দিনের খবর সারা বাংলা

শ্রমিকের বদলে ভেকু মেশিন

রবিউল আউয়াল রবি, ময়মনসিংহ: ময়মনসিংহে দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারের গৃহীত কর্মসৃজন প্রকল্পে শ্রমিকের অধিকার নিয়ে চলছে অনিয়ম। প্রকল্পে নয়-ছয় ও টাকা লুটপাটের জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা ভেকু মেশিন ব্যবহারসহ তাদের অনুসারীদের শ্রমিক বানিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারের ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের ২০২০-২১ অর্থবছরে অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি প্রকল্পে মফস্বলের কর্মহীন প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে সরকার ৪০ দিনের কর্মসৃজন প্রকল্প চালু করে। নিয়ম অনুযায়ী মন্ত্রণালয়/প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় থেকে উপজেলায় বরাদ্দ প্রাপ্তির পর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) কর্তৃক জনসংখ্যা ও আয়তনের ভিত্তিতে তালিকা তৈরি করে ইউনিয়ন পরিষদে পাঠানো হয়। এরপর প্রকল্পের কাজ শুরু করার আগে ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে শ্রমিকের তালিকা তৈরি করা হয়। ওই তালিকা যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত হলে কাজ শুরু করার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট ও সংশ্লিষ্ট উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের নোটিস বোর্ডে প্রকল্পের নামসহ শ্রমিকের তালিকা টানানো হয়। একই সঙ্গে প্রকল্পস্থলে সাইনবোর্ড স্থাপন করে কাজ শুরু করার বিধান রয়েছে। কিন্তু ময়মনসিংহের ১৩ উপজেলার ১৪৭ ইউনিয়নের কোনো উপজেলা বা ইউনিয়নে এসব নিয়ম মানা হচ্ছে না। সরকার এ প্রকল্পের লুটপাট ঠেকানোর জন্য বেশ কয়েকটি সরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে জনপ্রতি শ্রমিকের বিপরীতে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টাকা উত্তোলনের নির্দেশ দিয়েছেন। অর্ধশত কোটি টাকা বরাদ্দে জেলার এ প্রকল্পে শ্রমিকরা উপকারভোগী হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে ঘটছে এর উল্টো।

বাস্তবে জেলার সদর, নান্দাইল, তারাকান্দা, ফুলবাড়ীয়া, মুক্তাগাছাসহ সব উপজেলায় অতিদরিদ্রদের কর্মসৃজন প্রকল্পে শ্রমিকের বদলে কাজ করা হয়েছে ভেকু মেশিনে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে হতদরিদ্র সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ।

কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা এসব নিয়ম না মেনে সিন্ডিকেট গড়ে শ্রমিকদের তালিকা ব্যবহার করে ওই শ্রমিকদের দিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করে তাদের নামমাত্র বখশিশ দিয়ে কৌশলে এ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ময়মনসিংহে ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রথম পর্যায়ে ১৩ উপজেলায় মোট উপকারভোগীর সংখ্যা ৫৯ হাজার ৭৪১। এসব শ্রমিকের বিপরীতে মোট অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ ওয়েজ-ননওয়েজ ও সরদার মিলিয়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকা।

জানা যায়, এ প্রকল্পে জেলার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জেলা প্রশাসক। সদস্য সচিব থাকেন জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা। উপজেলা পর্যায়ে এ প্রকল্পের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সদস্য সচিব হিসেবে থাকেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তারা। পরবর্তী পর্যায়ে ইউপি চেয়ারম্যান, সচিব ও মেম্বাররা এ প্রকল্পের দায়িত্ব পালন করেন। তবে প্রকৃত শ্রমিক দিয়ে এসব প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের নির্দেশ থাকলেও বর্তমানে ময়মনসিংহের বেশ কয়েক ইউনিয়নে নামমাত্র কাজ হয়েছে শ্রমিক দিয়ে, বাকি কাজ হয়েছে ভেকু মেশিনে।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রথম পর্যায়ে ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার ১৩ ইউনিয়নে ৯৭ প্রকল্পে চার হাজার ৯৬৫ শ্রমিকের বিপরীতে তিন কোটি ৯৭ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ হলেও বাস্তবে গত ৮ জানুয়ারি থেকে ১২ জানুয়ারি নানা প্রকল্প ঘুরে দেখা গেছে, ভেকু মেশিনে কাজ চলছে। উপজেলার মুশুলী, রাজগাতিসহ বেশ কয়েক ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডে দেখা গেছে একই চিত্র। এতে প্রতি ঘণ্টায় দুই হাজার টাকা ভাড়া নিচ্ছেন ভেকু মালিক।

ভেকু মেশিনে কাজ করানোর সত্যতা স্বীকার করে নান্দাইলের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এরশাদ উদ্দিন বলেন, অনিয়মের বিষয়টি জানতে পেরে ভেকু মেশিনে কাজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলাম।

তারাকান্দা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জাকারিয়া উপজেলার ৯ ইউনিয়নে প্রকল্পের আওতায় চার হাজার তালিকাভুক্ত শ্রমিক দেখিয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ দেখিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি উপজেলার ডাকুয়া, বালিখা, তারাকান্দা, জালাগাঁও, কাকানি, বিশকা ও কামারিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডে শ্রমিকের বদলে কাজ করিয়েছেন ভেকু মেশিনে। প্রকল্পে ভেকু মেশিন দিয়ে কাজ করানোর কথা স্বীকার করেছেন তারাকান্দার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) জাকারিয়া আলম। তিনি বলেন, শ্রমিক কত টাকা পেয়েছেন বা পাননি, সেটা ব্যাংকের বিষয়। আমাদের কয়েকটা প্রকল্পে খাল থাকায় ভেকু মেশিন দিয়ে কাজ করাই।

এ প্রসঙ্গে তারাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, তিনি বালিখা ইউনিয়নের দুটি প্রকল্প পরিদর্শন করেছেন। তবে কোথাও ভেকু মেশিনের ব্যবহার দেখতে পাননি। পিআইও ভেকু মেশিনে মাটি কাটার কথা স্বীকার করে থাকলে সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয় বলে জানিয়েছে জান্নাতুল ফেরদৌস।

অভিযোগ উঠেছে, সদর উপজেলার চরনিলক্ষীয়া ইউনিয়নে প্রকল্পে ৫৯৪ শ্রমিক তালিকাতে দেখালেও সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পুরো ইউনিয়নে কাজ করেছেন মাত্র ২২৭ শ্রমিক। প্রকল্পের কার্যদিবস শেষ হলেও উপজেলার কোথাও প্রকল্পের কোনো সাইনবোর্ড দেখা যায়নি। প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করতে সে সাইনবোর্ড ব্যবহার করা হয়নি বলে অভিযোগ অনেকের।

চরনিলক্ষিয়া ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, প্রকল্পের কোনো শ্রমিক কাজের টাকা না পেয়ে থাকলে তা ব্যাংক ও প্রকল্পের সভাপতির দায়ভার। এখানে আমার কিছু নেই।

অনিয়মের একই চিত্র ফুলবাড়ীয়া উপজেলার বাক্তা, নাওগাঁও, পুটিজানা, এনায়েরপুর, কুশমাইলসহ সব ইউনিয়নে। এসব প্রকল্পেও ভেকু মেশিনে ব্যবহার করে মাটি কাটা হয়েছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা সানোয়ার হোসেন অভিযোগের বিষয়ে বলেন, জেলার কোথাও প্রকল্পের অনিয়ম চোখে পড়েনি। তবে কয়েক স্থানে মৌখিক অভিযোগ পেয়েছিলাম, সরেজমিনে গিয়ে যা প্রমাণিত হয়নি। ভেকু মেশিনে কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান বলেন, শ্রমিকদের কেউ সুস্পষ্ট অভিযোগ করলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অনিয়ম হলে কোনো ছাড় দেয়া হবে না বলে তিনি জানান।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..