প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সড়ক দুর্ঘটনায় আর কত প্রাণ যাবে?

রামিছা বিলকিছ জেরিন: বাংলাদেশ বিভিন্ন দিক থেকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে গেলেও, সড়কপথের উন্নয়ন এখনও আশানুরূপ হয়ে ওঠেনি। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় নিরীহ প্রাণ যাচ্ছে। কতশত পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। কত স্বপ্ন ভঙ্গুর হয়ে গেছে। কত মা-বাবা হারিয়েছেন তার সন্তানকে, সন্তানরা হারিয়েছে বাবাকে, আত্মীয়স্বজন হারিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৫ হাজার ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। আবার সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব মতে, প্রতিদিন সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান প্রায় ৩০ জনের বেশি।  সে হিসাবেও বছরে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১১ হাজার জন। আবার বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বছরে ১২ হাজার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রেকর্ড অনুযায়ী ২০ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। অন্যদিকে বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই) এবং নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর ১২ হাজার মানুষ নিহত হন। বিভিন্ন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানে নিহতের সংখ্যা কিছু তারতম্য থাকলেও বছরে ১০-১২ হাজার মানুষ শুধু সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার তথ্য আমাদের পিলে চমকে দেয়ার মতো। সড়ক দুর্ঘটনায় এত মানুষের মৃত্যু হলেও যেখানে প্রশাসন বা চালকদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এটা ঠিক, পৃথিবীর সব দেশেই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু সেসব দেশে যথাযথভাবে বিচারের মুখোমুখি হন চালকরা। এক্ষেত্রে আমাদের দেশে ব্যতিক্রম। আমাদের দেশে কোনো বিচারের আওতায় আনা হয় না। আর আনা হলেও কোনো সুষ্ঠু বিচার হয় না। বরং  দুর্নীতি লক্ষ্য করা যায়।

২০২১ সালে ধারণা করা হয়েছিল, এত বেশি সড়ক দুর্ঘটনা হতে থাকলে এটি আর দুর্ঘটনা থাকবে না। এটি দুর্যোগে পরিণত হবে। হলোও তাই। ২০২২-এ এসে এত বেশি সড়ক দুর্ঘটনা হচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই। প্রতিদিনই খবরের কাগজে প্রধান খবরের একটি সড়ক দুর্ঘটনা। গত কয়েক দিনে রাজশাহী, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নাটোর ইত্যাদি শহরে সড়ক দুর্ঘটনা বেশি দেখা যাচ্ছে। রাজশাহীতে মা-মেয়েসহ প্রাণ চলে গেছে ৩ জনের। এছাড়া আরও অনেকে আহত হয়েছেন।  গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৮-এ পৌঁছেছে। ময়মনসিংহের বিভিন্ন উপজেলায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো দুর্ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে ফুলপুর, ধোবাউড়া, ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা রোডের দিকে। এরকমভাবে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে।

গত ঈদের ছুটিকে ঘিরে সারাদেশে সড়কপথে ৩ হাজার ১৭৮-এরও বেশি  দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এতে নিহত হয়েছেন ৬৮১ জন, আহত হয়েছেন ২ হাজার ৭৭ জন। কেবল মোটরসাইকেলেই দুর্ঘটনা ১ হাজার ৬১৮টি।  নিহত হয়েছেন ১৯০ জন, আহত হয়েছেন ৯৬৮। গত ২৮ এপ্রিল থেকে ৯ মে পর্যন্ত ১২ দিনের এই হিসাব বানিয়েছে স্বেচ্ছাসেবী  সংগঠন সেভ দ্য রোড।

সেভ দ্য রোডের প্রতিবেদন বলছে, ২৮ এপ্রিল থেকে শুরু ৯ মে পর্যন্ত ১২ দিনে যেসব দুর্ঘটনা ঘটেছে, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৬১৮টি দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল মোটরসাইকেল। এসব মোটরসাইকেল চালানোর সময় নিয়ম না মানা ও হেলমেট ব্যবহারে অনীহার কারণে এসব দুর্ঘটনায় ১৯০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, আহত হয়েছেন আরও ৯৬৮ জন। অন্যদিকে অসাবধানতা ও ঘুমন্ত চোখে ক্লান্তিসহ দ্রুত যানচালনার কারণে ৪০৭টি ট্রাক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৬৮ জন, আহত হয়েছেন ৩২১ জন। একই সময়ে খানাখন্দ, অচল রাস্তাঘাট ও সড়কপথে নৈরাজ্যের কারণে বাস দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪৬৭টি, যাতে ১৫৪ জন নিহত ও ৩১০ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া পাড়া-মহল্লা ও মহাসড়কে অসাবধান চলাচলের কারণে লরি-পিকআপ, নসিমন-করিমনসহ ব্যাটারিচালিত রিকশা-সাইকেল ও সিএনজিচালিত অটোরিকশায় দুর্ঘটনা ঘটেছে ৬৮৬টি, যাতে ১৬৯ জন নিহত ও ৪৭৮ জন আহত হয়েছেন।

প্রতিবেদনের তথ্য আরও বলছে, ৪ থেকে ৯ মে পর্যন্ত ১২ দিনে নৌপথে দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৩৭টি। এসব দুর্ঘটনায় ২৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, আহত হয়েছেন ৫৬১ জন। একই সময়ে রেলপথে দুর্ঘটনা ঘটেছে ২২৮টি, যাতে ১৭ জন নিহত ও ২৫৬ জন আহত হয়েছেন। আর এই ১২ দিনে আকাশপথে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলেও বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনার কারণে অসুস্থ হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ।

সড়ক দুর্ঘটনা এখন আর দুর্ঘটনা নয় বরং দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা দিন দিন বেড়ে চলেছে, যা আমরা প্রতিদিন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকলে কোথাও না কোথাও সডক দুর্ঘটনার খবর দেখতে পাই; যা বাংলাদেশের মানুষের জন্য অশনিসংকেত হয়ে দেখা দিয়েছে। ২০১৮ সালে সডক দুর্ঘটনা কমাতে বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ, ভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রীরা নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন করেছিল। যার পরিপেক্ষিতে সড়ক ও নৌ-পরিবহনমন্ত্রী কিছু নতুন আইন প্রণয়ন করেছিল। তারপরও বাংলাদেশ থেকে সড়ক দুর্ঘটনা কমছে না।

সড়ক দুর্ঘটনা হওয়ার মৌলিক কারণ ও এর থেকে প্রতিকার পাওয়ার উপায়

বিভিন্ন কারণে সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়ে থাকে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ১. অদক্ষ চালক, ২. ত্রুটিপূর্ণ মোটরযান, ৩. বিভিন্ন প্রকার রোড সিগন্যাল মেনে না চলা, ৪. রাস্তা পাশের ফুটপাতে অস্থায়ী দোকান নিয়ে বসা, ৫. অসতর্কতার সঙ্গে পথচারীদের সড়ক পারাপার হওয়া, ৬. অতিরিক্ত ওভার টেকিং করা প্রভৃতি।

অদক্ষ চালক: একটি ইঞ্জিনচালিত যান চালানোর পূর্বশর্ত হলো এর চালক দক্ষ হওয়া। একজন ড্রাইভারকে অবশ্যই সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত হতে হবে এবং দীর্ঘদিনের মোটর চালানোর ব্যবহারিক দক্ষতা থাকতে হবে। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন: একটি মোটর যান চালানোর পূর্বশর্ত হলো মোটরযানের ইঞ্জিন, বডি, চেসিস ইত্যাদি মোটরযানের ম্যানুয়াল দেখে কত বছর পর্যন্ত চালানো সম্ভব তার ওপর ভিত্তি করে যান চালানো এবং মোটরযান অকেজো হয়ে গেলে তা বাদ দিয়ে অথবা রিপেয়ারিংয়ের মাধ্যমে যান চালাতে হবে। অন্যথায় যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ৩. বিভিন্ন প্রকার রোড সিগন্যাল মেনে না চলা রোড সিগন্যাল চার প্রকার. যথাÑক. সক্রিয় বা বিভিন্ন প্রকার আলোর সংকেত; খ. নিষ্ক্রিয় বা রাস্তার পাশে সাইনবোর্ডের সংকেত; গ.  ট্রাফিক পুলিশের হাত দ্বারা সংকেত; ঘ. মোটরযানের সিগন্যাল লাইট দ্বারা সংকেত ও চালকের হাত দ্বারা সংকেত।

একজন মোটরচালককে অবশ্যই উপরোক্ত চারটি সিগন্যাল মেনে চলে যান চালাতে হয়।

৪. সড়কের পাশে ফুটপাতে অস্থায়ী দোকান নিয়ে বসাÑকিছু অসাধু ব্যবসায়ী অধিক লাভের আশায় রাস্তার ধারে এমনকি রাস্তার ওপরেও বিভিন্ন প্রকার পণ্যের দোকান দিয়ে বসে; এতে করে রাস্তার জায়গা কমে যায়। যার ফলে নির্বিঘেœ চলাচল করতে অসুবিধা হয়। ৫. অসতর্কতার সঙ্গে পথচারী পারাপার হওয়াÑঅধিকাংশ দুর্ঘটনার মূল কারণ, অসতর্কতার সঙ্গে পথচারী রাস্তা পারাপার হওয়া। সাধারণত হাইওয়ে রোডগুলোয় মোটরযান অত্যধিক গতিতে চলাচল করে। আর এই হাইওয়ে রোডের ওপর দিয়ে স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি, বাজার, মসজিদ ইত্যাদিতে যাওয়া-আসার জন্য প্রতিনিয়ত পথচারীকে রাস্তা পার হতে হয়। অধিকাংশ জায়গায় ফুটওভার ব্রিজ থাকলেও পথচারীরা তা ব্যবহার না করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার হয়। যার ফলে দুর্ঘটনা আরও বৃদ্ধি পায়। ৬.  অতিরিক্ত ওভারটেকিং করাÑপ্রতিদিনই কোনো না কোনো মোটরযান চালক অন্য একটি মোটরযানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ওভারটেকিং করে। এতে করে মোটরযানের গতি চালকের কন্ট্রোলের বাইরে চলে যায়; ফলে দুর্ঘটনার শিকার হয়।

এসব সমস্যা দূর করতে হলে ড্রাইভারকে বিভিন্ন প্রকার ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে, মোটরযান চলনায় দক্ষ হতে হবে, সড়কের পাশে অস্থায়ী স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে এবং পথচারীদের সতর্কতার সঙ্গে রাস্তা পারাপার হতে হবে। এ জন্য পথচারীকে ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহারে বাধ্য করতে হবে। কারণ অধিকাংশ জায়গা ফুট ওভারব্রিজ থাকা সত্ত্বেও তারা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সড়কের ওপর দিয়ে রাস্তা পারাপার হয়। সড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোÑযেমন স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি, মসজিদ, বাজার প্রভৃতিতে চলাচলের সুবিধার্থে আরও অধিকসংখ্যক ফুট ওভারব্রিজ প্রয়োজন। তাহলে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার নামক মৃত্যুকূপ থেকে চালক, যাত্রী এবং পথচারীরা বাঁচতে পারবেন এবং নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবেন।

শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়