দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

সবার জন্য নিরাপদ বাসস্থানই মুজিববর্ষের লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী

শেয়ার বিজ ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সবার জন্য নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করাই হবে মুজিববর্ষের লক্ষ্য। দেশের প্রতিটি মানুষ যাতে উন্নত জীবনযাপন করতে পারে। দেশের ভূমিহীন-গৃহহীন মানুষকে ঘর দিতে পারার চেয়ে বড় কোনো উৎসব আর কিছুই হতে পারে না। সূত্র: বাসস

মুজিববর্ষ উপলক্ষে গতকাল ভূমি-গৃহহীন পরিবারকে জমি ও গৃহ প্রদান উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারপরও সীমিত আকারে আমরা করে দিচ্ছি এবং একটা ঠিকানা আমি সব মানুষের জন্য করে দেব।’

প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠানে সংযুক্ত হয়ে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে ৬৬ হাজার ১৮৯টি ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারকে জমি ও গৃহ প্রদান করা হয়। পাশাপাশি তিন হাজার ৭১৫টি পরিবারকে ব্যারাকে পুনর্বাসন করা হয়।

গণভবনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও) এবং দেশের ৪৯২টি উপজেলা প্রান্ত ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত ছিল। শেখ হাসিনা বলেন, ‘মুজিববর্ষের অনেক কর্মসূচি আমাদের ছিল। করোনার কারণে আমরা সেগুলো করতে পারিনি। আমরা এই একটি কাজের দিকেই (গৃহহীনকে ঘর করে দেয়া) নজর দিতে পেরেছি। আজকে এটাই আমাদের সব চেয়ে বড় উৎসব।’

অনুষ্ঠানে সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ওপর একটি প্রামাণ্য চিত্র পরিবেশিত হয়। প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার কাঁঠালতলা গ্রাম, নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুর, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার উপকারভোগীদের সঙ্গে কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে বিভিন্ন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা উপকারভোগীদের মাঝে বাড়ির চাবি এবং দলিল হস্তান্তর করেন। পিএমও সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের যারা শরণার্থী (রোহিঙ্গা) তাদের জন্যও আমরা ভাসানচরে ঘর করে দিয়েছি। এই গৃহায়ন প্রকল্পে কোনো শ্রেণি বাদ যাচ্ছে না, বেদে শ্রেণিকেও আমরা ঘর করে দিয়েছি। হিজড়াদের স্বীকৃতি দিয়েছি এবং তাদেরও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। দলিত বা হরিজন শ্রেণির জন্য উচ্চমানের ফ্ল্যাট তৈরি করে দিচ্ছি। চা শ্রমিকদের জন্য ঘর করে দিয়েছি এভাবে প্রত্যেকটা শ্রেণির মানুষের পুনর্বাসনে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’

এ অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, ‘দেশের প্রতিটা মানুষ যাতে সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে, তাদের জীবন যেন উন্নত হয়, বিশ্ব দরবারে আমরা বাঙালি হিসেবে মাথা উঁচু করে সম্মানের সঙ্গে চলতে পারি। এ দেশটাকে জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। বাংলাদেশের প্রত্যেকটা মানুষ যেন সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারে সেটাই আমার একমাত্র লক্ষ্য। মুজিববর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে কোনো মানুষ গৃহহারা থাকবে না।

প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, ‘আজকে সত্যি আমার জন্য একটা আনন্দের দিন। কারণ এদেশে যারা সব থেকে বঞ্চিত মানুষ, যাদের কোনো ঠিকানা ছিল না, ঘরবাড়ি ছিল না আজকে তাদের অন্তত একটা ঠিকানা, মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে পারছি। এজন্যই আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন। তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যই নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। কখনও নিজের জন্য নিজে কী পেলেন, না পেলেন সেটা নিয়ে চিন্তা করেননি। এদেশের মানুষের কথাই চিন্তা করেছেন।’

তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের ঘর করে দেয়ার চিন্তাটা বঙ্গবন্ধুই প্রথম করেছেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালে আমাদের পুরো পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। আমাকে ছয় বছর কাটাতে হয় বাইরে। শুধু মানুষের কথা ভেবে মানুষের শক্তি নিয়েই দেশে ফিরি। আমার কেউ ছিল না আমার কোনো থাকার ঘরও নাই। আমি কোথায় গিয়ে উঠব, তাও আমি জানি না। আমি কীভাবে চলব, তাও জানি না। কিন্তু আমার শুধুই একটা কথা মনে হচ্ছিল যে আমাকে যেতে হবে। যেতে হবে এ কারণে যে সামরিক শাসক দিয়ে নিষ্পেষিত হচ্ছে আমার দেশের মানুষ তাদের মুক্তি দিতে হবে। তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। তাদের জন্য কাজ করতে হবে। সেই আদর্শ সামনে নিয়েই আমি ফিরে আসি। আমি কখনও আমার ছোট ফুপুর বাড়ি, কখনও মেজ ফুপুর বাড়ি এ রকমভাবে দিন কাটাই। কিন্তু আমার লক্ষ্য একটাই সামনে ছিল যে, আমি কী পেলাম, না পেলাম সেটা বড় কথা নয়। দেশের মানুষের জন্য কতটুক কী করব। সমগ্র বাংলাদেশ ঘুরে মানুষের দুঃখ কষ্ট দেখেছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেকে গাল ভরে কথা বলে গণতান্ত্রিক অধিকার পেয়েছে, গণতান্ত্রিক অধিকারটা কী? একটা সামরিক শাসকের ক্ষমতা দখল করে এক দিন ঘোষণা দিল যে আজকে আমি রাষ্ট্রপতি হলাম, আর তারপরও সেটা গণতন্ত্র হয়ে গেল? হ্যাঁ অনেকগুলো রাজনৈতিক দল করার সুযোগ করে দিল কিন্তু মানুষকে দুর্নীতি করা মানি লন্ডারিং করা, ব্যাংকে ঋণখেলাপি করা টাকা ব্যাংক থেকে ছাপিয়ে নিয়ে এসে সেগুলো ছড়িয়ে দিয়ে ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ সেই কথা শোনানো। ‘আই উইল মেক ডিফিকাল্ট ফর দ্য পলিটিশিয়ান’ এ কথাও জিয়াউর রহমান বলে গেছেন। জিয়াউর রহমানের কাজই ছিল এদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলা, এদেশের মানুষকে দরিদ্রকে দরিদ্রই রাখা, আর মুষ্টিমেয় লোককে টাকা পয়সা দিয়ে একটু অর্থশালী, সম্পদশালী করে দিয়ে তাদের ক্ষমতার ক্ষমতাকে যেন চিরস্থায়ীভাবে ব্যবহার করতে পারে তার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। মেধাবী ছেলেমেয়েদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে তাদের বিপথে ঠেলে দেয়া, নির্বাচনের নামে প্রহসন করা, হ্যাঁ-না ভোটে ১১০ ভাগ পড়ে তখন। এরপরে সেনাপ্রধান হয়ে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা দিয়ে রাষ্ট্রপতি থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সেখানেও কেউ ভোট পেল না। তারপর দিল সংসদ নির্বাচন, সেটাও আরেক প্রহসন। যারা গণতন্ত্রের জন্য এত কথা বলেন, তাদের কাছে এটাই প্রশ্ন। এটা কী করে গণতন্ত্র?’

মুজিববর্ষ উপলক্ষে সরকার গৃহহীনদের জন্য এক হাজার ১৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৬ হাজার ১৮৯টি গৃহ নির্মাণ করেছে। আগামী মাসে গৃহহীনদের মাঝে আরও প্রায় এক লাখ গৃহ বিতরণ করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন আশ্রয়ণ প্রকল্প মুজিববর্ষ উদ্যাপনকালে ২১টি জেলার ৩৬টি উপজেলায় ৪৪টি প্রকল্পের অধীনে ৭৪৩টি ব্যারাক নির্মাণ করে তিন হাজার ৭১৫টি পরিবারকে পুনর্বাসিত করা হচ্ছে। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য এ ব্যারাক নির্মাণ করছে।

আশ্রয়ণ প্রকল্প ২০২০ সালে আট লাখ ৮৫ হাজার ৬২২টি পরিবারের তালিকা তৈরি করেছে। তাদের মধ্যে দুই লাখ ৯৩ হাজার ৩৬১টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার এবং পাঁচ লাখ ৯২ হাজার ২৬১টি পরিবারের ১-১০ শতাংশ ভূমি রয়েছে। তবে তাদের বসবাসের বাড়ি নেই।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের কাগজপত্র বুঝে পেয়ে আনন্দিত এক পরিবার। আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প চার হাজার ৮৪০ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে (জুলাই ২০১০ থেকে জুন ২০২২ পর্যন্ত) দুই লাখ ৫০ হাজার ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার ও ছিন্নমূল পরিবারকে পুনর্বাসিত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত সারা দেশে এক লাখ ৯২ হাজার ২২৭টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে ইতোমধ্যে পুনর্বাসিত করা হয়েছে।

এ পর্যন্ত মোট ৪৮ হাজার ৫০০ ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে ব্যারাকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। এক লাখ ৪৩ হাজার ৭৭৭টি পরিবারের প্রত্যেকের এক থেকে ১০ শতাংশ ভূমি রয়েছে। কিন্তু তাদের বাড়ি করার সক্ষমতা নেই।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উদ্বাস্তু ৬০০ পরিবারের জন্য কক্সবাজারের খুরুশকুলে ২০টি পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করেছে।

সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ডিটেইলড প্রজেক্ট প্রপোজালের (ডিপিপি) মাধ্যমে আরও ১১৯টি বহুতল ভবন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ ➧

সর্বশেষ..