প্রচ্ছদ শেষ পাতা

শ্রমিকদের মুনাফার অংশ দিচ্ছে না ডরিন পাওয়ার

পলাশ শরিফ: শ্রম আইনে কোম্পানির কর-পূর্ববর্তী মুনাফার পাঁচ শতাংশ শ্রমিক অংশীদারিত্ব তহবিলে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু তারপরও কিছু কোম্পানি নানা অজুহাত দিয়ে শ্রমিকদের মুনাফার অংশ থেকে বঞ্চিত করছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের তেমনি একটি কোম্পানি ডরিন পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড সিস্টেমস লিমিটেড (ডিপিজিএসএল)।
আইনি বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় চেয়ে করা আবেদনের দোহাই দিয়ে সর্বশেষ সমাপ্ত আর্থিক বছরে শ্রমিকদের ঠকিয়েছে কোম্পানিটি। এর আগের বছরেও আইনি সীমা মেনে শ্রমিকদের মুনাফার জন্য সঞ্চিতি রাখা হয়নি। যদিও এটি শ্রম আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তারপরও কোম্পানিটির বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। আর দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষও এক্ষেত্রে উদাসীন।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০১৭ পঞ্জিকা বছরের ৩০ জুন শেষ হওয়া আর্থিক বছরে প্রায় ৮৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা কর-পরবর্তী মুনাফা করেছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ডরিন পাওয়ার। বিদ্যমান শ্রম আইন অনুযায়ী, ওই অর্থের পাঁচ শতাংশ হিসেবে চার কোটি ১৬ লাখ টাকা শ্রমিক অংশীদারিত্ব তহবিলে জমা করার কথা। কিন্তু ওই অর্থবছরে ওই তহবিলে কোনো অর্থ জমা দেয়নি কোম্পানিটি। এতে একদিকে শ্রমিকরা বঞ্চিত হয়েছেন। অন্যদিকে শ্রমিকের পাওনার অংশ কর-পরবর্তী মুনাফায় যুক্ত হওয়ার কারণে ওই মুনাফার অঙ্ক বেড়েছে। আর্থিক বছরের কার্যক্রম নিরীক্ষাকালে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান একনাবীন।
সরকারের নির্দেশনা চেয়ে পাঠানো চিঠি নিষ্পত্তির দোহাই দিয়ে শ্রমিকের প্রাপ্য অংশ ওই তহবিলে কোনো অর্থ দিচ্ছে না ডরিন পাওয়ার। এজন্য কোনো প্রভিশনও রাখা হচ্ছে না। উল্টো শ্রমিকের প্রাপ্য অংশকে মুনাফার সঙ্গে যোগ করে ফি বছর মুনাফার অঙ্ক বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে। এতে একদিকে বঞ্চিত হচ্ছেন শ্রমিকরা, অন্যদিকে ‘অতিরঞ্জিত’ হচ্ছে কোম্পানির মুনাফা।
শ্রমিকদের মুনাফার অংশ না দেওয়া প্রসঙ্গে ডরিন পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড সিস্টেমসের কোম্পানি সচিব মাসুদুর রহমান ভুঁইয়া শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা আর্থিক প্রতিবেদনেই এ বিষয়ে ব্যাখা দিয়েছি। এক্ষেত্রে আলাদা করে কিছু বলার নেই।’
এদিকে আর্থিক প্রতিবেদনে এ-সংক্রান্ত ব্যাখ্যায়, শ্রমিকদের মুনাফার অংশ দেওয়া বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি চেয়ে ২০১৭ সালের মার্চে বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিআইপিপিএ) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। ওই বছরের এপ্রিলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। বিষয়টি এখনও বিবেচনাধীন রয়েছে। এরই জের ধরে ২০১৭ সালের এ এপ্রিল থেকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত শ্রমিকদের মুনাফায় অংশগ্রহণ তহবিলের (ডব্লিউপিপিএফ) জন্য সঞ্চিতি না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে মিলেছে, শুধু সর্বশেষ আর্থিক বছরেই শ্রমিকদের প্রায় চার কোটি টাকা মুনাফার অংশ থেকে বঞ্চিত করেছে ডরিন পাওয়ার। এর আগের আর্থিক বছরে প্রায় ৭৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা কর-পরবর্তী মুনাফার বিপরীতে ডব্লিউপিপিএফের জন্য মাত্র ৭৭ লাখ টাকা প্রভিশন রেখেছে। অথচ ওই আর্থিক বছরেও আইন অনুযায়ী প্রায় তিন কোটি ৭৪ লাখ টাকা ওই ফান্ডে জমা দেওয়ার কথা ছিল। এ বিষয়ে নিরীক্ষকরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও ডরিন পাওয়ার বহাল তবিয়তে রয়েছে। দায়িত্বশীল নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তরফে অদ্যাবধি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্যমান আইন পরিপালন থেকে অব্যাহতি পাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রত্যেকটি কোম্পানি শ্রম আইন মেনে শ্রমিক অংশীদারিত্ব তহবিলে মুনাফার অংশ জমা দিতে বাধ্য। যদি সেই অর্থ বিতরণ না করা হয়Ñসেক্ষেত্রে প্রভিশন হিসেবে রাখতে হবে। তা না করে শুধু একটি আবেদনের দোহাই দিয়ে শ্রমিকদের মুনাফার অংশ না দেওয়া শ্রম আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ বিষয়ে যথাযথ মনিটরিং না থাকার সুযোগে কিছু কোম্পানি শ্রমিকদের ঠকিয়ে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ডরিন পাওয়ার জেনারেশনের ৭২ দশমিক ৬৩ শতাংশ শেয়ার কোম্পানিটির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে। এর বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ১৪ দশমিক ২৭ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে শূন্য দশমিক শূন্য সাত শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ১৩ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ শেয়ার রয়েছে। গতকাল কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ার ডিএসইতে সর্বশেষ ৮০ টাকা ৪০ পয়সায় লেনদেন হয়েছে।

 

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..