প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক

প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়ন

শেখ আবু তালেব: ঋণ বিতরণে অনিয়ম, আর্থিক কেলেঙ্কারি, আগ্রাসী বিনিয়োগ ও ভুয়া ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়ছে দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআই)। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারিকেও হার মানিয়েছে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। আমানত সংকটে গ্রাহকের টাকাও ফেরত দিতে পারছে না অনেক প্রতিষ্ঠান। এতে ৩৪ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ডজনখানেকের আর্থিক বিভিন্ন সূচকের অবনমন ঘটেছে।
এ অবস্থায় সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত চিত্র জানতে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রথম পর্যায়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কোন ব্যাংকে কত টাকা আমানত বা ঋণ রয়েছে, তার তথ্য চাওয়া হয়েছে। অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে থাকা দায়দেনার তথ্যও চাওয়া হয়েছে। সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে বলে দায়িত্বশীল সূত্র থেকে জানা গেছে।
চিঠি পাওয়ার সত্যতা স্বীকার করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা একটি চিঠি পেয়েছি। ব্যাংক ও অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাখা আমানতের তথ্য চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঋণের বিবরণও চাওয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এ-সংক্রান্ত তথ্য জমা দেব।’
দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানটির আমানত, দায়, খেলাপি ঋণ, বড় গ্রাহক, ঋণ অবলোপন, সুদ মওকুফের সুবিধাভোগী, সম্পদের তথ্য, বেতন কাঠামো, বিনিয়োগের ক্ষেত্র, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও পরিচালনা পর্ষদ সদস্যদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে একটি প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারের কাছে দিবে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে এ-সংক্রান্ত একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
জানা গেছে, দেশের ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকটি বিভাগও রয়েছে। কিন্তু দেশের ব্যাংক খাতের চেয়ে আর্থিক খাতের অবস্থা বেশ নাজুক বলে বিভিন্ন সময় আলোচিত হয়ে আসছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা একেবারেই ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছেছে কয়েক বছরে। আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ার মধ্যে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। এর বাইরে শুধু রাজনৈতিক কারণে কয়েকটির অবস্থা বেশ নাজুক হয়ে উঠেছে।
এ অবস্থায় ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের ওপর নজরদারি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সে সিদ্ধান্তের আলোকে তথ্য নেওয়া শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এজন্য সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে চিঠি দেওয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব তথ্য সংগ্রহ করে যাচাই-বাছাই করবে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীলদের নিয়ে গঠিত বিশেষ টিম। সে তথ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতের প্রকৃত ও পুরো চিত্র তুলে আনবে বাংলাদেশ ব্যাংক, যাতে সহজেই প্রতিবেদনের ওপর চোখ বুলিয়ে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত অবস্থার ধারণা পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কয়েকটির অবস্থা ভালো যাচ্ছে না। এজন্য প্রকৃত তথ্য জানতে নির্ধারিত ছকে বেশ কিছু তথ্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীকালে তা যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে। পুরো আর্থিক খাতের চিত্র সম্পর্কে ধারণা দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হবে। ওই প্রতিবেদনটি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের কাছে যাবে।
জানা গেছে, আর্থিক খাতের প্রতিবেদন তৈরির পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে পরামর্শ চাইবে বাংলাদেশ ব্যাংক। সরকার ও মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে পরামর্শ পাওয়া গেলে সে মোতাবেক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। যদি কোনো পক্ষ থেকে পরামর্শ না আসে, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ নিজস্ব নীতিতে চলবেÑএমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সে আলোকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীদের নিয়ে একটি বৈঠকের পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
উল্লেখ্য, ঋণ অনিয়ম ও দুর্নীতির দায়ে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডকে অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন পদক্ষেপের পক্ষে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন দেশের উচ্চ আদালত। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের উপমহাব্যবস্থাপক পদমর্যাদার এক কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তিনিই অবসায়ক (লিকুইডিটর) হিসেবে কাজ করবেন। আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে অবসায়ন (বন্ধ) হবে, তা নির্ধারণ করবেন অবসায়ক।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..