প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সঞ্চয়পত্রের মুনাফা পুনর্নির্ধারণ ও কিছু প্রাসঙ্গিক বিবেচনা

 

জাকারিয়া চৌধুরী: সংবাদপত্রের খবরে প্রকাশ, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণে শিগগিরই বৈঠক হবে এ কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এমন কিছু যে সরকারের বিবেচনাধীন, সে কথা অবশ্য আগেই জানা গেছে অর্থমন্ত্রীর নানা বক্তব্যে। ‘শিগগিরই বৈঠক হবে’ অর্থমন্ত্রীর এ বক্তব্যে স্পষ্ট, এতদিন যে আভাস দেওয়া হয়েছিল, এবার সেটা বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে সরকার। তবে এটি কবে থেকে বাস্তবায়ন হবে ও মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণ কীভাবে করা হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। সংবাদপত্রে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের বরাত দিয়ে যে খবর প্রকাশ হয়েছে, তা থেকে ধারণা করা যায়, এ হার হবে আগের চেয়ে কম ও ব্যাংকের মেয়াদি আমানতের মুনাফার সঙ্গে এর খুব বেশি ব্যবধান থাকবে না।

অর্থমন্ত্রীর এমন বক্তব্য উদ্বেগ ছড়িয়েছে স্বভাবতই। কারণ দেশের মধ্যবিত্ত, নি¤œ-মধ্যবিত্ত, প্রবীণ নাগরিক ও পেনশনভোগীদের বড় একটি অংশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভরশীল। তারা উদ্বিগ্ন এ কারণে যে, সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন হলে মুনাফা বাবদ আয় কমে যাবে। সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জনজীবনে বেড়ে গেছে ভোগান্তি। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে আয় কমে যাওয়ায় মুনাফার ওপর নির্ভরশীলদের ভোগান্তি উঠবে চরমে। মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণে নীতিনির্ধারকরা যেন ‘সুবিবেচনা’র পরিচয় দেন, সে দাবিও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

অনেকের জানা, অন্তত দুটি কারণে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে সরকারকে। মুনাফা পরিশোধ বাবদ সরকারি ব্যয় কমানো ও সঞ্চয়পত্রের মুনাফা অপেক্ষাকৃত বেশি হওয়ায় দেশের আর্থিক খাতে যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছে, তার অবসান ঘটানো। মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণে বিভিন্ন মহল থেকে ‘সুবিবেচনার’ যে দাবি তোলা হয়েছে, সেটাকেও অমূলক বলা যাবে না। কারণ আমাদের দেশে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী এখনও অতটা সুসংহত নয়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার জন্য মানুষ এখনও ব্যক্তিউদ্যোগ ও পরিবারের ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সামাজিক নিরাপত্তামূলক কিছু কর্মসূচি থাকলেও সেগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন নেই। কোনোটিতে অর্থের অভাব, কোনোটিতে অভাব জনবল ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর। এ কারণে আয় কমার মতো কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেই তা মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছড়ায়।

এ অবস্থায় স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, সরকার তাহলে কী করবে? বাড়তি মুনাফা পরিশোধ করে ব্যয় বৃদ্ধি অব্যাহত রাখবে; নাকি পদ্ধতিগত কিছু পরিবর্তন এনে সেটা কমাবে? একই সঙ্গে এ প্রশ্নও উঠবেÑসঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার অপেক্ষাকৃত বেশি হওয়ায় দেশের আর্থিক খাতে যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছে, সেটাকে প্রলম্বিত করা কী সুবিবেচনাপ্রসূত?

সঞ্চয়পত্রে মুনাফা পরিশোধ বাবদ সরকারের ব্যয় যে বেড়ে উঠেছে, সেটা স্বীকার্য। তবে এক্ষেত্রেও কথা আছে। কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, বাজেটে বিদেশি উৎস থেকে (ঋণ ও অনুদান) অর্থায়নের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, তা পূরণ হচ্ছে না। এ লক্ষ্য সরকার পূরণ করছে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কিংবা সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে। মুনাফার হার বেশি থাকা ও নির্ধারিত সময়ে টার্গেটের বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হওয়ায় এখান থেকে টাকা নিতে সরকারকে খুব বেগ পেতে হয়নি। মুনাফার হার কমানো হলে এর বিক্রির গতিতে যে কিছুটা হলেও ভাটা পড়বেÑসে ব্যাপারে সন্দেহ নেই।

পদ্ধতিগত কিছু কারণে দাতা দেশ ও সংস্থাগুলো ঋণ বা অনুদান আগের তুলনায় কম দিচ্ছে বাংলাদেশকে। যে প্রতিশ্রুতি পাওয়া যাচ্ছে, অর্থ ছাড় হচ্ছে তার অনেক কম। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) বিদায়ী অর্থবছরের সাময়িক যে হিসাব চূড়ান্ত করেছে, তা থেকে জানা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সব মিলিয়ে ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা পাওয়ার কথা ছিল প্রায় সাড়ে ৬০০ কোটি ডলার। সেখানে ঋণ হিসেবে পাওয়া গেছে ৩০৬ কোটি ৪৪ লাখ ডলার আর অনুদান হিসেবে ৩৩ কোটি ১৬ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরে ঋণ পাওয়া গিয়েছিল ৩০৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার ও অনুদান ৫৩ কোটি ডলার। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিদেশি সহায়তার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭২০ কোটি ডলার। এটি আদৌ পাওয়া যাবে কিনা, সে ব্যাপারে প্রশ্ন উঠেছে এরই মধ্যে। এ অবস্থায় সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমানো হলে প্রয়োজনে এখান থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার বিষয়টিও কী ঝুঁকিতে পড়বে না?

অনেকে মনে করেন, সরকার যে ঋণ নেয়Ñএটা বিদেশ থেকে নেওয়ার তুলনায় অভ্যন্তরীণ খাত থেকে নেওয়াই ভালো। বিদেশ থেকে যে ঋণ নেওয়া হয়, সেটা পরিশোধ করতে হয় বৈদেশিক মুদ্রায়, বিশেষত ডলারে। এর কোনো কোনোটি নেওয়া হয় কঠিন শর্ত ও উচ্চ সুদে। সেক্ষেত্রে ঋণদানকারী দেশ ও সংস্থার শর্ত পালন করতে কখনও কখনও জনবিরোধী পদক্ষেপ নিতে হয় সরকারকে; আবার কখনও করতে হয় অপ্রয়োজনীয় ক্রয়। ডলারের বিপরীতে টাকার মান সুনির্দিষ্ট নয়। সময় সময় এটি ওঠানামা করে। টাকার মান কমে গেলে ঋণ পরিশোধ বাবদ ব্যয় বেড়ে যায় সরকারের। আয়ের তুলনায় আমদানি বিল ও ঋণ পরিশোধ বাবদ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় বেড়ে গেলে ব্যালান্স অব পেমেন্টে সৃষ্টি হয় ভারসাম্যহীনতা। এজন্য বৈদেশিক ঋণকে নিরুৎসাহিত করেন অনেক অর্থনীতিবিদ। এর ভিন্নমতও রয়েছে। অনেকে এটাকে দেখেন সরকারের কূটনৈতিক সক্ষমতা হিসেবে। দেশে বৈদেশিক মুদ্রার অন্তর্মুখী প্রবাহে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে যে কিছু ইতিবাচক প্রভাব পড়ে, সেটাও অস্বীকার করা যাবে না।

চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাজেট নিয়ে যে এলোমেলো অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তাতে এটি মোটামুটিভাবে বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারকে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে বাজেটে পেশ করা নির্ধারিত অংকের তুলনায় অনেক বেশি ঋণ নিতে হবে বলে মনে হচ্ছে। ব্যাংক খাতে এখন অলস অর্থ প্রচুর। সরকার চাইলে সেখান থেকে নিতে পারবে। ব্যাংকগুলোও সরকারকে টাকা দিতে প্রস্তুত। কারণ এ ঋণ খেলাপি হওয়ার শঙ্কা নেই। তবে মনে রাখতে হবে, এ খাত থেকে ঋণ নিলে সামাজিক নিরাপত্তায় তা বাড়তি কোনো ভ্যালু যোগ করে না; যেটা করা যায় সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে। এজন্য ‘এক ঢিলে দুই পাখি’ মারতে হলে সরকারকে নির্ভর করতে হবে সঞ্চয়পত্র বিক্রির ওপর।

এজন্য বাজারে সঞ্চয়পত্রের চাহিদা স্বাভাবিক রাখতে এর সুদের হার বা মুনাফা এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে এটি কেনায় মানুষ উৎসাহ হারিয়ে না ফেলে। অনেকে বলতে পারেন, এটি কেনায় লোকে উৎসাহ হারাবে না। কারণ এতে বিনিয়োগে কর রেয়াতের ব্যবস্থা রয়েছে। মনে রাখা দরকার, কর রেয়াত প্রাপ্তির আশায় সঞ্চয়পত্র যারা ক্রয় করেন, তারা মূলত সচ্ছল ব্যক্তি। এজন্য নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীকে সামাজিক নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি চাহিদা অনুযায়ী অর্থ যদি তুলতে হয়, তাহলে সেটা করতে হবে মুনাফার হার উৎসাহব্যঞ্জক পর্যায়ে রাখার মাধ্যমেÑকর রেয়াত দিয়ে নয়।

অর্থমন্ত্রী অবশ্য একরকম নিশ্চয়তা দিয়েছেন, এমন কিছু করা হবে নাÑযাতে মধ্যবিত্ত, নি¤œ-মধ্যবিত্ত ও পেনশনভোগীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ বক্তব্যে অনেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও মুনাফা কমানোর ইঙ্গিত থাকায় কারও কারও মনের অস্বস্তি দূর হয়নি। এদের ব্যাপারে ‘সুবিবেচনা’ যদি করা না হয়, তাহলে সঞ্চয়পত্র বিক্রির উদ্দেশ্য এক দিক থেকে ব্যাহত হবে। এজন্য বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠীর জন্য ‘স্পেশাল স্কিম’ রাখা যেতে পারে। অন্যরা যাতে এ ধরনের স্কিমের সুযোগ নিতে না পারে, খেয়াল রাখতে হবে সেদিকেও। বস্তুত এজন্য দরকার সঞ্চয়পত্র ক্রয়কারী সম্পর্কে সঠিক তথ্য। জানা যাচ্ছে, এক্ষেত্রে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে আমাদের জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের। অর্থমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন, এটি বিক্রি হচ্ছে দেশের প্রায় ১৭ হাজার আউটলেটে। এজন্য কিছুটা সময় লাগবে। বাস্তবতা হলো, মুনাফার হার কমানোর পাশাপাশি তথ্যভাণ্ডার ঠিক না করেই যদি বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর জন্য স্পেশাল স্কিম চালু করা হয়, তাহলে এ সুবিধার বাইরে থাকা মানুষ অনৈতিকভাবে এখান থেকে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে। সঠিক তথ্য সংশ্লিষ্টদের হাতে না থাকায় সেটা ঠেকানোও হয়ে পড়বে মুশকিল।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকারকে একটি হিসাব করতে হবে বিদেশি ঋণ ও সহায়তার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা থেকে কী পরিমাণ পাওয়া যাবে ও কত সংগ্রহ করতে হবে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে। বিদেশ ও অভ্যন্তরীণ খাত থেকে নেওয়া ঋণে ব্যয়ের ব্যবধান কত। এ হিসাব কষেই পুনর্নির্ধারণ করতে হবে সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার। তাহলে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা যেমন নির্বিঘ্নে পূরণ হবে, তেমনি সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভরশীল মানুষের স্বার্থও রক্ষা করা যাবে।

অনেকে বলছেন, সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার কমলে পুঁজিবাজারে নতুন বিনিয়োগ আসবে। তাতে গতিসঞ্চার হবে বাজারে। কারণ সঞ্চয়পত্রে যারা বিনিয়োগ করেন, তাদের সিংহভাগই মাসের নির্ধারিত তারিখে সুনির্দিষ্ট আয়প্রত্যাশী। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে মুনাফার হার নির্দিষ্ট তো নয়ই, লাভ হবে এটিও নিশ্চিত নয়। এতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে রয়েছে পুঁজি হারানোর ঝুঁকি। বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও নির্দিষ্ট আয়প্রত্যাশীরা কি এমন ঝুঁকি নেবেন? এ প্রশ্নের জবাব দেওয়া খুব কঠিন। তবে এটা ঠিক, পুঁজিবাজার সম্পর্কে যারা ভালো ধারণা রাখেন, তাদের কেউ কেউ এমন পরিস্থিতিতে যদি বিনিয়োগের খাত পরিবর্তন করেন তাহলে ব্যাংকে না গিয়ে পুঁজিবাজারমুখী হবেন হয়তো। কারণ পরিসংখ্যান বলছে, একই ব্যাংকের মেয়াদি আমানত হিসাবে টাকা না রেখে ওই ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগ করা এখন বেশি লাভজনক। এ তথ্য যারা জানেন, স্বল্পসময়ে যাদের টাকার দরকার নেই তাদের কেউ কেউ যদি উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারমুখী হন, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তারপরও তাদের মাথায় রাখতে হবে, সঞ্চয়পত্র ও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ একইরকম নয়। এজন্য তাদের বিনিয়োগ করতে হবে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারে।

সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার কমলে আর্থিক খাতের অন্যান্য ক্ষেত্রের মুনাফায় কী এর প্রভাব পড়বে? এ প্রশ্নের উত্তর স্বভাবতই খোঁজা জরুরি। কারণ আর্থিক খাতে এমন কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা স্বল্প মুনাফায় পুঁজি সংগ্রহ করে বিনিয়োগ করে সঞ্চয়পত্রে। এর মুনাফার হার কমে গেলে তাদেরও ভাবতে হবে নতুন করে। সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন হলে তার দ্বারা জাতীয় সঞ্চয় নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হবে কিনা মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণে সেটিও বিবেচনায় রাখা দরকার।

 

বেসরকারি খাতে কর্মরত