প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

সংসদ সদস্য থেকে ভূমিদস্যু প্লট বিক্রির নামে প্রতারণা

মহাজোটের প্রভাব খাটিয়ে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে জমি দখল করে আবাসিক প্রকল্প গড়ে তোলেন সাবেক সংসদ সদস্য এমএ আউয়াল। সেই জমিতে প্লট বানিয়ে পুলিশ-সেনাবাহিনীসহ সরকারি পদস্থ কর্র্মকর্তাদের কাছে বিক্রি করেছেন। জমির মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব-মামলার কারণে প্লট কিনলেও মালিকানা ও দখল বুঝে পাচ্ছেন না সাধারণ ক্রেতারা। সে সঙ্গে একই প্লট একাধিক ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। সংসদ সদস্য থেকে এমএ আউয়ালের ভূমিদস্যু ও প্রতারক আবাসন ব্যবসায়ী হয়ে ওঠা নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিকের আজ প্রথম পর্ব

পলাশ শরিফ: কাগজে-কলমে হাভেলি প্রপার্টি ডেভেলপমেন্টের আশুলিয়া ও সাভারসহ তিনটি আবাসিক প্রকল্পের কথা বলা হয়েছে। বাস্তবে মিরপুরের আলীনগরেই ওই কোম্পানির একমাত্র প্রকল্প। আর সে প্রকল্পটিও ৯ বছরে পূর্ণতা পায়নি। কাগুজে প্রকল্পের সিংহভাগ জমি এখনও পরিত্যক্ত বিরানভূমি। যে কারণে স্বপ্নের আবাস গড়তে গিয়ে সাবেক সংসদ সদস্যের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে প্লট কিনে বিপাকে পড়েছেন ক্রেতারা। সে সঙ্গে একই প্লট একাধিক ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের কাছে বায়না-বিক্রির কারণে প্লটের মালিকানা-দখল নিয়েও নতুন করে আইনি জটিলতায় পড়তে হচ্ছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, মিরপুরের উত্তর কালশীতে হাভেলি প্রপার্টির আলীনগর আবাসন প্রকল্পে মাত্র একটি নির্মাণাধীন ভবন রয়েছে। ছয়তলার ওই ভবনটিতে পিলারের অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। নামফলকের তথ্যমতে, ওই প্লটের মালিক অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল ফজলুল হকের স্ত্রী শাহানা হক। তবে প্লটের মালিকানা পেতে শাহানা হককে আইনের আশ্রয় নিতে হয়েছে। মামলায় রায় পাওয়ার পর বিবাদী পক্ষ সে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে। হাভেলি প্রপার্টির কথিত ‘নিষ্কণ্টক’ প্লট কিনে দখল ও মালিকানা পেতে ওই ক্রেতাকে আইনি লড়াই করতে হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধু শাহানা হক নন, হাভেলি প্রপার্টির আলীনগর আবাসিক প্রকল্পের জমি কিনে দখল পেতে তার মতো অনেককেই ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এমনকি সাবেক সংসদ সদস্য এমএ আউয়াল একই প্লট একাধিক ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করেছেন বলেও তথ্য মিলেছে। প্রভাবশালীদের কারণে বছরের পর বছর ধরনা দিয়েও প্লটের মালিকানা-দখল কিংবা অর্থ ফেরত পাচ্ছেন না সাধারণ ক্রেতারা।
আবাসিক প্রকল্পের জন্য জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে জমি রেজিস্ট্রি ও সন্ত্রাসীদের সহায়তায় জমি দখলের অভিযোগ সম্পর্কে হাভেলি প্রপার্টি ডেভেলপমেন্টের দায়িত্বশীল কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির মিরপুর রোডে কলাবাগানের প্রধান কার্যালয়ে কয়েক দফায় যোগাযোগ করা হলে ‘এমডি এমএ আউয়াল অফিসে আসেননি’ বলে জানানো হয়েছে। তার ব্যক্তিগত দুটি সেলফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এসএমএস পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। মার্কেটিং কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে ‘রুবেল’ নামে একজন প্রশ্ন শোনার পর ‘আমি এ বিষয়ে এমডি স্যারের সঙ্গে কথা বলে আপনাকে জানাব’ বলে তিনি এ প্রতিবেদকের ফোন নম্বর রেখে দেন। কিন্তু এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো যোগাযোগ করা হয়নি।
এদিকে প্রায় ১০ কোটি টাকায় ওই প্রকল্পে দুটি ব্লকে প্লট আকারে প্রায় ১০ বিঘা জমি কেনার জন্য হাভেলি প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করেও প্লটের মালিকানা বা দখল পাননি এমন এক ব্যবসায়ী নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা ওই প্রকল্পে প্লট আকারে জমি কেনার জন্য কয়েক বছর আগে হাভেলি প্রপার্টির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে বায়না চুক্তি করি। সে অনুযায়ী প্লটের মূল্য বাবদ প্রায় চার কোটি টাকা অগ্রিমও জমা দিয়েছি। কিন্তু অদ্যাবধি সেই প্লট রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়নি। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তার কাছে ওই প্লটগুলো বিক্রি করা হয়েছে। এখন আবাসন কোম্পানিটি অগ্রিম টাকা ফেরত দিচ্ছে না। এমনকি জমা দেওয়া টাকার বিপরীতে চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত প্লটও বুঝিয়ে দিচ্ছে না।’
তথ্যমতে, আলীনগর আবাসিক প্রকল্পে প্লট কিনে বিপাকে পড়েছিলেন সরকারি এক পদস্থ কর্মকর্তা। জমির আগের মালিকের বিরোধিতা ও আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে টাকা নিয়ে প্লট বিক্রি করলেও এমএ আউয়াল তাকে জমি বুঝিয়ে দিতে পারেননি। পরে বাধ্য হয়ে জমির মূল মালিককে ম্যানেজ করে ওই প্লটের দখল নিয়েছেন তিনি। তবে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি এ বিষয়ে আর কিছু জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, মিরপুরের উত্তর কালশীর বাউনিয়া মৌজায় নিচু এলাকায় হাভেলি প্রপার্টির আলীনগর আবাসিক প্রকল্প। প্রকল্পের সামনে রয়েছে সাগুফতা হাউজিং। একদিকে মিরপুর ডিওএইচএস, আরেক প্রান্তে সিরামিক ফ্যাক্টরি সংলগ্ন বাজার। কাগজে-কলমে প্লট তৈরি ও বিক্রির গল্প শোনানো হলেও বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। ২০১০ সাল থেকে অদ্যাবধি নাম-সাইনবোর্ডসর্বস্ব ওই আবাসিক প্রকল্পটি পূর্ণতা পায়নি। আবাসন প্রকল্পের পুরো এলাকাজুড়ে শুধু ছোট-বড় দেয়ালঘেরা প্লট। যেগুলোর অধিকাংশই ঘাস-ঝোপঝাড়ে ভরা। এমনকি প্রকল্পের প্রবেশপথে সাইট অফিসের সাইনবোর্ডটির লেখাও মুছে গেছে। আর সিরামিক ফ্যাক্টরির দিকে প্রকল্প এলাকায় অর্ধশত বসতবাড়ি, বস্তি-ঝুপড়ি ঘর রয়েছে। পুরো এলাকায় আবাসন প্রকল্প বলতে বিক্ষিপ্তভাবে তিন-চারটি প্লটে আধাপাকা টিনশেড বাড়ি কিংবা দেয়াল দৃশ্যমান। দুটি স্থানে মুছতে বসা ‘আলীনগর আবাসিক প্রকল্প’ লেখা না দেখলে এটি যে একটি আবাসন প্রকল্পÑতা বোঝার কোনো উপায় নেই। এমনকি প্রকল্পের কিছু এলাকা এখনও জলমগ্ন, কচুরিপানায় ভরা। জমির মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব, মামলা এবং একই প্লট একাধিক ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করায় মুখ থুবড়ে পড়েছে হাভেলির একমাত্র প্রকল্পটি।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর শূন্য হওয়া লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনে উপনির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী হয়ে এমএ আউয়াল প্রথমবার সংসদ সদস্য হন। তরিকত ফেডারেশনের প্রার্থী হিসেবে মহাজোটের মনোনয়ন পেয়েছিলেন তিনি। ২০১৮ সালে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিবের পদ হারান, দল থেকেও বহিষ্কৃত হন। এরপর জাকের পার্টির হয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হন। কিন্তু ঋণখেলাপির অভিযোগে তার প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়। সংসদ সদস্য হওয়ার আগে থেকেই তিনি একজন ব্যবসায়ী। আইন প্রণেতা হওয়ার পরও নিয়ম-আইন ভঙ্গের কারণে একাধিকবার আলোচনায় এসেছেন। কিন্তু আবাসিক প্রকল্পের নামে সাবেক আইন প্রণেতা এমএ আউয়ালের আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডের রোমহর্ষক গল্প এখনও লোকচক্ষুর অন্তরালে।

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..