সংকটে সহজে মিলছে  না সমাধান

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রতি বছর আমদানি ও রফতানির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাড়ছে বন্দরের কনটেইনার পরিবহনের হারও। কিন্তু গত এক দশকেও নির্মিত হয়নি নতুন কোনো জেটি, ইয়ার্ড কিংবা টার্মিনাল। প্রক্ষান্তরে কমছে বন্দরের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন যন্ত্রপাতির সরবরাহ। একই সময়ে বাড়েনি লাইটার জাহাজের সংখ্যা, উল্টো কমেছে। ফলে বন্দরের সক্ষমতা নিয়ে ভোগান্তি ও অসন্তোষে রয়েছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা। কিন্তু এসব সংকটে সমাধান সহজে মিলছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বন্দর ব্যবহারকারী ও আমদানি-রফতানিকারক বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বন্দরে জাহাজ জটের মূল কারণ অবকাঠামো সংকট। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বন্দর দিয়ে ২১ লাখ ৮৯ হাজার কনটেইনার পরিবহন হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ লাখ ১৯ হাজারে। যে পরিমাণ কনটেইনার পরিবহন বেড়েছে সেজন্য বছরে অন্তত একটি করে নতুন জেটি দরকার। অথচ ২০০৭ সালের পর বন্দরে সমুদ্রগামী কনটেইনার জাহাজের জন্য কোন জেটি নির্মাণ করা হয়নি। উল্টো ঈদের আগে দুর্ঘটনায় দুটি গ্যান্ট্রি ক্রেন (জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর যন্ত্র) অচল হয়ে পড়ায় একটি জেটির সুবিধা কমেছে।

অপরদিকে লাইটারেজ জাহাজের সংখ্যাও প্রতি বছরে কমেছে। এর মধ্যে নতুন জাহাজ নির্মাণও বন্ধ ছিল অনেক বছর। নতুন জাহাজ ও জেটির নির্মাণকাজ শুরু করা হলেও তা চালু করতে তিন বছরের বেশি সময় লাগবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। সামনে আরও ভয়াবহ জটের আশঙ্কা করছেন তারা। কারণ গত ৯ বছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহন বেড়েছে প্রায় ১১৫ শতাংশ। কিন্তু বারবার পরিকল্পনার কথা বলা হলেও এ সময়ে বন্দরে কোনো নতুন জেটি নির্মাণ হয়নি। আর এক বছরের চেয়ে অধিক সময় ধরে চলমান লাইটার সংকট কাটাতে জাহাজ আমদানির সুবিধার্থে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা চেয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, বন্দর ব্যবস্থাপনার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, জেটি ব্যবহারের হার ৬০ শতাংশের বেশি হলে বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন করে জেটি ও ইয়ার্ড নির্মাণ করতে হয়। তা করা না হলে সর্বোচ্চ ব্যবহারকালে (পিক পিরিয়ড) বন্দরে জাহাজ ও কনটেইনার জট সৃষ্টি হয়। চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থাপনায় এ মানদণ্ড অনুসৃত না হওয়ায় সৃষ্টি হচ্ছে জাহাজ জট। আর প্রয়োজনের তুলনায় জেটির সংখ্যা কম থাকায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয় কনটেইনারে কাঁচামাল আনা শিল্প-কারখানাগুলোকে। সাধারণ পণ্য সাগরে লাইটার জাহাজে স্থানান্তর করে খালাসের সুযোগ থাকলেও জেটি ছাড়া কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কোনো সুযোগ নেই। ফলে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল খালাসে সমস্যায় পড়তে হয় শিল্প মালিকদের।

বন্দরের পরিচালন তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরে ১৩টি কনটেইনার জেটির মধ্যে বর্তমানে গড়ে ১০টিতে জাহাজ ভেড়ানো যায়। আর সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজের জন্য জেটি রয়েছে ছয়টি। এর মধ্যে দুটি দীর্ঘদিন ধরে পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে জেটি সংকটে বহির্নোঙরে বাড়ছে অপেক্ষমাণ জাহাজের সংখ্যা। চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বোচ্চ ব্যবহারকালে প্রতিনিয়ত কনটেইনার ও সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজের জট থাকে।

নৌপরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালক কমোডর সৈয়দ আরিফুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক সময়গুলোতে লাইটারেজ জাহাজকে গুদাম হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ায় এ ভোগান্তি দেখা যাচ্ছে। এ কারণে সমস্যা বেড়েছে। লাইটার জাহাজ থেকে দ্রুত পণ্য খালাস হলে এ সমস্যা হতো না।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ক্রমবর্ধমান চাপকে সামাল দিতে এনসিটি (নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল) পুরোপুরি চালুর পাশাপাশি কর্ণফুলী কনটেইনার টার্মিনাল (কেসিটি) চালু করা জরুরি হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বে-টার্মিনাল চালুর ব্যাপারেও পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি একেএম শামসুজ্জামান বলেন, বহির্নোঙরে জাহাজের গড় অবস্থান ১৯ দিন। অথচ পুরো সক্ষমতা কাজে লাগানো গেলে গড় অবস্থানের সময় দু-তিন দিনে নামানো যাবে।

চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম খালেদ ইকবাল বলেন, পণ্য আমদানি বেড়ে গেছে, ফলে লাইটার জাহাজের সংকট তৈরি হয়েছে। লাইটার জাহাজ পরিচালনায় যে অবনতি তা অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। আগামী বছরের মার্চের মধ্যে সদরঘাটে নির্মিত পাঁচটি লাইটার জেটি চালু, আগস্টের মধ্যে পতেঙ্গায় তিনটি লাইটার জেটি নির্মাণ, লাইটার জাহাজের সংখ্যা বাড়ানোর পদক্ষেপ, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন কর্তৃক ঘাটে ঘাটে লাইটার জাহাজ থেকে সার খালাস ব্যবস্থা তদারকি, ঘাটে পণ্য খালাসে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু এবং নতুন লাইটার জাহাজ ব্যবহারের আওতায় আনা।

প্রসঙ্গত, দেশের সমুদ্রপথে কনটেইনার পরিবহনের ৯৮ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে করা হয়। এ বন্দরে সমস্যা হলে দেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। চট্টগ্রাম বন্দরের ১২টি জেটি ব্যবহার করে কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয়।

 

 


সর্বশেষ..