মত-বিশ্লেষণ

সঠিক পরিচর্যা ও সহায়তায় পথশিশুরা স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে

জিনাত রহমান: শিশুর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য কবিতায় শিশুদের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার কথা বলেছিলেন। আজকের শিশুরা আগামীদিনের  কর্ণধার। সঠিক পরিবেশ এবং পরিচর্যা পেলে প্রতিটি শিশুই দেশ ও জাতির জন্য সুনাগরিক হয়ে উঠতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি শিশুর সঠিক শিক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারছি? অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণে শিশুরাও বিভিন্নভাবে বিভক্ত। উচ্চবিত্তের শিশুরা সব সুযোগ ভোগ করলেও মধ্যবিত্ত ও নি¤œবিত্তের শিশুরা তা পায় খুব সামান্য। এর বাইরে এমন অনেক শিশু আছে যাদের আমরা পথশিশু বলি।  কেই বলে ‘টোকাই’। পথই এদের ঠিকানা। এসব শিশুর কোনো মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। অনেকে নিজের মা-বাবার পরিচয়ও জানে না।

পথশিশু সমাজব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। ক্রমবর্ধমান হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, পারিবারিক অবহেলা আর অর্থ উপার্জনের আশায় গ্রাম থেকে শহরে চলে আসায় শহরগুলোতে পথশিশুর সংখ্যা বাড়ছে। আসলে পথশিশু হচ্ছে তারাই, যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে এবং রাস্তায় থাকে, রাস্তায় ঘুমায় এবং যাদের সুনির্দিষ্ট কোনো কাজ নেই।

কোনো শিশুই পথশিশু হয়ে জš§ নেয় না। বাস্তবতা তাদের বাধ্য করে এ পথে আসতে। ভাসমান মানুষের মধ্যে এরাই সবচেয়ে অবহেলিত, বঞ্চিত এবং নির্যাতিত। পথশিশুরা কোনো না কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত। তাদের কেউ ফুল বিক্রি করে, কেউ চকলেট বিক্রি করে, কেউবা আবার পত্রিকার হকার। কেউ বা আবার প্লাস্টিকের বোতল, কাগজ, ভাঙ্গারি কুড়িয়ে বিক্রি করে এবং ভিক্ষা করে। এদের কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। ফুটপাত, রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, বাস টার্মিনাল, স্টেডিয়াম, রেললাইনের পাশে তাঁবু টানিয়ে অথবা পার্কের বেঞ্চে রাত কাটায়। সস্তাশ্রম এবং শিক্ষার আলো না থাকায় এসব শিশু অশুভ শক্তির হাতে ব্যবহƒত হচ্ছে। মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে নানা ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে দেখা যায় এদের। অর্থের বিনিময়ে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল এদের ব্যবহার করে। সহিংস কর্মকাণ্ডেও তারা লিপ্ত হয়। এ পরিস্থিতি করো কাম্য নয়।

সেভ দ্য সিলড্রেনের ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার লাখ। এর প্রায় ৭৫ শতাংশই শহরে বাস করে। এদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ ছেলে এবং ৪৭ শতাংশ মেয়ে। এদের প্রতিদিনের গড় আয় মাত্র ৫০ থেকে ১০০ টাকা। সেটাও তারা সবসময় উপার্জন করতে পারে না। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পথশিশুদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক শিশুই নানাভাবে ব্যবহƒত হয়। ফলে গৃহহীন এসব পথশিশুরা খুবই ঝুঁকিতে থাকে। যৌন নির্যাতন তার মধ্যে অন্যতম। বিশেষ করে মেয়েশিশুর প্রায়ই যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এমন পরিস্থিতিতে এসব পথশিশুদের জীবনযাপন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

সঠিক পরিচর্যা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে এসব শিশু হয়ে উঠতে পারে দেশের সম্পদ। এ বাস্তবতায় সরকার পথশিশুদের উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন পথশিশুদের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। পথশিশুরা অনেক পরিশ্রমী। বেঁচে থাকার জন্য তাদের শিশু বয়স থেকেই যুদ্ধ করতে হয়।

শহরের বস্তি এলাকায় বসবাসরত জীবিকার সন্ধানে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের ভাসমান পরিবারের সদস্যদের সংগঠিত করে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকল্পে বাস্তবধর্মী কার্যক্রম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ ও সহযোগিতা করা সরকারের লক্ষ্য। ছিন্নমূল এ শিশুরা শহরের বিভিন্ন স্থানে, ড্রেনের পাশে, পরিত্যক্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ডোবা বা জলাভূমির ধারে জীর্ণকুটির তৈরি করে বসবাস করে। নোংরা পরিবেশ, জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যর্থতায় অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যহীনতা, বেকারত্ব, ভিক্ষাবৃত্তি প্রভৃতি সমস্যায় জর্জরিত এসব শিশু। তাই সুপরিকল্পিতভাবে শহর এলাকায় বসবাসরত সব পথশিশুর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কোন্নয়ন করে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, পুষ্টি, পরিবার পরিকল্পনা প্রভৃতি ক্ষেত্রে প্রাপ্য সীমিত সম্পদের মাধ্যমে সমস্যাবলির সম্ভাব্য সমাধান করে জনজীবনে স্বস্তি বিধান ও পথশিশুদের জীবন মানোন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

সরকার পিছিয়ে পড়া এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, কল্যাণ ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দেশব্যাপী গ্রামীণ এবং শহর উভয় এলাকায় সমাজের অবহেলিত, বেকার, ভূমিহীন, অনাথ, দুস্থ, ভবঘুরে, নিরাশ্রয়, শারীরিক প্রতিবন্ধী, দরিদ্র ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের কল্যাণ ও উন্নয়নে বহুমাত্রিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। দুস্থ শিশুদের সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সমাজে সঠিকভাবে পুনর্বাসিত করার উদ্দেশ্যে গাজীপুরের কোনাবাড়ী, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় ছেলে পথশিশুদের জন্য ২টি ও গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়েদের জন্য ১টি পুনর্বাসন কেন্দ্র চালু রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে দুস্থ শিশুদের প্রতিপালন; পারিবারিক পরিবেশে স্নেহ-ভালোবাসা ও আদর-যতেœর সথে লালন পালন; শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান; নিবাসীদের শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানবিক উৎকর্ষ সাধন এবং পুনর্বাসন ও স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

আজকের শিশুরাই আমাদের মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্নের রূপকার। এ বাস্তবতায় শিশুর সুরক্ষা, শারীরিক ও মানসিক বিকাশের উপযোগী পরিবেশ সৃজনে সরকার আন্তরিক। এর মধ্যে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের উন্নয়নে ড্রপইন সেন্টার, জরুরি রাত্রিকালীন আশ্রয়, শিশুবান্ধব অঞ্চল, ওপেন এয়ার স্কুল, শুল্কবিহীন শিশু হেল্পলাইন  প্রভৃতি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এছাড়া জাতীয শিশুনীতি এবং শিশুর প্রারম্ভিক যতœ ও বিকাশে সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।

সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুরা আমাদের সমাজেরই অংশ। তাদের অনাদর, অবহেলায় ফেলে রাখলে সমাজে সন্ত্রাস, মাদকাসক্তিসহ নানা অবক্ষয় বিস্তার লাভ করবে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘ শিশুদের অধিকারের ক্ষেত্রে ১০টি নীতি ঘোষণা করেছে। শিশুরা সুস্থ, স্বাভাবিক ও স্বাধীন মর্যাদা নিয়ে যাতে শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিকভাবে পূর্ণ বিকাশ লাভ করতে পারে, সে ব্যাপারে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

বর্তমান সরকার পথশিশুদের উন্নয়নে ডেটাবেস তৈরি করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছে। তাদের লেখাপড়ার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সাফল্যও পাওয়া যাচ্ছে। অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে।  কেউ সরকারি সুযোগ কাজে লাগিয়ে লেখাপড়া শিখে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করে।

পথশিশুরা আমাদেরই সন্তান। তাদের প্রতি সামান্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে তারা দেশের জন্য সম্পদে পরিণত হতে পারে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..