প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সঠিকভাবে মানবসম্পদ উন্নয়নের চর্চা হলে সহজে লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়

একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিভাগ-প্রধানের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও’র সফলতা। সিইও সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেশি হয়।

খুশি হন শেয়ারহোল্ডাররা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সিইও’র সুনাম। প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব, চিফ মার্কেটিং অফিসারসহ এইচআর প্রধানরা থাকেন

পাদপ্রদীপের আড়ালে। টপ ম্যানেজমেন্টের বড় অংশ হলেও তারা আলোচনার বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। অন্তর্মুখী এসব কর্মকর্তা সব সময় কেবল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকেন। সেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে আমাদের নিয়মিত আয়োজন ‘টপ ম্যানেজমেন্ট’। শেয়ার বিজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এবার জেমকন গ্রুপের মানবসম্পদ (এইচআর) বিভাগের প্রধান ও মীনা সুইটসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ আহমেদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. হাসানুজ্জামান পিয়াস

সাঈদ আহমেদ জেমকন গ্রুপের মানবসম্পদ (এইচআর) বিভাগের প্রধান ও মীনা সুইটসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পরে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট (আইবিএ) থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন। তিনি বাংলাদেশ সোসাইটি ফর হিউম্যান রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্টের (বিএসএইচআরএম) লাইফ ফেলো

শেয়ার বিজ: আপনার ক্যারিয়ারের গল্প দিয়ে শুরু করতে চাই

সাঈদ আহমেদ: ১৯৮৫ সালে সেলস প্রমোশন অফিসার হিসেবে বেক্সিমকো অ্যাগ্রোকেমিক্যালস লিমিটেডে ক্যারিয়ার শুরু করি। একই প্রতিষ্ঠানে ১৯৮৭ সালে ফ্যাক্টরি ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব বুঝে নিই। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও বেক্সিমকো ইনফিউশনস লিমিটেডে প্লানিং অফিসার হিসেবে কাজ করি। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এন্টারপ্রাইজেস-এর মানবসম্পদ বিভাগের ব্যবস্থাপক ও পরবর্তী সময়ে একই প্রতিষ্ঠানে সহকারী পরিচালক ও প্রোগ্রাম ডেভেলপমেন্টের জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। পরে এক বছর ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডে

সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে মানবসম্পদ ও ট্রেনিং অ্যান্ড এসটাব্লিশমেন্ট বিভাগে কাজ করি। ১৯৯৯ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত একুশে টেলিভিশনের মানবসম্পদ ও ট্রেনিং অ্যান্ড অ্যাডমিনস্ট্রেশন বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করি। ২০০৬ সালে জেমকন গ্রুপে যোগদানের আগে চার বছর হাইডেলবার্গ সিমেন্ট বাংলাদেশ লিমিটেডের মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার ও ম্যানেজমেন্ট কমিটির মেম্বার হিসেবে কাজ করি।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে কেন বেছে নিলেন?

সাঈদ আহমেদ: মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের কাজ হলো মানুষকে জানা, মানুষকে নিয়ে কাজ করা। আমি মানুষকে নিয়ে কাজ করতে, জানতে ও বুঝতে ভালোবাসি। মানুষের সঙ্গে মিশতে ভালোবাসি ও তা উপভোগ করি। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে বেছে নেওয়ার কয়েকটা কারণের মধ্যে এটা একটা।

দ্বিতীয় কারণ হলো, যে কোনো প্রতিষ্ঠানকে উন্নত থেকে উন্নততর, মানসম্পন্ন করতে হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ উন্নয়ন। এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।

শেয়ার বিজ: আপনার প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানতে চাই

সাঈদ আহমেদ: বাংলাদেশের প্রথম সারির একটি গ্রুপ অব কোম্পানিজ জেমকন। এটি প্রতিষ্ঠা করেন লে. কর্নেল (অব.) কাজী শাহেদ আহমেদ। তিনি আমাদের গ্রুপের চেয়ারম্যান। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর ব্যবসার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। জেমকন গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৭৯ সালে ক্যাসেল কনস্ট্রাকশন কোম্পানির মাধ্যমে। বর্তমানে তার তিন ছেলে কাজী নাবিল আহমেদ এমপি, ড. কাজী আনিস আহমেদ ও কাজী ইনাম আহমেদকে ব্যবসা পরিচালনায় দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন। এ গ্রুপে নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে জুট মিলস, কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট লিমিটেড ও রিটেইল চেইন বিজনেস প্রতিষ্ঠান মীনা বাজার, জেমিনি সী ফুড, জেমকন সিটি লিমিটেড প্রভৃতি। আমাদের অন্যতম ব্যবসা হচ্ছে, পোল বা কংক্রিটের বৈদ্যুতিক খুঁটির। দেশে এ খাতে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে আমাদের প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে আমাদের চারটি পোল কারখানা রয়েছে পঞ্চগড় ও খুলনায়। ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব) নামে আমাদের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ঢাকা ট্রিবিউন ও বাংলা ট্রিবিউন নামে দুটি মিডিয়া রয়েছে। মীনা সুইটস নামে একটি মিষ্টি তৈরির প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কর্মপরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি বিবেচনায় দেশের অন্যতম সেরা গ্রুপ জেমকন।

শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের ভূমিকা গুরুত্ব সম্পর্কে বলুন

সাঈদ আহমেদ: প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের। ব্যবসা পরিচালনা করতে বা নতুন কোনো ব্যবসায় যেতে কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য কর্মী দরকার। সঠিক স্থানে যোগ্য কর্মী কাজে না লাগাতে পারলে কোনো লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে একজন দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকই সঠিক কর্মী নির্বাচন করে থাকেন। তাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলেন। প্রেষণের দিক নিশ্চিত করে তাকে প্রতিষ্ঠানে ধরে রেখে লক্ষ্য বাস্তবায়নে সাহায্য করেন। তাই কোনো প্রতিষ্ঠানে সঠিকভাবে মানবসম্পদ উন্নয়নের চর্চা হলে সহজে লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়।

GEMCON (1)শেয়ার বিজ: প্রতিষ্ঠানে একজন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপকের জন্য চ্যালেঞ্জিং বিষয় কী?

সাঈদ আহমেদ: প্রথম চ্যালেঞ্জ, পরিবর্তনশীল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা। প্রতিনিয়ত প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, পরিবেশ, পরিস্থিতি ও ব্যবসার কলাকৌশল পরিবর্তন হয়। কাজের ধরন ও সাংগঠনিক ক্ষমতা পরিবর্তিত হয়। এসব পরিবর্তন মেনে কর্মীদের নিয়ে এগিয়ে যাওয়াটা চ্যালেঞ্জের। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে নিয়ে এগিয়ে চলা চ্যালেঞ্জের।

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো, নেতৃত্বের উন্নয়ন করা। অনেক সময় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানে অনেক কর্মী আছে কিন্তু নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কর্মী কম। ধরুন, একটা গ্রুপে একজন দক্ষ কর্মী আছে কিন্তু তিনি কোনো কারণে ওই প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে গেলে তার স্থান পূরণ করার মতো কোনো কর্মী থাকে না। অর্থাৎ নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কর্মী গড়ে ওঠে না। প্রতিষ্ঠানে তাই লিডারশিপ ডেভেলপমেন্ট করা একটা চ্যালেঞ্জ।

তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হলো, প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ বিভাগের কাজগুলো সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠানকে সাহায্য করছে কি না এবং এ বিভাগের দ্বারা কী কী উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে, তা নিরূপণ করাও চ্যালেঞ্জের। তা ছাড়া যোগ্য কর্মী নির্বাচন, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মীদের উন্নত করা ও প্রেষণার দিক নিশ্চিত করে কর্মীকে প্রতিষ্ঠানে ধরে রাখাও চ্যালেঞ্জের।

বাংলাদেশে আর একটি চ্যালেঞ্জ হলো, দেশে খুব কম প্রতিষ্ঠানই সত্যিকার এইচআর প্রাকটিস করে। ওই সব প্রতিষ্ঠানে এইচআর প্রাকটিস চালু করা চ্যালেঞ্জের।

শেয়ার বিজবাংলাদেশের এইচআর প্রাকটিস সম্পর্কে জানতে চাই

সাঈদ আহমেদ: বিগত বছরগুলোয় বাংলাদেশে বেশ পরিবর্তন এসেছে। ইতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে। এক সময় প্রশাসন বিভাগই এইচআর বিভাগের কাজ করতো। এরপর নাম পরিবর্তন করে পারসোনেল ডিপার্টমেন্ট হয়। কালক্রমে এ বিভাগের কাজ ও ধারণা পরিবর্তন হয়, নাম বদলে এইচআর রাখা হয়। এভাবে প্রতিদিনই কোনো না কোনো পরিবর্তন হচ্ছে। আগে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে এইচআর প্রাকটিস ছিল কিন্তু বর্তমানে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানে এ বিভাগ রয়েছে। আর গার্মেন্ট সেক্টরে এইচআর বিভাগটা ক্রেতাদের কমপ্লায়েন্স অনুযায়ী হলেও বেশ ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমাদের দেশে গার্মেন্ট সেক্টরটি বেশ বড়। সেক্টরটি ভালো করছে। তা ছাড়া দেশের বড় বড় অনেক গ্রুপ অব কোম্পানিজ প্রয়োজনের তাগিদে এইচআরকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তারপরও আমি বলবো, আমাদের যে অগ্রগতি সেটি তুলনামূলক মন্থরগতির। অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনও এইচআর অলঙ্কারিক হিসেবে রয়েছে। প্রকৃত এইচআর চর্চা হচ্ছে না।

শেয়ার বিজ: পেশা হিসেবে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক, কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

সাঈদ আহমেদ: চমৎকার পেশা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা। যারা এ পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চায়, আমি তাদের উৎসাহ দিতে চাই। ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে পেশাটি। এটি একটি নতুন ও পরিবর্তনশীল পেশা। মানবসম্পদ নিয়ে কাজ করার মজা আছে। এ বিভাগে কাজ করে আপনি প্রতিষ্ঠানের উন্নতিতে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারবেন।

 

শেয়ার বিজ: সফল মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক হতে আপনার পরামর্শ কী?

সাঈদ আহমেদ: প্রথমত, মানুষের সঙ্গে মেশা ও কাজ করার দক্ষতা থাকতে হবে। পিয়ন হতে শুরু করে ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সঙ্গে আপনাকে কাজ করতে হবে। সুতরাং আপনাকে সব ধরনের পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে চলার জন্য দক্ষ হতে হবে। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। নেতৃত্ব দেওয়ার গুণাবলী থাকতে হবে। বিশ্বাসী হতে হবে। ভালো শ্রোতা হওয়া জরুরি। সহ্যশক্তি থাকতে হবে। ব্যবসা সম্পর্কিত জ্ঞান রাখতে হবে। প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা সম্পর্কে জানতে হবে। একজন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপককে সব বিভাগের সঙ্গে কাজ করতে হয়। তাই অন্য বিভাগের কাজ সম্পর্কেও ধারণা রাখতে হবে।