আজকের পত্রিকা দিনের খবর প্রথম পাতা বাণিজ্য সংবাদ সারা বাংলা

সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত হবে না

সচিবকে চেয়ারম্যানের চিঠি

নিজস্ব প্রতিবেদক: চলতি অর্থবছরের প্রথম থেকেই ঘাটতি পিছু ছাড়ছে না। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রতিমাসে আহরিত হওয়ার কথা ২৭ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। কিন্তু মার্চ পর্যন্ত গড়ে প্রতিমাসে আহরিত হয়েছে ১৮ হাজার ৩৩৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। আর এপ্রিল মাসে রাজস্ব আহরিত হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা। দেশে মার্চ থেকে করোনার প্রার্দুভাব শুরু হয়। ফলে মার্চ থেকেই ঘাটতির উল্লম্ফন শুরু হয়। আর এপ্রিলে এসে তা পাহাড়সম হয়ে দাঁড়ায়।

## আগামী অর্থবর বছর লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ১০ শতাংশ

## এপ্রিল মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৬৮৮ কোটি

## অতিরিক্ত লক্ষ্যমাত্রা মাঠ কর্মকর্তাদের মনোবল নষ্ট হয়

করোনার ফলে রাজস্ব আহরণের সব রাস্তায় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কবে সচল হবে তার কোন ঠিক নেই। অর্থবছর শেষ হতে মাত্র দু’মাস (মে-জুন) বাকি। মূল লক্ষ্যমাত্রা দূরে থাক, সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার ধারে কাছেও যেতে পারবে না ধারণা করছে এনবিআর। এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছে সম্প্রতি অর্থ সচিবকে চিঠি দিয়েছে এনবিআর চেয়ারম্যান। যদিও আগামী অর্থবছর চলতি অর্থবছরের তুলনায় আহরণ লক্ষ্যমাত্রা ১০ শতাংশ বাড়িয়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের কাজ শুরু করেছে অর্থমন্ত্রণালয়।

আরো পড়ুন-করোনার প্রথম মাসেই রাজস্ব নেই ১২ হাজার কোটি টাকা

আরো পড়ুন-রাজস্বে আশা দেখাবে সিগারেট, ঔষধ, সুপারশপ, মোবাইল

আরো পড়ুন-ভ্যাট রিটার্ন বেড়েছে ৩৪.৮১% আর রাজস্ব ২২.০৩%

১৪ মে এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালকুদারকে চিঠি দেয়। চিঠিতে রাজস্ব আহরণের চিত্র তুলে ধরেন। চিঠিতে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সংশয় জানিয়ে বলা হয়, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত হবে না। আর ২০২০-২১ অথর্বছরের জন্য এনবিআরের যে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে, তাও অর্জন করা সম্ভব হবে না।

এনবিআর সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছর রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। সে হিসেবে এনবিআরের প্রতিমাসে গড়ে ২৭ হাজার ১৩৩ কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের কথা। কিন্তু গত ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) এনবিআর গড়ে আহরণ করেছে প্রায় ১৮ হাজার ৩৩৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। তবে এপ্রিল মাসে আহরণ করেছে মাত্র ৭ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা। আর মার্চ মাসে আহরণ করেছে ১৯ হাজার ৩৬৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১১ হাজার ৯৫৫ কোটি ৩২ লাখ টাকা কম আদায় হয়।

সূত্র আরো জানায়, সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় চলতি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে ২৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা কমিয়ে ৩ লাখ ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করে। সেই সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এপ্রিল মাস পর্যন্ত আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৩৫ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা। সেখানে আদায় করা সম্ভব হয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা।

অর্থাৎ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা থেকেও ১০ মাসে প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় পিছিয়ে আছে। দশ মাসের রাজস্ব আহরণ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার ৭৪ শতাংশের কাছাকাছি। এই মহামারির মধ্যেও গত দশ মাসে যা আদায় হয়েছে, তা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১ হাজার ১০৯ কোটি টাকা বা দশমিক ৬৪ শতাংশ বেশি।

চিঠিতে এনবিআর উল্লেখ করেন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ হয়েছিল। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে তা হতে পারে বড় জোর ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরের মূল লক্ষ্যমাত্রা থেকে এনিবআরের আদায় কমবে ১ লাখ ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। আর সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে আদায় কমবে ৮০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

অপরদিকে, আগামী অর্থবছর চলতি অর্থবছরের চেয়ে লক্ষ্যমাত্রা ১০ শতাংশ বৃদ্ধি করে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা একরকম অসম্ভব বলে মনে করছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। রাজস্ব আহরণের সবচেয়ে বেশি মূসক থেকে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা। আয়কর থেকে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা, শুল্ক থেকে ৯৫ হাজার ২০ কোটি টাকা ও অন্যান্য খাত থেকে ১ হাজার ৪শ’ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার ৬৮ শতাংশই আশা করা হচ্ছে পরোক্ষ কর থেকে; যা চলতি অর্থবছর রয়েছে ৬৫ শতাংশ।

আগামী অর্থবছরের এ বিশাল লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান আশাবাদী নন বলে চিঠিতে উল্লেখ করেন এনবিআর চেয়ারম্যান। কারণ, ১ জুলাই থেকে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও স্থানীয় ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর তা বিরূপ প্রতিক্রিয়া রেখে যাবে। ফলে রাজস্ব আহরণের পথ সুগম না হলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়।

চিঠিতে বলা হয়, বর্তমান অর্থবছরের সম্ভাব্য আদায়ের ওপর আগের গড় প্রবৃদ্ধি ১৪ শতাংশ ধরে হিসাব করলেও আগামী অর্থবছরের মোট আহরণ ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি হবে। এনবিআর রাজস্ব সংগ্রহ করে মূল্য সংযোজন কর (মূসক), আয়কর ও শুল্ক—এ তিন খাত থেকে। এর মধ্যে মূসক থেকে ৯৭ হাজার ৫৯ কোটি, আয়কর থেকে ৭৯ হাজার ৭৪৯ কোটি এবং আমদানি শুল্ক থেকে ৭৩ হাজার ১৯২ কোটি টাকা আসতে পারে। আর চলতি অর্থবছরের ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূসক থেকে ৮৫ হাজার ৪১২ কোটি, আয়কর থেকে ৭০ হাজার ১৮০ কোটি এবং আমদানি শুল্ক থেকে ৬৪ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা আসতে পারে।

আরো বলা হয়, অতিরিক্ত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলে মাঠ পর্যায়ে রাজস্ব আহরণকারী কর্মকর্তাদের ওপর এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি হয়। অসম্ভব বিবেচনা করে অনেকে এক পর্যায়ে হাল ছেড়ে দেন। অনেক ক্ষেত্রে করদাতাদের ওপর হয়রানির অভিযোগও আসে। আর লক্ষ্যমাত্রা যৌক্তিক হলে রাজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্যে তা অর্জনের প্রচেষ্টা থাকে এবং লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কৃতিত্ব পাওয়ার অনুপ্রেরণা তৈরি হয়। লক্ষ্যমাত্রা যৌক্তিকীকরণের জন্য অর্থসচিবকে অনুরোধ জানান তিনি।

চেয়ারম্যান চিঠিতে বলেন, চলতি অর্থবছরের শুরুর দিকে নতুন মূসক আইন চালু ও অর্থনৈতিক গতিশীলতার কারণে রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধির আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু করোনাভাইরাস-জনিত মহামারি সামাজিক, রাজনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, কারও পক্ষেই তা বলা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ কর আহরণ ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিশ্বের সব মানুষের ভোগ-চাহিদার ওপর নির্ভরশীল।

আরো বলা হয়, স্থানীয় ভোগের চাহিদা কমলে আমদানি কমবে, শিল্প উৎপাদন কমলে কাঁচামাল যন্ত্রপাতির চাহিদা কমবে। এতে পরোক্ষ করের ওপর ব্যাপক ঋণাত্মক প্রভাব পড়বে। অন্যদিকে আয়বর্ধক কার্যক্রম কমলে এবং অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হলে কমবে প্রত্যক্ষ করও। এ ছাড়া নিকট আগামী সময়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বড় একটি অংশ জনগণের মৌলিক চাহিদা-সেবায় নিয়োজিত হবে। যার মধ্যে রয়েছে চিকিৎসা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, খাদ্য, শিক্ষা, আবাসন ও জনগণের নিরাপত্তা। এসব মৌলিক উৎপাদন, বিপণন, সরবরাহ ও সেবার বেশির ভাগই সম্পূর্ণ করমুক্ত বা ন্যূনতম করের আওতাধীন।

###

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..