প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

 ‘সন্তানদের সময় দিন যত্ন নিন’

মো. ফখরুল হোসেন। মাদকাসক্তদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি ও চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে রাজধানীর পান্থপথ গ্রিন রোডে গড়ে তোলেন অত্যাধুনিক সুবিধাসমৃদ্ধ মনোরোগ ও মাদকাসক্তি চিকিৎসাকেন্দ্র ব্রেন অ্যান্ড লাইফ হসপিটাল। সম্প্রতি মদকাসক্তির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এস আর হাসান চৌধুরী

শেয়ার বিজ: মানুষ কেন মাদকাসক্ত হয়?

মো. ফখরুল হোসেন: পারিপার্শ্বিক ও সামাজিক অবস্থা, সহপাঠী এবং মাদকাসক্ত বন্ধুবান্ধবদের মাধ্যমে প্রথমে সূচনা হয়। এছাড়া মাদকের সহজলভ্যতাও একটি কারণ। নানা চাপ, দারিদ্র্য এবং সামাজিক ও পারিবারিক অসঙ্গতিও এর অন্যতম একটি কারণ। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, কারণ এই রোগ চিকিৎসা ও সুব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব।

শেয়ার বিজ: কেন মাদকাসক্ত ব্যক্তির চিকিৎসা জরুরি?

ফখরুল হোসেন: মাদকাসক্তদের কষ্ট থাকার পাশাপাশি তার পরিবারও তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে। রাগ, জেদ, তুচ্ছ ঘটনাকে জটিল করে দেখা, সন্দেহ করা প্রভৃতি কারণে প্রায়ই কাছের মানুষের সঙ্গে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যেতে পারে। মাদকাসক্ত হলে ব্যক্তির লেখাপড়া ও পেশাগত কাজ করতে অসুবিধা হয়, যার কারণে ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়। ব্যক্তি নিজেই শুধু আর্থিকভাবে দুর্দশার মধ্যে পড়ে না, বরং তার পরিবার এমনকি দেশের জিডিপির ওপর তার একটি প্রভাব পড়ে। তাই এদের রোগকে অবহেলা না করে, লুকিয়ে না রেখে, লোকলজ্জার ভয় কাটিয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে চিকিৎসা নেওয়া করা প্রয়োজন।

শেয়ার বিজ: প্রাথমিক পর্যায়েই কীভাবে বোঝা যাবে ছেলেটি মাদকাসক্ত?

ফখরুল হোসেন: সাধারণত দৈনন্দিন জীবনযাপনে ব্যস্ততার মধ্যে অনেক সময় পরিবারের তরুণ সদস্যদের প্রতি নজর রাখা সম্ভব হয় না। অভিভাবকরা নিশ্চিত থাকেন এই ভেবে যে তারা লেখাপড়া, টিউশন, খেলাধুলা ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে ব্যস্ত আছে। কিন্তু তারা যদি সামান্য সজাগ থাকেন তাহলে হয়তো অনেক বিপদ এড়ানো যায়। চালচলন, ব্যবহার ও বাচনভঙ্গির পরিবর্তন নিকটাত্মীয়দের পক্ষেই ধরা সম্ভব। মাদকাসক্ত ব্যক্তি নিজেও বুঝতে পারেন রোগটি দিন দিন জটিল হচ্ছে, কিন্তু মাদকের ভয়াবহ থাবা থেকে নিজেকে উদ্ধার করার কোনো মানসিক শক্তি আর অবশিষ্ট থাকে না।

শেয়ার বিজ: আক্রান্ত ব্যক্তিকে কীভাবে নেশামুক্ত করা যায়?

ফখরুল হোসেন: প্রত্যেক রোগের যেমন স্টেজ বা পর্যায় থাকে, তেমনি মাদকেরও কয়েকটি পর্যায় রয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় (মাদকাসক্তি শুরুর প্রথম তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে যদি মাদকাসক্ত নিরাময়ের পরিকল্পনা নেওয়া যায় তবে খুব ভালো ফলাফল হয়। তবে কয়েক বছর ধরে মাদকাসক্তিও নিরাময় সম্ভব।

মাদকাসক্ত নিরাময়ের তিন রকম চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে। যেমন শুধু ওষুধ সেবন, ওষুধ ও মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা এবং নিরাময় কেন্দ্রে থেকে ওষুধ ও মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা।

শেয়ার বিজ: মাদকাসক্তদের অভিভাবকদের উদ্দেশে কিছু বলুন।

ফখরুল হোসেন: আসক্তজন জানে, খারাপ কাজ করছে সে। তাই লুকাতে থাকবে আসক্তির কথা! অস্বীকার করবে, আলোচনা এড়িয়ে যাবে। কিন্তু মূল টার্গেট হবে অস্বীকারের বৃত্ত থেকে তাকে বের করে আনা, আড়ালে থাকার গোপন পর্দা সরিয়ে দেওয়া। সেক্ষেত্রে বিতর্ক না করে ধৈর্যের সঙ্গে লেগে থাকতে হবে।

স্বীকারোক্তির পরও অনেক অজুহাত তুলে ধরবে সে। বলতে পারে, ‘আর মাদক নেব না’, ‘ছেড়ে দিলাম আজ থেকে’ ও ‘আমার ইচ্ছাশক্তিই প্রধান’, ‘নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি হওয়ার দরকার নেই’ প্রভৃতি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ভালো উপায় হচ্ছে, নরমভাবে তার বক্তব্য ও আচরণের অসামঞ্জস্য তুলে ধরা। মনে রাখতে হবে, এই তুলে ধরার বিষয়টি হতে হবে শালীনভাবে, দক্ষতার সঙ্গে। অশালীনভাবে মতানৈক্য দেখানো চলবে না। তাকে দোষ দেওয়াও যাবে না। জেনে রাখা ভালো, আসক্তজনের মন দুই ভাগ হয়ে যায়, এক মন বলে মাদক ছেড়ে দেব; আরেক মন বলে ছাড়া যাবে না, ছাড়লে কষ্ট হবে। তবে চিকিৎসার একপর্যায়ে বিভক্ত মন জোড়া লাগিয়ে ইচ্ছাশক্তি জোরালো করা সম্ভব। নিজের ও পারিবারিক উদ্যোগ বিফল হলে মাদকাসক্তি চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, অভিজ্ঞ কোনো কাউন্সেলর, অভিজ্ঞ সাইকোলজিস্ট বা অভিজ্ঞ কোনো চিকিৎসকের সাহায্য নিতে হবে। লেগে থাকতে হবে। বিফলে হতাশ হলে চলবে না। লেগে থাকলে অবশ্যই সফলভাবে আসক্ত ব্যক্তিদের রাজি করানো যায়।

তরুণ, মেধাবী ও সমাজসংস্কারক

 

 

 

 

মানসিক আচরণে মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি

আচরণের অস্বাভাবিকতাকে মানসিক রোগ বলে। অসুখ, টেনশন ও ট্রমাটিক অবস্থা মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হলে এবং মাদকদ্রব্য সেবনের পাশাপাশি কিছু বংশগত রোগ দীর্ঘকাল ধরে চলে এলে মানুষ মানসিক অসুস্থতায় ভুগতে পারে।

মানসিক রোগীদের পাগল বলা ঠিক নয়। ‘পাগল’ শব্দটি বিশ্ব স্থাস্থ্য সংস্থা বাতিল ঘোষণা করেছে। আমরা সমস্যাগ্রস্ত মানুষকে বলবো মানসিকভাবে অসুস্থ। এমন ব্যক্তিকে পাগল বলা অপরাধ।

মানসিক রোগগুলো

অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার

অস্থিরতা, অতিরাগ, অতিরিক্ত ঘাম,

হাত-পায়ের তলা জ্বলা ও ঘামা। মাথা দিয়ে গরম ভাপ বের হওয়া প্রভৃতি।

চিকিৎসা: প্রথমে মেডিকেশন, পরে সাইকোথেরাপি নিতে হবে।

বাইপোলার ডিসঅর্ডার

অতিরিক্ত খরচ করা, অতিরিক্ত সাজগোজ, বেখাপ্পা কথাবার্তা, নিজেকে বড় মনে করা, ড্যামকেয়ার ভাব, মিথ্যা বলা, বেশি কথা বলা, কোনোকিছুতে তুষ্ট না থাকা প্রভৃতি।

চিকিৎসা: হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়। প্রথমে মেডিকেশন, পরে সাইকোথেরাপি দিতে হবে।

সিজোফ্রেনিয়া

চোখে কোনো কাল্পনিক চরিত্র দেখা, গায়েবি আওয়াজ শোনা, আজগুবি গন্ধের কথা বলা, একদিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা প্রভৃতি।

চিকিৎসা: হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা

করাতে হয়।

মাদক সেবন

এরা বিভিন্ন মাদকদ্রব্য সেবন করে, কাজ করতে পারে না। চিকিৎসায় এরা সুস্থ-সুন্দর জীবনে ফিরতে পারে।

চিকিৎসা: হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করাতে হয়। মেডিকেশন ও সাইকোথেরাপি।

ডিপ্রেশন

এসব রোগীর কাজে যতœ নেই, নিজের যতœ নেই, মনোযোগের অভাব থাকে, কেউ বেশি খায়, কেউ খেতেই চায় না এবং কেউ আত্মহত্যা করতে চায় বা করার স্টেপ নেয়। মনে সুখ-শান্তি কিছু থাকে না।

চিকিৎসা: হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়। মেডিকেশন ও সাইকোথেরাপি দিতে হয়।

শুচিবাই

একই চিন্তা বারবার করা। ফলে আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যায়। যেমন, বারবার একই কাজ করা।

চিকিৎসা: মেডিকেশন, সাইকোথেরাপি, সিভিয়ার বা প্রফাউন্ড কেস হলে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করানো ভালো।

এছাড়া ম্যানিক, প্যানিক, অতিরাগ, নিজের ক্ষতি বা হাত-পা কাটা, কপাল চাপড়ানো, অতি ভয় বা ফোভিয়া, অতিচঞ্চলতা, স্থবিরতা, চুরি করা, নিজের মাথার চুল ছেঁড়া প্রভৃতি রোগও অনেক মানুষের মধ্যে দেখা যায়।

যেখানে চিকিৎসা করবেন

স    বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

স    নাসিরউল্লাহ সাইকোথেরাপি ইউনিট (এনপিইউ)

স    সেইফ হাউজ

এছাড়া আরও অনেক সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে এ রোগগুলির চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। সাইকিয়াট্রিস্ট ও সাইকোলজিস্টরা এই সেবা দিয়ে থাকেন।

 

হ     ফাতিমা খাতুন

সাইকোলজিস্ট সেইফ হাউজ ও লেকচারার সাইকোলজি