প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

সই নকল করে রাসায়নিক পরীক্ষার ফল পরিবর্তনের চেষ্টা

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস

সাইদ সবুজ, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে অভিনব কায়দায় সই জাল করে রাসায়নিক পরীক্ষার ফল পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে কিছু অসাধু আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। এতে মিথ্যা ঘোষণায় আনা ছয়টি পণ্যের রাসায়নিক পরীক্ষার রিপোর্ট ছিল। আর এসব রিপোর্ট পরিবর্তন করে কম শুল্কে পণ্য ছাড় করে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল আমদানিকারকদের। কিন্তু রাসায়নিক পরীক্ষাগারে প্রকৃত ফলাফল সংরক্ষিত থাকায় শেষ রক্ষা হয়নি জড়িতদের।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস সূত্রে জানা যায়, পাঁচটি বিল অব এন্ট্রিতে ছয়টি রাসায়নিক পরীক্ষার রিপোর্ট পরিবর্তন করে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। এর মধ্যে জুন মাসে একটি ও জুলাই মাসে পাঁচটি পরীক্ষার রিপোর্ট পরিবর্তন করে তারা। এসব বিল অব এন্ট্রিতে তৈরি পোশাক খাতে ব্যবহারের জন্য বন্ড সুবিধার আওতায় বিভিন্ন ধরনের কাপড় আমদানি করার কথা। কিন্তু আমদানিকারক বন্ড সুবিধা পাবে না, এমন মিথ্যা ঘোষণায় অন্য কাপড় নিয়ে আসে। ফলে স্বল্প শুল্কে পণ্য খালাসের জন্য এই অভিনব জালজালিয়াতির আশ্রয় নেয় তারা।
চলতি বছরের মে মাসে পাঁচটি চালান চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। এরপর কাস্টম হাউসের সংশ্লিষ্ট শাখা নিয়ম অনুযায়ী আমদানি পণ্যের নমুনা পরীক্ষার জন্য রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠায়। কিন্তু আমদানিকারক বন্ড সুবিধার আওতায় ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আমদানি করে। তখন রাসায়নিক পরীক্ষায় মিথ্যা ঘোষণার বিষয়টি প্রকাশ এবং শুল্ক ও জরিমানার আশঙ্কায় জালজালিয়াতির আশ্রয় নেয় আমদানিকারক। প্রথম জালিয়তিটি করে ২৩ জুন। ওই দিন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাসায়নিক পরীক্ষাগার থেকে একটি নমুনার রাসায়নিক পরীক্ষার রিপোর্ট আমদানিকারক অর্থাৎ সিঅ্যান্ডএফকে দেওয়া হয়। কিন্তু রাসায়নিক পরীক্ষাগার থেকে বের হয়ে নমুনা শাখায় যাওয়ার মধ্যখানেই এ আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ সুকৌশলে রাসায়নিক পরীক্ষার ফল পরিবর্তন করে ফেলে, যদিও রাসায়নিক পরীক্ষাগার ও নমুনা শাখা একই ফ্লোরে; ব্যবধানও মাত্র কয়েক ফুট দূরত্বে। কিন্তু তারা রাসায়নিক পরীক্ষকের সই জাল করে আগে থেকে তৈরি করে রাখে রিপোর্ট আর সুকৌশলে মূল রিপোর্টটি বাদ দিয়ে নিজেদের করা ভুয়া রিপোর্ট সংযোজন করে দেয় ফাইলে। ঠিক একই কায়দায় জুলাই মাসের ১, ২ ও ৮ তারিখে আরও পাঁচটি রাসায়নিক পরীক্ষার রিপোর্ট পরিবর্তন করে এ চক্র। তারপর ওই আমদানিকারকরা সংশ্লিষ্ট আমদানি শাখায় রিপোর্ট উপস্থাপন করলে কাস্টমস কর্তাদের ওইসব রিপোর্ট নিয়ে সন্দেহ হয়। এরপর রাসায়নিক পরীক্ষাগারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান এসব রিপোর্ট তাদের করা নয় এবং সই ও রিপোর্ট দুটোই ভুয়া। কারণ রাসায়নিক পরীক্ষাগারের কম্পিউটারে যত্নসহ রিপোর্টগুলো সংরক্ষণ করা হয়। এতে বাইরের কেউ রিপোর্ট পরিবর্তন করলেও মূল কপি পরিবর্তন করা আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফের পক্ষে সম্ভব নয়।
এসব জালিয়াতি করে এএমএইচ অ্যাপারেলস লিমিটেড ও নাছরিন জামান কিন্টওয়্যারস লিমিটেড নামের দুই আমদানিকারক। আর তাদের সহযোগী সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছে এসএ চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি, এইচএ ইন্টারন্যাশনাল ও তানিয়া কার্গো সার্ভিস। দুই আমদানিকারকই তিনটি করে নমুনা জাল করে। আর দুই আমদানিকারকের দুটি করে চারটি চালান খালাসের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের দায়িত্বে ছিল এসএ চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি। আর এইসএ ইন্টারন্যাশানাল ও এসএ চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি একটি করে চালান খালাসের দায়িত্বে ছিল।
এ বিষয়ে কাস্টম হাউসের রাসায়নিক পরীক্ষাগারের পরীক্ষক আবদুল হান্নান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘অভিনব কায়দায় সুকৌশলে এসব আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ মিলে আমার সই জাল করে মাল খালাসের চেষ্টা করে। কিন্তু কাস্টমস কর্মকর্তাদের তৎপরতায় জালিয়াতি ধরা পড়ে। তবে আমাদের কাছে মূল রিপোর্ট সংরক্ষণ থাকে, ফলে আমদানিকারক আথবা সিঅ্যান্ডএফ চাইলেও মূল কপি পরিবর্তন করতে পারবে না। আর বর্তমানে রাসায়নিক পরীক্ষার রিপোর্ট অনলাইনে দেওয়া হচ্ছে। এটা জালিয়াতি রোধে কাজ করবে। তবে এই জালিয়াতির সঙ্গে যারা জড়িত তাদের মধ্যে পরস্পর যোগসাজশ রয়েছে। এসব জালিয়াতিকারীদের আইনের আওতায় এনে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’
কাস্টমস কমিশনার ফখরুল আলম এ প্রসঙ্গে শেয়ার বিজকে বলেন, ‘কয়েকটি জালিয়াতির বিষয় ইতোমধ্যে ধরা পড়েছে। আমরা তদন্ত করে দেখছি, এর বাইরে আরও আছে কি না। যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। কাস্টমস আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ট্যাগ »

সর্বশেষ..