প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সন্তান পরিপালনে ভুল চর্চা

তানজিয়া আহমেদ সাকি: যেসব দম্পতির সন্তান আছে, এরা থাকে তাদের জীবনের ভাবনা-চিন্তার সিংহভাগ জুড়ে। অনেক অভিভাবককে দেখা যায় পরিচয় প্রকাশে নিজেদের সঙ্গে সন্তানদের বিষয়টি অত্যন্ত গর্ব সহকারে বলতে। সন্তানকে নিয়ে মা-বাবার এ ধরনের অভিব্যক্তি স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে বর্তমান বাঙালি সমাজের বাস্তবতা এরকম যে, সন্তান জন্মের পর তার স্বার্থ, উন্নতি ও সমৃদ্ধির চিন্তায় মা-বাবা নিজেদের বিসর্জন দেন তিলে তিলে। এ প্রবণতা কি শুধু এ যুগের মানুষের মধ্যেই? বিষয়টি সেরকম নয়। আগেও ছিল। মধ্যযুগের কবি ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর নিজের কথা না ভেবে সন্তানের স্বার্থ ও সমৃদ্ধির চিন্তা করেছেন। কবিতায় তিনি লিখেছেন, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে।’ কবির এ প্রার্থনায় যেন বাঙালির নিজ স্বার্থ উপেক্ষা করে সন্তানের চিরন্তন কল্যাণ কামনাই ফুটে উঠেছে।

বস্তুত প্রত্যেক মা-বাবাই সন্তানকে ভালোবাসেন। ব্যক্তিগত আকাক্সক্ষার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে চান তাদের মাধ্যমে। কিন্তু দেখা যায়, খুব বেশি কল্যাণ কামনা করতে গিয়ে তাদের কেউ কেউ এমন কিছু করে ফেলেন, যেটা সন্তানের জীবনে বয়ে আনে অকল্যাণ। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সন্তান যে একজন স্বতন্ত্র ও স্বাধীন মানুষ, একথা ভুলে যান মা-বাবা। তাদের ওপর একের পর এক চাপিয়ে দেওয়া হয় প্রত্যাশা। এ চাপ সে কতটুকু নিতে পারছে, সেদিকেও র্ভ্রক্ষেপ থাকে না তাদের।

প্রত্যাশার চাপ শুরু হয় শিশুকাল থেকে। একটি শিশুর শিক্ষাজীবন শুরু হয় কিন্ডার গার্টেন কিংবা কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ঢাকা শহরের কথাই যদি বলি, এখানকার প্রায় সব স্কুলেই থাকে পড়ালেখার অত্যধিক চাপ এবং এটা শুরু হয় শিশুর পড়ালেখায় হাতেখড়ি থেকে। বিদ্যালয়ের পাশাপাশি থাকে কোচিং সেন্টারের পরীক্ষা, বাসায় গৃহশিক্ষকের পড়া, ক্লাসের বিভিন্ন টেস্ট, সাময়িক পরীক্ষা ইত্যাদি। পড়ালেখা ছাড়া যেন তার জীবনে আর কিছু নেই। সময়-সুযোগ করে যদিও শিশুটিকে কোনো বিনোদনমূলক কাজ, যেমন : গানবাজনা, নৃত্য, ছবি আঁকা, বিতর্ক, খেলাধুলা ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়, সেখানেও দেখা যায় তাদের প্রতিযোগিতায় ফেলতে। সন্তানকে শেখানো হয় প্রথম হতে।

মা-বাবারা হয়তো মনে করেন, আমার সন্তান যদি অন্য কারও সন্তানের কাছে হেরে যায় কিংবা সে কোনো প্রতিযোগিতায় পুরস্কার না পায়, তাহলে সমাজে মুখ দেখাবো কীভাবে? এমন পরিস্থিতিতে অনেক মা-বাবাই সন্তানকে মুখের ওপর বলে দেন, তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। কিন্তু সত্য হলো, কাকে দিয়ে কী হবে, সেটা কে জানে! যে শিশু বড় হয়ে অনেক বড় এবং ভালো কিছু করবে, তার শৈশবে স্কুলের পরীক্ষায় প্রথম না হলে কিংবা খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করে একটি পুরস্কার না পেলে কী এমন ক্ষতি!

আসল কথা হলো, প্রত্যেক মা-বাবার উচিত সন্তানকে উৎসাহ জোগানো। এতে তার মধ্যে তৈরি হয় উদ্দীপনা। এটা করলে শিশুর মনে তৈরি হয় আত্মবিশ্বাস। ভালো কিছু করার প্রেষণাও তৈরি হয় তার মধ্যে। অন্যদিকে সবসময় তার ব্যর্থতার সমালোচনা করলে মনে জš§ নেয় হতাশা। আমরা জানি, হতাশা মানুষকে কুরে কুরে বিনষ্ট করে। শিশুর ক্ষেত্রেও কিন্তু এর ব্যত্যয় ঘটে না। শিশুর ওপর প্রত্যাশার চাপ সৃষ্টি করা হলে সেটা

পূরণ করতে না পারলে তার মধ্যে হতাশা আরও বৃদ্ধি পায়। কোনো শিশুর বিকাশের জন্য এটা মঙ্গলজনক নয়।

এ প্রসঙ্গে সমাজে প্রচলিত আরও একটি চর্চার কথা বলি। এক শিশু বেহালা বাজানো শিখতে চায়। তাকে এটা শিখতে না দিয়ে মা-বাবা তাকে ভর্তি করালেন আর্ট স্কুলে। কেননা অভিভাবকের পরিকল্পনা সন্তানকে পড়াবেন বিজ্ঞান বিভাগে। এ বিভাগে ভর্তি হতে হলে তাকে অঙ্কন জানতে হবে, এই ভেবে। এমন একটা সহশিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে তাকে যুক্ত করা হলো যে, এতেও থাকে মা-বাবার অভিপ্রায়ের প্রাধান্য। বাস্তবতা হলো, শিশু এটাকে আনন্দের সঙ্গে নিতে পারে না। সহশিক্ষা কার্যক্রম শিশুর মানসিক বিকাশের জন্যই জরুরি। কিন্তু নিরানন্দ সহশিক্ষায় শিশুর মানসিক

বিকাশ হয় না ঠিকমতো।

পরিবারই শিশুর প্রথম ও প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র। এ বোধটুকু মাথায় রেখে সন্তানদের শিক্ষা দিলে তাদের মনোদৈহিক বিকাশও ঠিকমতো হয়। এখন সবাই সন্তানকে ভালো স্কুলে ভর্তি করাতে ব্যতিব্যস্ত। মা-বাবার মধ্যেও এজন্য দেখা যায় অন্তহীন প্রচেষ্টা। তাতে সন্তানের ওপর চাপের সীমা থাকে না। এটা মনে রাখা দরকার, ভালো স্কুল নয় আমাদের প্রয়োজন সন্তানের সুশিক্ষা। যে শিশুটির শৈশব হওয়া উচিত ছিল দুরন্তপনার, ছুটে বেড়ানোর, রঙিন ঘুড়ি ওড়ানোর আমাদেরই প্রত্যাশার চাপে সেই শৈশব হয়ে যায় ফিকে, বর্ণহীন। বড় হয়ে যখন সে বুঝতে শিখবে, তখন তাকে শৈশবের এই আনন্দময় দিন কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে কি?

সন্তান জীবনের সবক্ষেত্রে শুধু মা-বাবার অধীন ও তাদের প্রত্যাশাই পূরণ করবে এরকম ভাবা ঠিক নয়। সন্তানকে ছোটবেলা থেকে যথাযথ শিক্ষা ও মূল্যবোধের ধারণা দিলে, তাকে প্রাণ-প্রকৃতি ও প্রাত্যহিক জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলে সে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে বাধ্য। তা না করে পাহাড়সম প্রত্যাশার বোঝা মাথায় চাপিয়ে দিয়ে তাকে পড়াশোনায় ব্যতিব্যস্ত করে রাখলে, স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করলে তার মানসিক বিকাশ হতে পারে ভিন্ন ধারায়। অনেক অভিভাবক যেটা প্রত্যাশা করেন না। তাই সন্তান লালন-পালনে অতিরিক্ত সতর্কতা কিংবা প্রত্যাশার চাপ

নয়, তাকে বেড়ে উঠতে দেওয়া উচিত নিজের মতো। মা-বাবা শুধু জোগাতে পারেন উপযুক্ত পরিচর্যা ও প্রয়োজনীয় সমর্থন।

 

শিক্ষক, অক্সফোর্ড টিচিং হোম