পাঠকের চিঠি

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে যেসব পদক্ষেপ নেয়া জরুরি

পাঠকের চিঠি

প্রতিনিয়ত সড়কপথ যেন মৃত্যুকূপে পরিণত হচ্ছে। দেশে প্রতিদিন সম্ভাবনাময় ও স্বপ্নের অনেক জীবন কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে রক্তাক্ত হয়ে লাশ হয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে। দেশের ১০টি জেলায় গত শুক্রবারে এক দিনেই সড়ক-মহাসড়কের বেপরোয়া যানবাহনের কারণে প্রাণহানি ঘটেছে ২৪ জনের, যা দুঃখজনক তো বটেই, একইসঙ্গে উদ্বেগের বিষয়ও।

গত মাসে দেশে সড়ক, রেল ও নৌপথে মোট ৪৪৯টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫৩৯ জন এবং আহত হয়েছেন ৭৭৪ জন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এছাড়া সম্প্রতি রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের অক্টোবর মাসেই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩১৪টি। এতে নিহত হয়েছেন ৩৮৩ জন এবং আহত হয়েছেন ৬৯৪ জন।

বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চালানো, বিপজ্জনক ওভারটেক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন, অদক্ষ ও মাদকাসক্ত চালক কর্তৃক গাড়ি চালানো, রাস্তাঘাট নির্মাণে ত্রুটি, পথচারী-সেতু ব্যবহার না করা, ঝুঁকিপূর্ণভাবে রাস্তা পারাপার এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। দুর্ঘটনার এসব কারণ জানা থাকা সত্ত্বেও কেন শৃঙ্খলা ফিরছে না সড়কে? কবে নাগাদ নিরাপদ হবে আমাদের সড়কপথ?

‘নিরাপদ সড়ক চাই’-এর তথ্যমতে, দেশে সড়কে প্রতিদিন গড়ে ১৮ জনের প্রাণহানি হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ফলে মানবিক ও অর্থনৈতিক যে ক্ষয়ক্ষতি হয়, তা নির্ণয় করা দুরূহ। এক হিসাবে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় যারা মৃত্যুবরণ করে, তাদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এই পরিবারগুলো রীতিমতো পথে বসে যায়। আহতদেরও অনেকে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে তাদের পরিবারও বিপন্ন হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতির পরিমাণ ধরা হলে, তা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) পাঁচ শতাংশ।

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন নয়। এরই মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসের লক্ষ্যে আদালত গাড়ি চালকদের ডোপ টেস্টসহ বেশকিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। আশা করি আদালতের নেয়া উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। একইসঙ্গে সড়কপথ নিরাপদ করতে নিন্মোক্ত উদ্যোগ নেয়া অতীব জরুরি বলে মনে করি।

প্রথমত, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিআরটিএ থেকে দুর্নীতি সমূলে উৎপাটন করার বিকল্প নেই। দ্বিতীয়ত, চালকদের বেপরোয়া প্রতিযোগিতার মনোভাব ও গতি রুখতে সচেতনতা এবং প্রক্ষিণের ওপর জোর দিতে বলা হলেও কর্তৃপক্ষ বরাবরই ব্যর্থ হয়। সুতরাং এখানে যথাযথ উদ্যোগ নিতেই হবে। তৃতীয়ত, লাইসেন্স ও ফিটনেসবিহীন গাড়ির যানচলাচল নিষিদ্ধ করাসহ নতুন করে লাইসেন্স ব্যতীত ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলাচল করতে যেন না পারে, সেদিকে কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি দেয়ার বিকল্প নেই। দেশে নিবন্ধিত যানবাহন ৪৪ লাখ আর চালকের নিবন্ধন সংখ্যা ৩২ লাখ। এক্ষেত্রে যে ১২ লাখ চালক কম, তারা স্বভাবতই ভুয়া চালক; আর তাদের দ্বারাই দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। চতুর্থত, নির্মাণত্রুটির কারণে সড়কে যেসব দুর্ঘটনাপ্রবণ ব্যাক স্পেস রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সংস্কার করা জরুরি। পঞ্চমত, সড়কে পুলিশ ও মোবাইল কোর্টকে আরও বেশি সক্রিয় করার পাশাপাশি ট্রাফিক আইনকে ঘুষমুক্ত রাখা ও চালকদের ট্রাফিক আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা জরুরি। ষষ্ঠত, বেশিরভাগ সময় সড়কে সমাজের বিত্তবান বা প্রভাবশালী কেউ নিহত হলে সেক্ষেত্রে চালককে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়। অপরদিকে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে চালক গ্রেপ্তার কিংবা আর্থিক ক্ষতিপূরণ কোনোটাই পায় না। সুতরাং এক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি। সপ্তমত, পথচারী ও যাত্রীদের অধিক সতর্ক করার কোনো বিকল্প নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রচেষ্টায় পথচারীদের ফুটপাত, আন্ডারপাস ও পথচারী-সেতু ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে। একইসঙ্গে আমাদের নিজ নিজ জায়গা থেকেও সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই।

অনাকাক্সিক্ষত সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ পদক্ষেপ এবং জনগণের সচেতনতা ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এমনটাই প্রত্যাশা।

মোহম্মদ শাহিন

শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..