কৃষি কৃষ্টি

সঠিক চাষাবাদই নিশ্চিত করে অধিক ফলন

পুষ্টিকর সবজি ক্যাপসিকাম। লাভজনক হওয়ায় এটি চাষে আগ্রহী হচ্ছেন চাষি। আজকের আয়োজন এর নানা দিক নিয়ে

একধরনের মিষ্টি মরিচকে ক্যাপসিকাম বলা হয়। এর আকার প্রায় টমেটোর মতো। বিশ্বে টমেটোর পর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সবজি হিসেবে ধরা হয় একে। সবজিটি বাংলাদেশে তেমন প্রচলিত না হলেও ইদানীং এর চাষ হচ্ছে কয়েক স্থানে।
ক্যাপসিকাম মূলত শীতপ্রধান দেশে ভালো জন্মে। সে হিসেবে বাংলাদেশে শুধু শীতকালে স্বল্পপরিসরে এটি চাষ করা হয়। ক্যাপসিকাম নানা রঙের হয়ে থাকে। দেশে সবুজ ক্যাপসিকাম ছাড়া অন্য রঙের ক্যাপসিকামও দেখা যায়। তবে তুলনায় কম। কেননা, রঙিন ক্যাপসিকাম চাষ করতে চাইলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়।

জলবায়ু ও মাটি
উষ্ণ আবহাওয়া ক্যাপসিকামের জন্য ক্ষতিকর। আবার শীতকালীন ফসল হলেও অতিরিক্ত ঠাণ্ডা সহ্য করতে পারে না। সাধারণত ১৬ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা চাষের জন্য উপযুক্ত। এর কম বা বেশি হলে গাছে ফুল আসে না বা ঝরে পড়ে। চাষের জন্য দোআঁশ বা বেলে-দোআঁশ মাটি ভালো।

জাত
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বারি মিষ্টি মরিচ-১ ও বারি মিষ্টি মরিচ-২ নামে দুটি জাত উদ্ভাবন করেছে। তবে বাংলাদেশে বারি মিষ্টি মরিচ-১ জাতটি চাষ করা হয়। এটি ২০০৯ সালে অবমুক্ত করা হয়। উজ্জ্বল সবুজ বর্ণের টমেটো আকৃতির এ ক্যাপসিকাম পাকলে লাল বর্ণের হয়। প্রতিটি গাছে সাত থেকে আটটি ফল ধরে। বাংলাদেশের সবখানে এটি চাষ করা যায়।

সময়
ক্যাপসিকামের বীজ বোনার উপযুক্ত সময় সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত। তবে সেপ্টেম্বরের শেষে বীজ বপন ও অক্টোবরের শেষে চারা রোপণ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। অবশ্য বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে সারা বছরই চাষ করা সম্ভব। গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য পলিথিন ছাউনি কিংবা পলি হাউজের মাধ্যমে চাষ করা যেতে পারে।

চারা রোপণ পদ্ধতি
দোঁ-আশ জমি নির্বাচন করে প্রথমে একবার চাষ করে টিএসপি, এমপি ও পটাশ সার দিয়ে আবার দুবার চাষ করতে হবে। চাষের পর মই দিয়ে জমি ভালোভাবে তৈরি করে নিতে হবে। এরপর বেড তৈরি করতে হবে। প্রতিটি বেড চওড়ায় দুই দশমিক পাঁচ ফুট হলে ভালো। দুই বেডের মাঝখানে নালা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। সরাসরি বীজ বপন করে চাষ করা যায় অথবা বীজ থেকে চারা গজিয়ে উঠলে নির্ধারিত জমিতে রোপণ করতে পারেন।
প্রতি শতকের জন্য এক গ্রাম বীজ দরকার। বীজ থেকে প্রথমে চারা তৈরি করে নিতে হয়। এজন্য বীজগুলোকে ১২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। এরপর বীজতলায় লাইন করে বীজ বুনতে হবে। বীজ বোনার সাত থেকে ১০ দিন পর চারা তিন থেকে চারটি পাতা হলে মাঝারি আকারের পলিথিন ব্যাগে চারা স্থানান্তর করে জমিতে লাগাতে হবে। চারা তৈরি করা বেডে এক দশমিক পাঁচ ফুট দূরত্বে রোপণ করতে হবে। এ সময় জৈবসার দিতে হবে। গাছ একটু বড় হয়ে গেলে ইউরিয়া সার দিতে হয়। দেড় মাস পর ইউরিয়া ও এমপি সার মিশিয়ে জমিতে ছিটিয়ে দিতে হবে। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত রাতের তাপমাত্রা তুলনামূলক কম থাকে। এ সময় পলিথিনের ছাউনি দিয়ে রাখলে ভেতরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকে।

পরিচর্যা ও ফসল সংগ্রহ
ক্যাপসিকাম চাষ বাংলাদেশে এখনও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। সঠিক নিয়ম ও পরিচর্যায় ভালো ফলন পাওয়া যাবে।
বীজ বপনের পর কিংবা চারা রোপণের পর অবশ্যই কৃষি অধিদফতরের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনমতো সার দিতে হবে। সার মূলত দুই ভাগ করে জমিতে দিতে হবে। প্রথম ভাগ রোপণের আগে। দ্বিতীয় ভাগ রোপণের পর। ক্যাপসিকাম সাধারণত অতিরিক্ত খরা ও জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। তাই চাষের জমিতে প্রয়োজন মতো সেচ দিতে হবে। আবার পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও করতে হবে। অতিরিক্ত সেচ দিলে গাছ ঢলে পড়া রোগে আক্রান্ত হতে পারে। খেয়াল রাখতে হবে, অতিরিক্ত পানি যেন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না করে। গাছের গোড়া আগাছামুক্ত রাখতে হবে। প্রয়োজনে কিছুদিন পরপর নিড়ানি দিয়ে আগাছা দমন করতে হবে। গাছ একটু বড় হলে হালকা ইউরিয়া সার দিয়ে সেচ দিতে হবে। কোনো গাছে ফল ধরতে শুরু করলে খুঁটি দিতে হবে, যাতে গাছ ফলের ভারে হেলে না পড়ে বা ভেঙে না যায়।
ক্যাপসিকাম পরিপক্ব হলে সবুজ অবস্থায় জমি থেকে ওঠানো যায়। আবার পেকে গেলে অর্থাৎ লালচে হলেও ওঠাতে পারেন। সাধারণত একবার গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। সংগ্রহের সময় প্রতিটি ফলে কিছুটা বোঁটা রেখে সংগ্রহ করতে হবে। এরপর ঠাণ্ডা কিংবা ছায়াযুক্ত স্থানে রাখতে হবে। এভাবে বাজারজাতকরণের আগে সংরক্ষণ করা উচিত।

রোগ ও পোকামাকড় দমন
ক্যাপসিকাম চাষ করে লাভবান হওয়া সম্ভব। এজন্য নানা ধরনের রোগ ও পোকার আক্রমণ থেকে ফলটি রক্ষা করতে হবে। না হলে ফলন কমে যাবে। তাই এর রোগবালাই ও দমন সম্পর্কে জেনে রাখতে পারেন।

রোগবালাই
আলফা মোজাইক: এ রোগের কারণে গাছের পাতা সাদাটে হয়ে যায়। পাতায় হলুদ-সবুজ মোজাইকের মতো ছোপ ছোপ দাগ পড়তে দেখা যায়।
দমনের জন্য জমি থেকে আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলতে হবে। ভাইরাসমুক্ত বীজ বা চারা লাগাতে হবে। সবশেষে ছত্রাকনাশক ওষুধ পানিতে মিশিয়ে পুরো জমিতে স্প্রে করতে হবে।
সুটিমোল্ড: এ রোগের আক্রমণে পাতা, ফল ও কাণ্ডে কালো ময়লা জমতে দেখা যায়। জাব পোকা বা সাদা মাছির আক্রমণে এ রোগ হয়ে থাকে।
পোকা বা মাছি দমনের ব্যবস্থা করতে হবে। আক্রান্ত পাতা ও ডগা ছাঁটাই করতে হবে। পানিতে ছত্রাকনাশক ওষুধ মিশিয়ে ১৫ দিন পরপর দুবার স্প্রে করতে হবে।
জেমিনি ভাইরাস: সাদা মাছি দ্বারা এ ভাইরাস ছড়ায়। কচি পাতার গায়ে ঢেউয়ের মতো ভাজের সৃষ্টি হয়। দমনের জন্য আক্রান্ত গাছ সংগ্রহ করে ধ্বংস করতে হবে। ভাইরাসের বাহক পোকা দমনের জন্য ডায়ামেথয়েট এক মিলিলিটার হারে পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। এছাড়া সঠিক দূরত্বে চারা রোপণ করা আবশ্যক।
গোড়া পচা: ছত্রাকের আক্রমণে চারার গোড়া পচে যায়। চারা নেতিয়ে পড়ে। দমনের জন্য বেডে চারা উৎপাদন করা প্রয়োজন। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে সব সময় গাছের গোড়ার মাটি স্যাঁতসেঁতে না থাকে। এছাড়া প্রতি শতাংশে সাত থেকে ১০ কেজি ট্রাইকো-কম্পোস্ট ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
আগা মরা: এ রোগে আক্রান্ত হলে প্রথমে গাছের আগায় পচন ধরে। পরে ক্রমশ তা নিচের দিকে অগ্রসর হয় এবং এক সময় পুরো গাছ মরে যায়। দমনের জন্য আক্রান্ত অংশ সংগ্রহ করে নষ্ট করতে হবে। রোগ দেখা দিলে বালাইনাশক স্প্রে করতে হবে।
এনথ্রাকনোজ: এ রোগে আক্রান্ত পাতা, কাণ্ড ও ফলে বাদামি কলো দাগ দেখা যায়। পরে দাগগুলো বড় হয় ও ক্যাপসিকাম পচে যায়। দমনের জন্য আক্রান্ত পরিত্যক্ত অংশ সংগ্রহ করে নষ্ট করা জরুরি। রোগাক্রান্ত হলে প্রতি লিটার পানিতে ছত্রাকনাশক ওষুধ দিনে দুবার স্প্রে করতে হবে।
ঢলেপড়া: এটিও একটি রোগ। এতে আক্রান্ত গাছের পাতা হলদে হয়ে শুকিয়ে যায়। ধীরে ধীরে গাছ ঢলে পড়ে মারা যায়। দমনের জন্য আক্রান্ত গাছ তুলে জমি পরিষ্কার করতে হবে। একই জমিতে পরেরবার মরিচ চাষ করা যাবে না।

পোকামাকড়
ফল ছিদ্রকারী: পোকার কীট কচি ফল-ডগা ছিদ্র করে ও ভেতরের অংশ খেয়ে ফেলে। এরা ফুলের কুঁড়িও খায়। দমনের জন্য জমি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। আক্রান্ত ডগা ও ফল সংগ্রহ করে নষ্ট করতে হবে। চারা রোপণের ১৫ দিন পর থেকে জমি গভীর পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। জৈব বালাইনাশক পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে
জাবপোকা: এ পোকা গাছের কচি পাতা ও ডগার রস শুষে খেয়ে গাছ দুর্বল করে ফেলে। দমনের জন্য গাছের আক্রান্ত অংশ অপসারণ করতে হবে। প্রাথমিক অবস্থায় শুকনো ছাই ছিটিয়ে দিলে উপকার পাওয়া যায়। পরিষ্কার পানি সব গাছে স্প্রে করতে হবে। পোকা কমাতে হলুদ রঙের ফাঁদ ব্যবহার করতে হবে। তামাক গুঁড়ো, সাবান গুঁড়ো ও নিমের পাতার নির্যাস প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে। পোকার হার বেশি হলে কৃষি অধিদফতরের পরামর্শ অনুযায়ী কীটনাশক ওষুধ পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
লেদাপোকা: এসব পোকা দলবদ্ধভাবে পাতার সবুজ অংশ খেয়ে ফেলে। ফলে পাতা জালের মতো হয়ে যায়। পাতা খেয়ে গাছকে দুর্বল করে ফেলে। দমনের জন্য পোকাসহ গাছের আক্রান্ত অংশ অপসারণ করতে হবে। ফাঁদ পেতেও পোকা অপসারণ করা যায়। কৃষি অধিদফতরের জাবপোকা দমনের পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন।
থ্রিপস: এর আক্রমণে পাতা কুঁকড়ে যায়। পোকা গাছের কচি পাতা ও ডগার রস শুষে খেয়ে গাছকে দুর্বল করে ফেলে।
দমনের জন্য গাছের আক্রান্ত অংশ অপসারণ করে শুকনো ছাই ছিটিয়ে দিতে হবে। পরিষ্কার পানির ঝাপটা দেওয়া যেতে পারে।
লাল মাকড়: এর আক্রমণে পাতা কুঁকড়ে উল্টানো নৌকার মতো হয়ে যায়। পোকা গাছের কচি পাতা ও ডগার রস শুষে খেয়ে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত করে।
জমি থেকে মাকড় ও এর ডিমসহ আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলতে হবে। জমিতে পরিমিত জৈবসার দিতে হবে। নিয়মিত সেচ দিতে হবে। মাকড়নাশক বা সালফার-জাতীয় ওষুধ পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
সাবধানতা: কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ওষুধ স্প্রে করার ১৫ দিনের মধ্যে জমি থেকে ফসল সংগ্রহ করা যাবে না। পরবর্তীকালে নতুন বীজ বা চারার জন্য অবশ্যই সুস্থ গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন জাত চাষ করতে হবে এবং সুষম সার ব্যবহার করতে হবে।

ক্যাপসিকামের পুষ্টিগুণ

ক্যাপসিকাম পুষ্টিকর সবজিগুলোর মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে এ সবজিটির চাহিদা বাড়ছে। যেমন স্বাদের, তেমনি পুষ্টিকর। খাদ্যতালিকায় এ সবজিটি রাখতে পারলে অনেক রোগ থেকে দূরে থাকা সম্ভব।
# ক্যাপসিকামে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট উপাদান রয়েছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। এতে সালফার যৌগ ছাড়াও ক্যারোটেনয়েড লাইকোপেন উপাদান রয়েছে। এসব উপাদান বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার প্রতিরোধ করে
# এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন এ, সি ও বিটা ক্যারোটিন। এসব উপাদান দৃষ্টিশক্তি-সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা দূর করে ও দৃষ্টিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে
# উপস্থিত ক্যাপসাইসিন উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষ সহায়ক
# ক্যাপসিকামে ভিটামিন সি ও কে রয়েছে, যা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে
# সবুজ ক্যাপসিকামে আছে প্রচুর পরিমাণ পটাশিয়াম, যা আমাদের পেশির সংকোচন-প্রসারণে সাহায্য করে
# ক্যাপসিকামে উপস্থিত ভিটামিন ‘এ’ ফুসফুসের কর্মক্ষমতা বাড়ায়
# মেটাবলিজম বাড়াতে সাহায্য করে ক্যাপসিকাম। এতে মেদ ঝরে যায়
# এতে থাকা বিভিন্ন পুষ্টিগুণ ত্বকের কোষ সুস্থ রাখতে সাহায্য করে
# সবুজ ক্যাপসিকামে ফাইবার রয়েছে, যা কোলেস্টেরল কমায়। এতে হৃৎযন্ত্র ভালো থাকে
# ভিটামিন ‘সি’র একটি মুখ্য উৎস,যা আয়রন শোষণের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..