প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সংকটের আবর্তে পোশাকশিল্প

হোসাইন মুবারক: এদেশে প্রাকৃতিক গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। শুধু পোশাক খাত নয়, অনেক শিল্প-কারখানায় জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের গুরুত্ব অপরিসীম। এ কারণে দিন দিন দেশের শিল্প-অর্থনীতিতে গ্যাসনির্ভরতা বাড়ছে। আর এই জ্বালানি গ্যাস নিয়ে বেশ কিছু দিন ধরে চলছে টানা সংকট।

ক’দিন আগে তৈরি পোশাক মালিক-রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ কারওয়ান বাজারের নিজস্ব কার্যালয়ে ওই শিল্পের বিভিন্ন সংকট নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে গাজীপুরের শিল্প এলাকায় গ্যাসের তীব্র সংকট নিরসন এবং বিকল্প উপায়ে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের দাবি জানিয়েছে। সংবাদ সম্মেলনের বরাত দিয়ে গত ২২ অক্টোবর দৈনিক শেয়ার বিজে প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত খবরে আরও জানানো হয়, গাজীপুর, আশুলিয়া, কোনাবাড়ী এলাকার কল-কারখানাগুলোয় গ্যাস সংকট প্রকট। পোশাক মালিকদের পক্ষ থেকে বিষয়টি সরকারকে জানানো হয়েছে। সরকার বিকল্প হিসেবে একটি সার-কারখানা বন্ধ করে ওইসব এলাকায় গ্যাস সরবরাহের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল।

শুধু গ্যাস সরবরাহ নয়, বর্তমানে পোশাকশিল্প আরও যেসব সংকটের মুখোমুখি তার ভেতরে ডলারের মূল্য কম, পণ্য খালাসের লিড টাইম বেশি, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং সে কারণে প্রতিযোগী সক্ষমতা কমে যাওয়া। ঠিক এ পরিস্থিতিতে এ বছর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঝুঁকি বাড়তি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এছাড়া আরও কিছু অভ্যন্তরীণ সমস্যা পোশাকশিল্পকে ঝুঁকির পথে নিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে রাস্তা-ঘাটের যোগাযোগ ব্যবস্থাও আরেকটি। সড়ক-মহাসড়কে দুরবস্থা সুষ্ঠু যোগাযোগের অন্তরায়। এতে শুধু পোশাক শিল্প নয়, যে কোনো শিল্প বা যে কোনো উন্নয়ন থমকে যায়। বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ কয়েকটি মহাসড়কের অংশকে নির্বিঘ্ন করতে অনুরোধ জানিয়েছে। তার মধ্যে টুঙ্গী-গাজীপুর রাস্তা সংস্কার, আশুলিয়া বাইপাইল ব্রিজ পর্যন্ত রাস্তা চার লাইনে উন্নীতকরণ। এ রাস্তাগুলোর উন্নয়নকাজ দ্রুত করা হলে পোশাকশিল্পের অন্যতম একটি প্রতিবন্ধকতা অনেকাংশে দূর হয়। যদিও রাস্তা সংস্কারের কাজ তত বেশি ব্যয় ও সময়াপেক্ষ নয়। তবে চার লাইনে উন্নীতকরণের কাজটি সময়াপেক্ষ বটে।

দেশে এর আগে প্রয়োজনীয় কয়টি রাস্তা চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে। হয়তো আশুলিয়ার রাস্তাটিও একসময় সরকার চার লেনে উন্নীত করবে। কিন্তু শিল্পমালিকদের দাবি, বৃহত্তর শিল্পের সংকটপূর্ণ সময়ে ওই রাস্তাটি যেন দ্রুত প্রকল্প আকারে নিয়ে বাস্তবায়ন করা হয়।

যে কোনো দেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিমানবন্দর অবিকল্প। আবার কোনো দেশের রাজধানীকেন্দ্রিক আন্ত্মর্জাতিক বিমানবন্দর সেই দেশের জাতীয় সম্মানেরও প্রতীক। এরকম বিমানবন্দরে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে- এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের জাতীয় পর্যায়ের বিমানবন্দরের সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিল্পমালিকরা। প্রশ্ন উঠতেই পারে, আবার সীমাবদ্ধতাও থাকতে পারে- এটা কোনো বিষয় নয়। বড় বিষয় হলো- শিল্পের স্বার্থে কিছু প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা। যেন বিমানবন্দর দিয়ে দ্রম্নত আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়; শিল্পমালিকরা আন্ত্মর্জাতিক হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরের যে সংস্কার প্রসত্মাব তুলেছেন তা দ্রম্নতই সমাধানের পদড়্গেপ নিতে হবে, জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নের ধারা সমুন্নত রাখতে। এর ফলে প্রতিযোগিতার বিশ্ববাজারে পণ্য রপ্তানিতে সড়্গমতা আরো বাড়বে। সব মিলিয়ে পোশাক খাত এখন যে ক্রান্ত্মিকাল অতিক্রম করছে, তা থেকে কিছুটা হলেও বেরিয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

আর প্রধান যে সমস্যা গ্যাস সংকট, তার সমাধানে সরকার বিকল্প চিন্ত্মা করে যে সিদ্ধান্ত্ম দিয়েছে, তাতে পোশাকশিল্পের প্রধান প্রতিবন্ধকতা অনেকটা দূর হওয়ারই কথা। রপ্তানিমুখী গুরম্নত্বপূর্ণ শিল্পের উৎপাদন ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে সরকারের বিকল্প সমাধানের পথ তৈরি করা- সত্যি সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। কারণ, পোশাকশিল্প নেহায়েত কোনো সাধারণ রপ্তানিশিল্প নয়। এ শিল্পের সঙ্গে তৃণমূলের অনেক মানুষের জীবন-জীবিকার সম্পর্ক। এ শহরমুখী শিল্পের প্রভাব গ্রামীণ অর্থনীতির সুগভীর প্রান্ত্মকে স্পর্শ করে। তার চেয়ে বড় কথা, এ শিল্পের লাখ লাখ কর্মীর মধ্যে ৪০ শতাংশ নারী; যাদের পারিবারিক উপার্জনের নির্ভরতা এখানেই কেন্দ্রভূত। এতো গেল এ শিল্প নিয়ে অভ্যন্ত্মরীণ বহুমুখী প্রসঙ্গে আলোচনা।

এবার আসা যাক আন্ত্মর্জাতিক পর্যায়ে এ শিল্পের অবস্থান বিষয়ে। বহু আগে পোশাককর্মীদের সফল শ্রম ও মালিকদের সুদড়্গ ব্যবস্থাপনা এ শিল্পকে বহির্বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে নিয়ে গেছে। সর্ব শীর্ষে রয়েছে উদীয়মান শিল্প-অর্থনীতির দেশ চীন। এর কাছাকাছি থাকার সাফল্য বিশ্বজুড়ে জাতিকে দিয়েছে স্বাতন্ত্র্য পরিচিতি। এখন উন্নত দেশের নামিদামি ব্রান্ডের শো-রম্নমগুলোতে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ লেখা’ পোশাক শোভা পায়। এ কারণে দেশের পোশাককর্মীদের কর্মদড়্গতা উন্নত দেশগুলোর পোশাকের বাজারে উচ্চ প্রশংসিত।

শুধু তাই নয়, সবার সম্মিলিত শ্রমের ফলাফল হিসেবে এ শিল্প থেকে দেশে আসছে সন্ত্মোষজনক বৈদেশিক মুদ্রা; যা আমাদের জাতীয় আয়কে করছে আরো সমৃদ্ধ।

নানা প্রতিকূলতায় দেশে অনেক গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক শ্রমিক বেকার হয়েছেন। আবার কিছু কারখানা ধুকছে। শিপমেন্ট বাতিল হচ্ছে। এসব কারখানার মালিকরা সময়মতো বেতন দিতে পারছেন না। এ কারণে বিজিএমইএ-এর কার্যালয়ে মাঝে মাঝে সমবেত হন শ্রমিকরা।

এ চিত্র কিন্তু নানা সংকটেরই একটি সমন্বিত রূপ। তাই এসব সংকটকে আর দীর্ঘ হতে দেয়া উচিত নয়। শুধু পণ্য উৎপাদন করেই লড়্গ্যে পৌঁছা যাবে না। লড়্গ্যে পৌঁছাতে হলে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। তাহলে বিদেশি বায়ারদের সঠিকভাবে সঠিক সময়ে পণ্য সরবরাহ করা যাবে।

আমাদের সাফল্যের চূড়া ধরে রাখতে হলে একে একে চলমান সব সংকটই দূর করতে হবে। সরকারকে অগ্রাধিকারভিত্তিক খাত বিবেচনায় নিয়ে সমস্যাগুলোর দ্রম্নত সমাধান করতে হবে। কোনোমতেই যেন এ সমস্যাগুলো প্রলম্বিত না নয়। সরকারকে স্মরণ রাখতে হবে, রাষ্ট্রীয় ব্যসত্মতায় যেন এসব সমস্যার মূল দাবিগুলো চাপা না পড়ে। এতে এ শিল্পে মাধ্যমে অর্জিত সমগ্র সাফল্যের ধারা রম্নদ্ধ হয়ে যেতে পারে।

সরকার শিল্পে গ্যাস সংকট মোকাবিলায় তরল গ্যাস এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও এটি সময়সাপেড়্গ বিষয়। তরল গ্যাস এলএনজি না আসা পর্যন্ত্ম এ সংকটের মোকাবিলায় সরকার আরো একটি বিকল্প চিন্ত্মা করেছে। এটা খুবই প্রশংসনীয় পদড়্গেপ। তবে এ উদ্যোগের সফল বাসত্মবায়ন হওয়া বাঞ্ছনীয়। এ শিল্পটি যেন সংকটের আবর্তে ঘুরপাক না খায়। সুষ্ঠু কর্মপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ সংকট মোকাবিলা করতেই হবে।

জ্বালানি গ্যাসের সঙ্গে শিল্প উৎপাদনের গভীর সম্পর্ক। আর এ সম্পর্ক ঠেকেছে গিয়ে জাতীয় অর্থনীতির প্রবাহে। গ্যাসের চাহিদা, সমস্যা ও সমাধানের পথ সবই সংশিস্নষ্টদের জানা। এই গ্যাসের সুষ্ঠু বিতরণে অবহেলা কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না। শিল্পমালিকরা চাই, আগের মতো নিরবচ্ছিন্ন বিতরণ। সরকারের দায়িত্ব এ জটিলতার উত্তরণ ঘটানো। আবারও বলতে হচ্ছে, আমাদের পোশাকশিল্প পুরোপুরি রপ্তানিনির্ভর। সেই পোশাকশিল্প যদি গ্যাস সংকটে ভোগে, তাহলে এ শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্ত্মা ক্রমেই গভীর হবে।

গার্মেন্টস শিল্পের স্বার্থে সরকারকেই এসব চিহ্নিত সমস্যার সমাধান জরম্নরিভাবে করতে হবে। এসব সংকট যত তাড়াতাড়ি দূর হবে, দেশের অর্থনীতির জন্য তা ততই মঙ্গল।

 

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]