কৃষি কৃষ্টি

সঠিক চাষে অধিক ফলন

বারোমাসি ফল সফেদা। বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলে এ ফল জন্মে। আজকের আয়োজন এর নানা দিক নিয়ে

বারোমাসি ফল সফেদা। বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলে এ ফল জন্মে। তবে বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোয় এর চাষ অপেক্ষাকৃত বেশি। সফেদার ভালো ফলন পেতে চাইলে চাষিদের সঠিক চাষাবাদ সম্পর্কে জানতে হবে।

জাত

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত সফেদার মধ্যে রয়েছে বারি সফেদা-১, বারি সফেদা-২ ও বারি সফেদা-৩। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাউ সফেদা-১, বাউ সফেদা-২ ও বাউ সফেদা-৩ উল্লেখযোগ্য। দেশের সব জায়গায় এসব জাত চাষ করা যায়। জোড়া কলমের মাধ্যমে এ ফলের বংশবিস্তার করানো হয়। তাই কলমের মাধ্যমে উৎপাদিত রোগমুক্ত এক থেকে দেড় বছর বয়সি চারাকে রোপণের জন্য নির্বাচন করতে হবে।

মাটি

উঁচু বেলে দোআঁশ ও দোআঁশ মাটি সফেদার জন্য বেশ উপযোগী। তবে সেচের সুবিধাযুক্ত স্থান হলে সব ধরনের দোআঁশ মাটিতেও চাষ করা যাবে।

চারা রোপণের সময়

সফেদার চারা রোপণের উপযুক্ত সময় জ্যৈষ্ঠ থেকে শ্রাবণ, অর্থাৎ জুন থেকে জুলাই। বর্ষাকালের শেষেও চারা রোপণ করা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

রোপণ পদ্ধতি

সমতল ভূমিতে বর্গাকার বা ষড়ভুজী পদ্ধতিতে চারা রোপণ করা যেতে পারে। রোপণের জন্য চারা থেকে চারা ও সারি থেকে সারির দূরত্ব ছয় মিটার থাকা বাঞ্ছনীয়। এরপর ৭৫ সেন্টিমিটার বা দুই ফুট চওড়া ও দুই ফুট গভীর গর্ত তৈরি করতে হবে। গর্তের মাটি গর্তের ওপরে একপাশে সপ্তাহ দুয়েক রেখে দিতে হবে। এতে গর্ত জীবাণুমুক্ত করার জন্য আলো-বাতাস প্রবেশে সুবিধা হবে। এরপর পাশে রেখে দেওয়া মাটি দিয়ে গর্ত ভরাট করে নিতে হবে। এ সময় পানি ছিটিয়ে দেওয়া ভালো। এক দিন পর তৈরি করা চারা কিংবা নার্সারি থেকে সুস্থ ও নিরোগ চারা সংগ্রহ করে ভরাট করা গর্তের মাঝখানে রোপণ করতে হবে। চারা রোপণের শেষে পানি দিতে হবে।

পরিচর্যা ফসল সংগ্রহ

চারা রোপণের পরবর্তী ধাপে রয়েছে সঠিক যত্ন। এতে মানসম্পন্ন ভালো ফলন পাওয়া যায়।

সার দেওয়া

চারা রোপণের আগে প্রতি গর্তে গোবর, টিএসপি ও এমওপি সার দিতে হবে। চাষের জমিতে জৈব সার দিতে পারলে ফলন বৃদ্ধি পাবে। গাছও ভালো থাকবে। চারা রোপণের পর পুরো জমিতে আবর্জনা পচা সার ব্যবহার করা যেতে পারে। বাড়ির আশপাশে গর্ত করে সেখানে আবর্জনা, ঝরা পাতা প্রভৃতি স্তূপ করে আবর্জনা পচা সার তৈরি করে জমিতে ছিটিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া গাছে ফুল আসার আগে গোড়ার চারপাশ মাটি খুঁড়ে জৈব সার দিলে ফুল ও ফল দুটোই ভালো হবে।

পরিচর্যা

রোপণের পর নিয়মিত আগাছা দমন, মাটি আলগা রাখা, খরা মৌসুমে সেচ দেওয়া প্রভৃতির প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। অর্থাৎ বিশেষ পরিচর্যা করতে হবে। এছাড়া ছোট অবস্থায় চারার চারপাশ ঘিরে রাখতে হবে। চারার সঙ্গে খুঁটি লাগিয়ে দিতে হবে। সফেদা গাছ খরা সহ্য করতে পারে ঠিকই, তবে অতিরিক্ত খরার সময় প্রয়োজনীয় সেচ না দিলে শুকিয়ে যায়। তাই এ সময় অবশ্যই সেচ দিতে হবে।

ফসল সংগ্রহ

প্রায় সারা বছরই ফুল ধরে। সাধারণত ফাল্গ–ন থেকে অগ্রহায়ণ, অর্থাৎ মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। সফেদা পরিপক্ব হলে, অর্থাৎ ফল শক্ত হলে সংগ্রহ করা উচিত। ফল সংগ্রহের উপযোগী সময় হলে খোসায় কিছুটা কমলা রঙের আভা আসবে। এছাড়া ফলের ভেতরের বীজ কালো হলে বুঝতে হবে পরিপক্ব হয়েছে। এ সময় গাছ থেকে সংগ্রহ করে ঘরে রেখে পাকাতে হবে। বছরে এক হাজার থেকে তিন হাজার ফল পাওয়া যায়।

পোকামাকড় রোগবালাই দমন

অন্যান্য ফসলের মতো সফেদায়ও বিভিন্ন পোকা আক্রমণ করে। এছাড়া কিছু রোগে আক্রান্ত হয়।

কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা: সফেদায় কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ দেখা যায়। এ পোকার আক্রমণে গাছের কাণ্ডে ছিদ্র হয়। এছাড়া কাণ্ডে মালার মতো ঝুল লেগে থাকে বা ঝুলতে দেখা যায়।

দমনের জন্য ছিদ্র বা গর্তের পোকা খুঁজে বের করে পোকা মেরে ফেলতে হবে। এরপর গর্তের ভেতর কিছু জৈব যৌগ যেমন প্যারাডাইক্লোরোবেনজিন ঢেলে গর্তের মুখ মাটি দিয়ে বন্ধ করে দিতে হবে। এ পদ্ধতি ছাড়াও সিরিঞ্জ দিয়ে গরম পানি গর্তের ভেতর ইনজেক্ট করেও পোকা মারা যায়। চিকন ধাতব তার গর্তের ভেতর ঢুকিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে পোকা মারা সম্ভব। একটি কটনবাডের এক মাথা কেরোসিন বা পেট্রোলের মধ্যে ভিজিয়ে গর্তের ভেতর ঢুকিয়ে গর্তের মুখ বন্ধ করে দিয়েও পোকা মারা যায়।

খোসা পোকা: ছোট আকারের এ পোকা গাছের পাতা, পাতার বোঁটা, কচি ডগা ও ফলের রস চুষে খেয়ে গাছের ক্ষতি করে। এরা দুভাবে ক্ষতি করে থাকে। প্রথমত, রস চুষে খাওয়ার ফলে গাছের জীবনীশক্তি হ্রাস পায়। দ্বিতীয়ত, রস চুষে খাওয়ার সময় এরা গাছে একপ্রকার বিষাক্ত পদার্থ মিশিয়ে দেয়। ফলে আক্রান্ত পাতা, ডগা ও ফলের ওপর হলুদ দাগ দেখা যায়। এজন্য মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয় গাছ। এতে সব পাতা ফ্যাকাশে হয়ে যেতে পারে। পরে গাছ ধীরে ধীরে শুকিয়ে মারা যায়।

দমনের জন্য আক্রমণের মাত্রা মারাত্মক হলে সর্বশেষ ব্যবস্থা হিসেবে আক্রান্ত গাছে কীটনাশক পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করে এ পোকা দমন করতে হবে।

লাল মরিচা: লাল মরিচা একটি মারাত্মক রোগ। এর আক্রমণে পাতা ও ফলে লালচে মরিচার মতো এক ধরনের উঁচু দাগ দেখা যায়। একপ্রকার সবুজ শৈবালের আক্রমণে এ রোগ হয়। দমনের জন্য আক্রান্ত পাতা ও ডগা বাছাই করে ধ্বংস করতে হবে। গাছে সুষম সার দিতে হবে। নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে এ রোগ ঠেকাতে হবে।

পাউডারি মিলডিউ: এক ধরনের জীবাণুর কারণে পাউডারি মিলডিউ রোগে আক্রান্ত হয় সফেদা। এ জীবাণুর আক্রমণে পাতায় সাদা পাউডারের আবরণ সৃষ্টি হয়। হাত দিয়ে ঘসলে পাউডার সরে যায়। তবে দীর্ঘদিন থাকলে পাতা পচতে শুরু করে।

দমনের জন্য আক্রান্ত জায়গায় পানি স্প্রে করে রোগের প্রকোপ কমানো সম্ভব। সময়মতো প্রুনিং করে গাছ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। কৃষি অধিদফতরের পরামর্শ অনুযায়ী সালফার বা ছত্রাকনাশক ওষুধ পানিতে মিশিয়ে এক সপ্তাহ পরপর দুবার স্প্রে করতে হবে।

মিলিবাগ: অসংখ্য সাদা পোকা এ মিলিবাগ। এরা কখনও একসঙ্গে থাকে, কখনও বিচ্ছিন্নভাবেও থাকে। এরা রস চুষে খায় ও এক ধরনের আঠালো মিষ্টি রস নিঃসরণ করে। ফলে এ রস খাওয়ার জন্য পিঁপড়া আসে। পিঁপড়ার আক্রমণ বেশি হলে শুটি মোল্ড ছত্রাক আক্রমণ করে। এছাড়া পাতায় পিঁপড়া বাসা বাঁধে। পরবর্তী সময়ে পুরো গাছ মরে যায়।

দমনের ক্ষেত্রে প্রাথমিক অবস্থায় হাত দিয়ে পিষে পোকা মেরে ফেলতে হবে। অথবা ব্রাশ দিয়ে ঘসে পোকা মাটিতে ফেলে মারতে হবে।

বিশেষ করণীয়: বাগান অপরিচ্ছন্ন রাখা যাবে না। ফল সংগ্রহের পর গাছের মরা ডালপালা, ফলের বোঁটা, রোগ বা পোকা-আক্রান্ত ডালপালা ও অতি ঘন ডালপালা ছাঁটাই করে পরিষ্কার করতে হবে। এরপর ছত্রাকনাশক কিংবা কীটনাশক পুরো গাছে স্প্রে করতে হবে। গাছের গোড়ায় আঠাযুক্ত ফিতা বা প্লাস্টিকের মসৃণ ফিতা পেঁচিয়ে দিতে হবে, এতে পোকা গাছ বেয়ে ওপরে উঠতে পারবে না। এজন্য ফানেল স্থাপন করা যেতে পারে। নিয়মিত বাগান পরিদর্শন করতে হবে।

নানা জাতের

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টার ও কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে ছয়টি জাত বাছাই করা হয়েছে। এগুলো সম্পর্কে জেনে নিতে পারেন

বাউ সফেদা-১

জাতটি সারা বছরই কম-বেশি ফল দেয়। ফল ডিম্বাকার, কম বীজযুক্ত ও মিষ্টি। শাঁস চমৎকার। পুষ্টিগুণে ভরা ফলটি পাকতে ছয় থেকে আট মাস লাগে। প্রচুর ফল ধরে। ফলের ওজন ৮০ থেকে ১০০ গ্রাম হয়ে থাকে। গাছ ঝোপালো আকৃতির হয়ে থাকে।

বাউ সফেদা-২

এটি একটি নিয়মিত ফলধারণকারী জাত। জাতটি অনেকটা বাউ সফেদা-১-এর মতো। তবে এ জাতের শাখা-প্রশাখা ছাতার মতো নিচের দিকে ঝোলানো থাকে। ফল ছোট থেকে মাঝারি আকারের হয়। থোকায় থোকায় ফল ধরে। ফল ডিম্বাকার। ফলের চামড়া অত্যন্ত পাতলা ও সুগন্ধযুক্ত। ওজন ৫০ থেকে ১০০ গ্রাম। শাঁস লাল-বাদামি, কোমল ও সুস্বাদু।

বাউ সফেদা-৩

বাউ সফেদা-৩ জাতের শাখাগুলো চারদিকে পাতার বলয়ে আবৃত থাকে। এ জাতের ফল মাঝারি থেকে বড় আকারের হয়। ফল ডিম্বাকার ও নিচের দিকটা সুচালো। ফল অত্যন্ত মিষ্টি, শাঁস সুগন্ধযুক্ত ও কোমল।

বারি সফেদা-১

উচ্চফলনশীল এ জাতটি বাংলাদেশে চাষের জন্য ১৯৯৬ সালে অনুমোদন লাভ করে। জাতটিতে নিয়মিত ফল ধরে। ফল দেখতে অনেকটা চ্যাপ্টা ও আকারে বেশ বড়। প্রতিটি ফলের ওজন ৮০ থেকে ৯০ গ্রাম হয়ে থাকে। বর্ণ তামাটে। আকার ডিম্বাকৃতি।

বারি সফেদা-২

জাতটি ঢাকা, টাঙ্গাইল, গাজীপুর ও নরসিংদী এলাকায় চাষের জন্য ২০০৩ সালে অবমুক্ত করা হয়। সফেদার এ জাতটি পৌষ থেকে বৈশাখ মাস অর্থাৎ ডিসেম্বর থেকে এপ্রিলে ফল সংগ্রহ করা যায়। এ জাতের ফল দেখতে গোলাকার। আকারে মাঝারি। প্রতিটি ফলের ওজন ৭০ থেকে ৮০ গ্রাম। পাকা ফলের শাঁস লালচে-বাদামি বর্ণের হয়।

বারি সফেদা-৩

জাতটি ২০০৯ সালে অবমুক্ত করা হয়। বছরে দুবার ফল ধরে। এটি উচ্চফলনশীল জাত। ফল গোলাকার ও মাঝারি আকারের। ওজন ১০০ থেকে ১১৫ গ্রামের মতো হয়ে থাকে। স্বাদ মিষ্টি। এর ফলন বাংলাদেশে তুলনামূলক বেশি হয়।

সর্বশেষ..