মত-বিশ্লেষণ

সংকটকালে সঠিক তথ্য জনগণের সুফল ভোগের হাতিয়ার

ইমদাদ ইসলাম: অবাধ তথ্যপ্রবাহ ও তথ্যের সর্বজনীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জন্য দিবসটি পালিত হয়। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘তথ্য অধিকার সংকটে হাতিয়ার’ এবং সেøাগান ছিল ‘সংকটকালে তথ্য পেলে জনগণের মুক্তি মেলে’।

তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নে তথ্য কমিশন এ পর্যন্ত বিভাগীয় পর্যায়ে সব বিভাগে ও জেলা পর্যায়ে সব জেলায় জন-অবহিতকরণ সভা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। উপজেলা পর্যায়ে ৪৭৮টি উপজেলায় ৪৯৭টি জন-অবহিতকরণ সভা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি উপজেলায় দ্বিতীয় পর্যায়ে জন-অবহিতকরণ সভা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। ২০১০ সাল থেকে মোবাইলের মাধ্যমে টেক্সট মেসেজ পাঠানো এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন টিভি স্ক্রলের মাধ্যমে তথ্য অধিকার আইন প্রচার করা হচ্ছে। এছাড়া তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে ব্যাপকভাবে গণসচেতনতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে টেলিভিশন চ্যানেলে টক-শো, আলোচনাসহ বাংলাদেশ বেতারে নিয়মিত ‘তথ্য অধিকার আইন জনগণের আইন’ বিষয়ক অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন কমিউনিটি রেডিও ও এফএম বেতারে তথ্য অধিকার বিষয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার করা হচ্ছে। তথ্য অধিকার আইনকে অধিক কার্যকর ও জনগণের জন্য ফলপ্রসূ করতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ গ্রহণের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করা হয়। ‘তথ্য অধিকার, জনগণের অধিকার’, ‘তথ্য পাওয়া আমার অধিকার’, ‘তথ্য আমার অধিকার, তথ্য এখন সবার’, ‘করব না আর তথ্য গোপন, স্বচ্ছ সমাজ করব গঠন’ ও ‘তথ্য পেলেন করিম চাচা’ শীর্ষক টিভিসিগুলো জেলা তথ্য অফিসের মাধ্যমে নিয়মিতভাবে প্রচার করা হচ্ছে।

‘তথ্য কমিশন তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯’-এর ১০ ধারার বিধানের আলোকে তথ্য সরবরাহের জন্য এ পর্যন্ত সমগ্র দেশ থেকে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সর্বমোট ৪২ হাজার ২৫৪ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার তথ্যসংবলিত ইলেকট্রনিক ডেটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে। তথ্য অধিকার আইন বিষয়ে তথ্য কমিশন এ পর্যন্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, বিভিন্ন পর্যায়ের সাংবাদিক ও সাব-এডিটর, সাব ইন্সপেক্টর, পুলিশ কনস্টেবল, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, আরটিআই প্রশিক্ষক, অন্যান্য কর্মকর্তাসহ মোট ৪৬ হাজার ৭৪৩ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রধান তথ্য কমিশনার, তথ্য কমিশনার, সচিব এবং তথ্য কমিশনের অন্যান্য কর্মকর্তা বিভিন্ন সময় তথ্য অধিকারের ওপর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে প্রশিক্ষণ সেশন পরিচালনা করেছেন।

তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা ও জন-উৎসাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে তথ্য তথ্য কমিশনের নানামুখী জনসচেতনতামূলক প্রচারের কারণে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে জনগণ এখন অনেক সচেতন। বিভিন্ন দপ্তরের তথ্য প্রাপ্তির আবেদন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। জেলা তথ্য অফিসগুলো এ জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তথ্য কমিশনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তথ্য না পাওয়ার কারণে ২০০৯ সাল থেকে ২০২০ সালের আগস্ট পর্যন্ত তথ্য কমিশনে তিন হাজার ৭৩২টি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তার মধ্যে ২১৮৩টি অভিযোগ কমিশন কর্তৃক শুনানির জন্য কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। দুই হাজার ১৬৮টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে। ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত তথ্য কমিশনে ১১২টি অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। ২৫ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত এবং ৩১ মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত বর্তমান কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ লকডাউন থাকা অবস্থায় কোনো অভিযোগ দাখিল করা হয়নি। ৩১ মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৪৬টি অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। কভিড পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে এবং জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করতে গত ২৭ জুলাই ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে শুনানি গ্রহণ করছে তথ্য কমিশন। এখন পর্যন্ত চার কর্মদিবস ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে শুনানি করে ১৫টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে এবং পত্র প্রদানের মাধ্যমে ২৬টি অভিযোগ নিষ্পত্তি  করা হয়েছে।

তথ্য অধিকার বাস্তবায়নের বিষয়ে অনুশীলন ও কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবের (সমন্বয় ও সংস্কার) নেতৃত্বে তথ্য অধিকার-বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ (কেন্দ্রীয় পর্যায়) কাজ করছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্তৃক মাঠপর্যায়ে তথ্য অধিকার বাস্তবায়ন জোরদার করার লক্ষ্যে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তিনটি কমিটি গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছেÑতথ্য অধিকার বাস্তবায়নে অবেক্ষণ (সুপারভিশন) ও পরিবীক্ষণ বিভাগীয় কমিটি, তথ্য অধিকার বাস্তবায়নে অবেক্ষণ (সুপারভিশন) ও পরিবীক্ষণ জেলা কমিটি এবং তথ্য অধিকার বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ উপজেলা কমিটি।

‘তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯’ নিঃসন্দেহে একটি উত্তম আইন। এ আইনের মাধ্যমে জনগণকে কর্তৃপক্ষের ওপর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, অথচ অন্য সব আইনে কর্তৃপক্ষকে জনগণের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার দেওয়া হয়েছে। তাই এটি একটি শক্তিশালী নাগরিকবান্ধব আইন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী জনগণ প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক। তথ্য অধিকার জনগণের ক্ষমতায়নের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। এই আইন প্রয়োগের ফলে সরকার ও জনগণের মাঝে সেতুবন্ধ রচিত হচ্ছে। সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষ যাতে তাদের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে পারে এবং নিজেদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে পারে, সেক্ষেত্রে আইনটি সবচেয়ে যুগোপযোগী ভূমিকা পালন করছে, যা বর্তমান সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য বলে বিবেচিত হচ্ছে।

এ আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থাসহ সব সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি পাবে। এতে দুর্নীতি হ্রাস পাবে, সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। এর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ এবং বর্তমান সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত বাংলাদেশ গঠন করা সহজ হবে। তথ্যসূত্র: তথ্য কমিশন

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..