মত-বিশ্লেষণ

সচেতনতাই অটিজম সমস্যার একমাত্র সমাধান

লিপিকা আফরোজ : সিরাজগঞ্জ শহরের বাহিরগোলা আবাসিক এলাকায় ১৯৯২ সালে আবিরের জন্ম। জন্মের পরপরই মা-বাবা বুঝতে পারেন আবির স্বাভাবিকভাবে খাবার গ্রহণ করছে না, ঘুমের সমস্যাও দৃশ্যমান। দুই বছর বয়সে প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হয় আবির। জ্বর থেকে সেরে উঠে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি আবির। কিছুদিনের মধ্যে তারা বুঝতে পারেন, ওর শারীরিক বিকাশ ও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার ক্ষেত্রে কিছুটা অস্বাভাবিকতা বিদ্যমান। চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে নেওয়া হলে ডাক্তার জানান, সে অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারে (এএসডি) আক্রান্ত। সেই থেকে আবিরের প্রতি বাড়তি যতœ নেওয়া শুরু করেন ওর মা-বাবা। বর্তমানে আবির একটি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী স্কুলের ছাত্র। সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত জাতীয় চিত্রাঙ্কণ প্রতিযোগিতায় এ বছর প্রথম স্থান অধিকার করেছে সে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এক লাখ টাকা আর্থিক অনুদান ও সার্টিফিকেট গ্রহণ করেছে আবির। এই সাফল্য বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সব শিশুর জন্য অনুপ্রেরণার  উৎস। 

অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার (এএসডি) একটি জটিল স্নায়বিক বিকাশ-সংক্রান্ত রোগের শ্রেণি, যা ব্যক্তির সামাজিক যোগাযোগগত ও আচরণগত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এটা মস্তিষ্কের একটি রোগ, যা সাধারণত কথা বলার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। ১৯৪৩ সালে আমেরিকার মনোরোগ বিশেষজ্ঞ লিও ক্যানার সর্বপ্রথম মনস্তাত্ত্বিক সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে রোগটি শনাক্ত করেন এবং অটিজম শব্দটি ব্যবহার করেন। 

এএসডির লক্ষণগুলো সাধারণত তিন বছর বয়স বা তার আগে প্রকাশ পেয়ে থাকে এবং শেষ জীবন পর্যন্ত থাকতে পারে, যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপসর্গ কমে যেতে পারে। অধিকাংশ এএসডি-আক্রান্ত শিশুর জীবনে প্রথম কয়েক মাসের মধ্যেই ভবিষ্যতে সমস্যার সংকেত দেখা যায়। অন্যদের মধ্যে ২৪ মাস বা তার পরেও উপসর্গ দেখা যেতে পারে। এএসডি হওয়ার সঠিক কারণ এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। ধারণা করা হয় যে গর্ভাবস্থায় ভাইরাল ইনফেকশন বা জেনেটিক এবং পরিবেশগত কারণের জন্য এই রোগ হয়ে থাকে।

এএসডি আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের মস্তিষ্কের সেরোটোনিন বা অন্যান্য নিউরোট্রান্সমিটার অস্বাভাবিক মাত্রায় থাকে। এসব অস্বাভাবিকতা ধারণা দেয় যে ভ্রুণ বৃদ্ধির প্রারম্ভিক অবস্থায় মস্তিস্কের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে এই সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারের মূল লক্ষণ হলোÑসামাজিক বা পারিবারিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে অসংগতি।

ভাষাগত দক্ষতার অভাব, বিলম্ব বা দেরিতে ভাষাগত দক্ষতা লাভ, একই শব্দ বা কথা বারবার উচ্চারণ, পূর্ণ বাক্যের পরিবর্তে একটি করে শব্দ উচ্চারণ প্রভৃতি লক্ষণও অটিজমের ক্ষেত্রে দেখা যায়। প্রতিক্রিয়া প্রকাশের ক্ষেত্রে দেখা যায়, এএসডি-আক্রান্ত শিশুরা নিজের নাম শুনলে সেভাবে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে না, পরিবারের কেউ আদর করলে সেক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া দেখায় না, বা কোনো কিছু করতে বলা হলে এর বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখায়। এ ধরনের শিশুরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অন্যের উপস্থিতি সম্পর্কে উদাসীন থাকে, সমবয়সিদের সঙ্গে সময় কাটাতে অনীহা প্রকাশ করে, কোনো  অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণে অনাগ্রহ দেখায়, অন্যের সংসর্গ পছন্দ করে না, বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে মনোভাব প্রকাশ করে এবং অন্যের দিকে সরাসরি তাকানো থেকে বিরত থাকে। তারা কোনো নির্দিষ্ট খাবারের প্রতি বিশেষ আসক্তি, খাবারের ক্ষেত্রে রং বা বর্ণকে প্রাধান্য দেওয়া এবং অস্বাভাবিক ঘ্রাণ গ্রহণে আসক্তি প্রকাশ করে থাকে।

এছাড়া এএসডি আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে শেখার অক্ষমতা, মনোযোগের অভাব, মৃগী রোগ, অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজঅর্ডার, ডিস্প্রেক্সিয়া (স্বাভাবিক বিকাশ রোধ), দুশ্চিন্তা, বিষণœতা, বাইপোলার ডিজঅর্ডার (হঠাৎ ও ঘনঘন মনের ভাব পরিবর্তন), ঘুমের সমস্যা প্রভৃতি দেখা যায়। নিয়মিত চিকিৎসা, ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চলা, সঠিক যতœ এবং পর্যাপ্ত কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে অটিজমে আক্রান্ত শিশুকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে এই রোগ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে আরোগযোগ্য নয়। চিকিৎসায় যাই হোক না কেন এই রোগ যেন না হয় সেদিকে সবার লক্ষ রাখা উচিত। অটিজম প্রতিরোধে বেশি বয়সে বাচ্চা নেওয়া থেকে বিরত থাকা, গর্ভধারণের আগে মায়েদের রুবেলা ভেকসিন নেওয়া, গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ খাওয়া থেকে বিরত থাকা, গর্ভাবস্থায় ধূমপান, অ্যালকোহল ও পান-জর্দা খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। এছাড়া বাচ্চাকে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে হবে এবং শিশুর ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। পরিকল্পিতভাবে গর্ভধারণ করতে হবে, গর্ভাবস্থায় দুশ্চিন্তা না করে পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নিতে হবে, সর্বোপরি প্রসব-পরবর্তীকালে শিশুর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে।

অটিজমে আক্রান্ত শিশুর পরিচর্যায় তার খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। গমজাতীয় খাবার, দুধ, সুগার ইত্যাদি খাবার কম খাওয়া উচিত। আস্তে আস্তে বাচ্চাকে সামাজিকতা শেখাতে হবে, যাতে সে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে পারে। সে যা করতে চায়, তাকে সেটা করতে দেওয়া উচিত। প্রচুর ঘোরাঘুরি করানো উচিত। সুন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে সবকিছু বোঝাতে হবে।

কোনো শিশু অটিজমে আক্রান্ত মনে হলে দ্রুত এ বিষয়ে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রাথমিক অবস্থায় অটিজম নির্ণয় করতে পারলে এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা নিলে অটিজম বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিজিজের ক্ষতিকারক প্রতিক্রিয়াগুলো থেকে অনেকাংশে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। শিশুর কী ধরনের অস্বাভাবিকতা আছে, সেটা সঠিকভাবে নির্ণয় করে নির্দিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা করালে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব। অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের জন্য প্রচুর বিশেষায়িত স্কুল আছে, যেখানে তাদের বিশেষভাবে শিক্ষাদান করা হয়। এ ধরনের স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্টের পরামর্শ নিতে হবে। তিনি পরামর্শ দেবেনÑকোন ধরনের স্কুল অটিস্টিক শিশুর জন্য উপযুক্ত হবে। এছাড়া শিশুর সমস্যাভেদে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ দেওয়া হয়ে থাকে।

পরিমিত পরিচর্যা, স্কুলভিত্তিক প্রশিক্ষণ, সঠিক স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রয়োজনে সঠিক ওষুধের ব্যবহার শিশুর অটিজমের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে অনেকখানি সহায়ক ভূমিকা রাখে। এছাড়া যথাযথভাবে সচেতনতার সৃষ্টি ও জ্ঞানলাভের মাধ্যমে অটিস্টিক/অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত শিশুদের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠা ও বিকাশ লাভ নিশ্চিত করা যেতে পারে।

অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুর/ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিশ্চিত করতে সরকার এর আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে। যেমন অটিজম, ডাউন সিনড্রোম, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা ও সেরিব্রাল পালসি-আক্রান্ত ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষায় ২০১৩ সালে নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন, ২০১৩; প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ এবং বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন, ২০১৮’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনটির ফলে দেশের বিদ্যমান প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কিংবা দুর্ঘটনার ফলে পঙ্গুত্ববরণকারী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি পুনর্বাসন প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে। এছাড়া ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার-বিষয়ক কর্মপরিকল্পনা, ২০১৯’ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

বর্তমান সরকার অটিজম স্পেকট্রাম ডিজিজ নিয়ন্ত্রণ এবং এতে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে বেশকিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। এরই মধ্যে সারা দেশের ৬৪ জেলায় মোট ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। প্রত্যেকটি কেন্দ্রে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা-সংবলিত সুসজ্জিত একটি করে অটিজম সেন্টার চালু করা হয়েছে। এখানে অটিস্টিক শিশুদের প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছারা সারা দেশে ৩২টি মোবাইল থেরাপি ভ্যানের মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের চিকিৎসা ও থেরাপির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে এএসডি-আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে। এর মধ্যে ইনস্টিটিউট ফর পেডিয়াট্রিক নিওরোসায়েন্স অ্যান্ড অটিজম (ইপনা), বাংলাদেশ ডাউন সিনড্রোম অ্যাসোসিয়েশন, সূচনা ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, স্কুল ফর গিফটেড চিলড্রেন, তরি ফাউন্ডেশন, অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন, বঙ্গবন্ধু কমিউনিটি ক্লিনিক, বাংলাদেশ এবিএ সেন্টার ফর অটিজম প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ ভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন। এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অটিজম স্পেকট্রাম ডিজিজে আক্রান্ত। এ বিপুল জনগোষ্ঠীকে উপেক্ষা করে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। রূপকল্প: ২০২১, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট, রূপকল্প: ২০৪১ এবং ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন করে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে সব শ্রেণিপেশার মানুষকে নিয়েই উন্নয়ন ঘটাতে হবে। প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে উপযুক্ত কাউন্সেলিং, পুনর্বাসন, প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্তকরণের মাধ্যমেই সম্ভব সমন্বিত উন্নয়ন। আবিরের মতো প্রত্যেকটি শিশু তার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে মেধা বিকাশের সুযোগ পাবে এবং দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হবে এমন প্রত্যাশা সবার। মা-বাবার সচেতনতা ও আন্তরিক সহযোগিতাই এক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালনে সক্ষম।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..