি। ২০০১ সালে এন্টারপ্রাইজ অব দ্য ইয়ার নির্বাচিত হয় অটবি। ২০০৪ সালে আইএসও ৯০০১: ২০০০ সনদ লাভ করে অটবি। ২০০৬ সালে দিনাজপুর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় সেরা প্যাভিলিয়নের স্বীকৃতি লাভ করে। ২০০৭ ও ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় প্যাভিলিয়নের জন্য প্রথম পুরস্কার পায় অটবি। ২০০৯, ২০১১ ও ২০১২ সালে পায় বাংলাদেশ বিজনেস অ্যাওয়ার্ড। ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক গৌহাটি বাণিজ্যমেলায় দ্বিতীয় সেরা প্যাভিলিয়নের মর্যাদা পায়। শুধু প্রতিষ্ঠানই নয়, ব্যক্তিগতভাবে অনেক পুরস্কার অর্জন করেন অটবির স্রস্টা নিতুন কুণ্ডু। ১৯৫৬ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত অনেক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন তিনি। মজার বিষয়, এ সময়ে অংশ নেওয়া সব প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম হয়েছেন। শিল্প ও সংস্কৃতিতে ভূমিকা রাখার জন্য অটবির স্রষ্টা ১৯৯২ সালে একুশে পদক পেয়েছেন। ২০০৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার চিন্তাভাবনাজুড়ে ছিল অটবি।

বর্তমানে ৫ হাজার ১২০ জন কর্মী রয়েছেন এ প্রতিষ্ঠানে। রান্নাঘর, ডাইনিং রুম, লিভিং রুমসহ বাসা, অফিস, কম্পিউটার, হাসপাতাল ও ওয়ার্ক স্টেশন উপযোগী আসবাব তৈরি করছে অটবি। এছাড়া নানা ধরনের কারু ও প্রকৌশলপণ্য, গৃহসজ্জার টুকিটাকি, অফিস স্টেশনারি, প্লাইউড, ম্যাট্রেস, ফোম, ইন্টেরিয়র প্রজেক্টসহ ক্রেতাদের অনুরোধে নানা পণ্য তৈরি করে আসছে এ প্রতিষ্ঠান।

ক্লজেট নামে তাদের আরও একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেখানে নারীদের জন্য নানা অ্যাকসেসরিজ, ফুটওয়্যার, ব্যাগ, পার্টস প্রভৃতি বিক্রি করা হয়। মূলত নারীদের সব পণ্য এক জায়গায় সরবরাহ করতে এমন উদ্যোগ নিয়েছে অটবি।

সারা দেশে অটবির ১৮টি রিটেইল শোরুম, ২৮৮টি আউটলেট ও ৪৫০টি বিক্রয়কেন্দ্র  রয়েছে। এ বছর ৪২তম বর্ষপূর্তি উদযাপন করছে অটবি। এ উপলক্ষে বাছাই করা ফার্নিচারে ৪২ শতাংশ, কাঠের তৈরি আসবাবে ২০ শতাংশ, এলবি পণ্যে ১৫ ও অন্যান্য সব ফার্নিচারের ওপর ১০ শতাংশ ছাড় দিচ্ছে।