প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সংকটে অলংকারশিল্পীরা: আড়াই দশকে পেশা ছেড়েছে ১৭ হাজার

 

জাকারিয়া পলাশ: বাংলাদেশের স্বর্ণালংকারের কারুকাজে মুগ্ধ কানাডার এক ক্রেতা। গত জুনে রাজধানীর মৌচাকের এক অলংকার ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কিছু স্যাম্পল নেন তিনি। পরে ওই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বেশ কিছু অলংকার কেনার প্রস্তাব দেন। কিন্তু পদ্ধতিগত জটিলতায় দেশে তৈরি অলংকার রফতানির এ সুযোগ কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

এমন নানা কারণে সংকটের মুখে রয়েছেন অলংকারশিল্পীরা। দক্ষ ও নিপুণ হাতের কারিগররাও ক্রমে ছেড়ে দিচ্ছেন এ পেশা। অনেকে পাড়ি জমাচ্ছেন বিদেশে। সমস্যা সমাধানে সোনা আমদানি ও রফতানির বিষয়ে উদারনীতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গবেষকরাও বলছেন সম্ভবনাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিতে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশ থেকে দক্ষ কারিগররা অনেকে চলে গেছেন। ওই কারিগরদের হাত ধরে পাশের দেশের কলকাতায় অলংকারশিল্প বেড়ে উঠছে। রাজধানীর তাঁতীবাজারের অলংকারশিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু ঢাকায় ২২ হাজার অলংকারশিল্পী ছিল ১৯৯০-দশকে। এখন মাত্র হাজার পাঁচেক কারিগর রয়েছেন।

স্বর্ণ শিল্পী সমিতির মহাসচিব দিনেশ চন্দ্র পাল শেয়ার বিজকে বলেন, জুয়েলারি সমিতি, বুলিয়ন অ্যাসোসিয়েশন ও স্বর্ণ শিল্পী সমিতি সবাই মিলেই সরকারের কাছে সোনা আমদানিতে সহজ নীতিমালা করার আহ্বান জানিয়ে আসছে। কিন্তু বাস্তবে কোনো নীতিমালাই হচ্ছে না। সোনার সরবরাহ কম হওয়ায় অলংকারশিল্পীরা কাজ পাচ্ছেন না।

কারিগররা জানান, তারা সাধারণত সব কাজই হাতে করে থাকেন। ছোট্ট একটা দোকানে একসঙ্গে কয়েকজন কারিগর বসে কাজ করেন। তাদের মজুরি দেওয়া হয় সোনার পরিমাণের ওপর। এক ভরি (১৬ আনা) সোনা থেকে গহনা বানালে শিল্পীরা পান দেড় আনা কমিশন (লস/খাদ)। ওই দেড় আনাই তাদের আয়। বেশি পরিমাণ সোনার কাজ পেলে তাদের কমিশন বাড়ে। কিন্তু এখন তেমন একটা কাজ আসে না। দেশের এ শিল্পীরা সরু সোনার চেইন ছাড়া প্রায় সব ধরনের জনপ্রিয় আইটেমই তৈরি করে থাকেন।

অলংকার রফতানির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, কাঁচা সোনা আমদানির ও অলংকার রফতানিতে নানা জটিলতা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সোনা আমদানিকে ‘সেনসিটিভ’ মনে করে। ফলে বিদেশে বিপুল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সুফল পাচ্ছে না বাংলাদেশ। অবশ্য প্রতিবেশী দেশে রয়েছে রতœ ও অলংকার রফতানি উন্নয়নের জন্য বিশেষ কাউন্সিল।

ভারতের রত্ন ও অলংকার রফতানি উন্নয়ন কাউন্সিলের তথ্যমতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশটি থেকে এ খাতে রফতানির পরিমাণ ৪০ বিলিয়ন ডলার, যা ১৯৮৪-৮৫ সালে ছিল ৭২ মিলিয়ন ডলার। তখন থেকেই দেশটি অলংকার রফতানির দিকে বিশেষ মনোযোগ দিয়ে আসছে।

এ বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান মনসুর শেয়ার বিজকে বলেন, বাংলাদেশের নীতি হচ্ছে সোনাবিদ্বেষী। আমরা বৈধভাবে সোনা আমদানি করতে দিচ্ছি না। আবার অবৈধভাবে আমাদের দেশ সোনা চোরাচালানের ট্রানজিট হিসেবে গড়ে উঠেছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবেই অলংকারের সূক্ষ্ম কারিগররা বেড়ে উঠেছিলেন। অথচ তাদের বিকশিত হতে দেওয়া হয়নি।’

উল্লেখ্য, সোনা রফতানির বিষয়ে জাতীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে কয়েক দশক আগে। ১৯৮৪-৮৫ সালে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর প্রতিনিধি ও অলংকারশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই, আবুধাবি এবং সৌদি আরবসহ বেশ কিছু দেশ সফর করে এসে ওই সব দেশে বাংলাদেশি অলংকারের ব্যাপক চাহিদা আছে বলে জানান। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘জুয়েলারি এক্সপোর্ট স্কিম’ নামে অলংকার রফতানির নিয়মকানুন করে। কিন্তু ওই স্কিম বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া আলোর মুখ দেখেনি।

আমদানিকারকদের সূত্রে জানা গেছে, দেশে বাণিজ্যিকভাবে আমদানির সুযোগ নেই। তারা মূলত বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে সোনা কেনেন। সাধারণত যে কোনো ব্যক্তি বিদেশ থেকে ২০০ গ্রাম কাঁচা সোনা বহন করে আনার সুযোগ পান। আর ‘অবৈধ’ পথেও সোনা আসে দেশে।

সোনার আমদানি-রফতানির বিষয়ে আরও উম্মক্ত হওয়ার পরামর্শ দিয়ে পিআরআই’র নির্বাহী পরিচালক আহসান মনসুর বলেন, ‘সোনার ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের চোলাচালানি মনে না করে সোনাকেও একটি পণ্য হিসেবে ভাবতে হবে। এটা একটা বিলাসদ্রব্য। এর বাণিজ্য উš§ুক্ত করলে ব্যবসা হবে। সরকার ট্যাক্স পাবে। আর ব্যবসায়ীরাও বিনিয়োগ করতে পারবে।’ তিনি বলেন, ‘অলংকারশিল্প একটি স্থায়ী শিল্প। সোনার চাহিদা হাজার হাজার বছর ধরেই রয়েছে। এ চাহিদা থাকবে। দিন দিন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে। জীবনযাত্রার মান বাড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে বিলাসপণ্যের প্রতি আগ্রহ। শিল্পের এ সম্ভাবনার দিকে মনোযোগী হলে আমাদের কারিগরদের দক্ষতাও বাড়বে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ জুয়েলারি প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারকদের সংগঠনের সভাপতি ও মৌচাকের আনারকলি সুপার মার্কেটের জেনারেল জুয়েলার্সের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন শেয়ার বিজকে জানান, হাতে তৈরি অলংকার তৈরিতে বাঙালি কারিগরদের পরিচিতি বিশ্বজোড়া। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের ১৯৯৩-৯৪ সালের তথ্যমতে, হাতে তৈরি অলংকারশিল্পীদের ৮০ শতাংশ ছিল বাঙালি। কিন্তু আমরা সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারছি না। আমরা দেশের বাজার থেকে অল্প পরিমাণ সোনা কিনে নিয়ে তা দিয়ে শিল্পীদের দিয়ে গহনা বানাই। তারপর তা রফতানির চেষ্টা করি। কিন্তু নানা কারণে তা আটকে আছে।

উল্লেখ্য, ১৯৮৬ সালের ক্ষুদ্র শিল্প উন্নয়ন ও সহায়তা সংস্থা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ‘বাংলাদেশের স্বর্ণালংকারের সমৃদ্ধি ও রফতানির সম্ভাব্যতা’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনটি ইউএসএআইডি’র রেফারেন্স লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত রয়েছে। প্রতিবেদন অনুসারে, শ্রমঘন এ অলংকারশিল্পে দুই-তিন লাখ শিল্পী বা আর্টিসান নিয়োজিত ছিল ১৯৮৫ সালে। ৩০ বছর আগের ওই গবেষণায় বলা হয়েছিল, সুদক্ষ কারিগরদের এ শৈল্পিক দক্ষতা কাজে লাগাতে দেশীয় বাজার ও চাহিদা যথেষ্ট নয়। এজন্য রফতানি উন্নয়নে মনোযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল সে সময়। কিন্তু বস্তুত তিন দশকেও অলংকার রফতানি বাড়েনি। শিল্পীরাও ক্রমে কাজ হারিয়ে পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।